“এলপিজিকে সবুজ শিল্প ঘোষণা জ্বালানি খাতের বড় মাইলফলক” — আমিরুল হক
তারিক-উল-ইসলাম, ঢাকা: দেশের জ্বালানি নিরাপত্তায় এক যুগান্তকারী সিদ্ধান্ত নিয়েছে সরকার। ক্রমবর্ধমান পরিবেশ দূষণ রোধ এবং পরিবেশবান্ধব জ্বালানির ব্যবহার উৎসাহিত করতে এলপিজি (লিকুইফাইড পেট্রোলিয়াম গ্যাস) খাতকে ‘সবুজ শিল্প’ বা ‘গ্রিন ইন্ডাস্ট্রি’ হিসেবে ঘোষণা করা হয়েছে।
সরকারের এই সিদ্ধান্তের ফলে এলপিজি আমদানিকারক ও অপারেটররা এখন থেকে বাংলাদেশ ব্যাংকের ‘গ্রিন ফান্ড’ থেকে অত্যন্ত সহজ শর্তে ও স্বল্প সুদে ঋণ সুবিধা পাবেন।
বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, এই উদ্যোগের ফলে এলপিজি খাতে বিনিয়োগ বাড়বে এবং দীর্ঘ মেয়াদে ভোক্তা পর্যায়ে গ্যাসের দাম সহনীয় পর্যায়ে আসবে।
কেন এই ঘোষণা? জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ বিভাগের সাম্প্রতিক এক চিঠিতে জানানো হয়, দেশে এলপি গ্যাসের চাহিদার প্রায় ৯৮ শতাংশই মেটায় বেসরকারি কোম্পানিগুলো। শীতকালে পাইপলাইনের গ্যাসের সংকট এবং বিশ্ববাজারে দাম বৃদ্ধির কারণে স্থানীয় বাজারে প্রায়ই এলপিজির তীব্র সংকট তৈরি হয়। এলপিজি তুলনামূলক কম কার্বন নিঃসরণকারী জ্বালানি হওয়ায় একে সবুজ শিল্পের মর্যাদা দেওয়ার দাবি জানিয়ে আসছিল সংশ্লিষ্ট পক্ষগুলো।
কোন পক্ষ কী সুবিধা পাবে?
১. অপারেটর ও আমদানিকারক: আগে এলপিজি অপারেটরদের চড়া সুদে বাণিজ্যিক ব্যাংক থেকে ঋণ নিতে হতো। এখন বাংলাদেশ ব্যাংকের ‘গ্রিন ট্রান্সফরমেশন ফান্ড’ (GTF) ব্যবহারের সুযোগ পাওয়ায় তাদের মূলধন খরচ (Cost of Capital) উল্লেখযোগ্য হারে কমবে। এলসি (LC) খোলা এবং অবকাঠামো উন্নয়নে তারা অগ্রাধিকার পাবেন।
২. পরিবেশ ও জলবায়ু: সবুজ শিল্পের মর্যাদা পাওয়ায় এ খাতে আধুনিক ও পরিবেশবান্ধব প্রযুক্তির ব্যবহার বাড়বে। এটি সরকারের কার্বন নিঃসরণ কমানোর লক্ষ্যমাত্রা অর্জনে সহায়ক হবে।
৩. ব্যাংকিং খাত: বাংলাদেশ ব্যাংকের গ্রিন ফান্ডের সঠিক ব্যবহারের মাধ্যমে ব্যাংকগুলোর টেকসই অর্থায়ন (Sustainable Finance) লক্ষ্যমাত্রা পূরণ সহজ হবে।
ভোক্তা সাধারণের প্রাপ্তি: সাধারণ মানুষের জন্য সবচেয়ে বড় সুখবর হলো মূল্যের স্থিতিশীলতা। অপারেটরদের খরচ কমলে এবং ঋণের সহজলভ্যতা নিশ্চিত হলে বাজারে কৃত্রিম সংকট তৈরির সম্ভাবনা কমে যাবে। সরকারিভাবে নির্ধারিত দামে ভোক্তা পর্যায়ে গ্যাস পৌঁছে দেওয়া সহজ হবে। বিশেষ করে গ্রামাঞ্চলে যেখানে পাইপলাইনের গ্যাস নেই, সেখানকার গ্রাহকরা নিরবচ্ছিন্ন সরবরাহ আশা করতে পারেন।

লোয়াব (LOAB) সভাপতি: এই সিদ্ধান্তের প্রশংসা করে এলপিজি অপারেটরস অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশ (LOAB)-এর সভাপতি মো. আমিরুল হক বলেন, “এলপিজি-কে সবুজ শিল্প হিসেবে স্বীকৃতি দেওয়া আমাদের দীর্ঘদিনের দাবি ছিল। বাংলাদেশ ব্যাংকের গ্রিন ফান্ড থেকে সহজ শর্তে ঋণ সুবিধা পাওয়া গেলে এলপিজি খাতে বিদ্যমান আর্থিক টানাপড়েন অনেকটা দূর হবে। এর ফলে অপারেটররা যেমন উৎসাহিত হবে, তেমনি গ্রাহক পর্যায়েও সরকার নির্ধারিত মূল্যে গ্যাস পৌঁছে দেওয়া আমাদের জন্য সহজতর হবে। এটি বাংলাদেশের জ্বালানি রূপান্তরের (Energy Transition) ক্ষেত্রে একটি বড় মাইলফলক।”
সংশ্লিষ্টরা মনে করছেন, এই সিদ্ধান্তের ফলে এলপিজি খাতের কোম্পানিগুলো এখন আরও বেশি করে পরিবেশবান্ধব সিলিন্ডার ও আধুনিক ডিস্ট্রিবিউশন নেটওয়ার্ক তৈরিতে বিনিয়োগ করবে। এর ফলে সরবরাহ ব্যবস্থার উন্নয়ন ঘটবে এবং মধ্যস্বত্বভোগীদের দৌরাত্ম্য কমিয়ে সরাসরি ভোক্তার কাছে সাশ্রয়ী মূল্যে পণ্য পৌঁছানো সম্ভব হবে।










