Home First Lead হাসপাতালের বর্জ্য থেকে ছড়াচ্ছে রোগ: রুখতে আসছে কঠোর বিধিমালা

হাসপাতালের বর্জ্য থেকে ছড়াচ্ছে রোগ: রুখতে আসছে কঠোর বিধিমালা

তারিক-উল-ইসলাম, ঢাকা: রাজধানীসহ সারা দেশের হাসপাতাল ও ক্লিনিকগুলোর সামনে গেলেই চোখে পড়ে স্তূপ করে রাখা সিরিঞ্জ, রক্তমাখা তুলা, ব্যান্ডেজ আর ব্যবহৃত গ্লাভস। যথাযথ ব্যবস্থাপনার অভাবে এই ‘চিকিৎসা বর্জ্য’ এখন জনস্বাস্থ্যের জন্য চরম এক মরণফাঁদে পরিণত হয়েছে। অসচেতনতার কারণে এই বর্জ্য সাধারণ ময়লার সাথে মিশে ছড়িয়ে পড়ছে নালা-নর্দমা ও লোকালয়ে, যেখান থেকে ছড়িয়ে পড়ছে হেপাটাইটিস-বি, সি, এইচআইভি (এইডস) ও যক্ষ্মার মতো ভয়াবহ সব রোগ।

বর্তমানে যে ঝুঁকির মুখে জনস্বাস্থ্য: সরেজমিনে দেখা গেছে, অনেক অসাধু চক্র হাসপাতাল থেকে ব্যবহৃত সিরিঞ্জ ও স্যালাইন ব্যাগ সংগ্রহ করে ধুয়ে পুনরায় বাজারে বিক্রি করছে। আবার খোলা স্থানে বর্জ্য ফেলার কারণে কুকুর বা বিড়াল সেগুলো টেনে নিয়ে যাচ্ছে লোকালয়ে। বৃষ্টির পানিতে এই বর্জ্যের জীবাণু মিশছে ভূগর্ভস্থ পানিতে।

পরিবেশবিদদের মতে, সঠিক শোধন ছাড়া এই বর্জ্য মাটিতে মিশলে তা দীর্ঘমেয়াদে খাদ্যচক্রেও প্রবেশ করছে, যা ক্যানসারের মতো রোগের ঝুঁকি বাড়িয়ে দিচ্ছে।

এই বিশৃঙ্খলা রুখতে নতুন বিধিমালা ২০২৫: এই ভয়াবহ পরিস্থিতি মোকাবিলায় সরকার ‘চিকিৎসা বর্জ্য ব্যবস্থাপনা ও প্রক্রিয়াজাতকরণ বিধিমালা, ২০২৫’ এর খসড়া চূড়ান্ত করেছে। এই নতুন বিধিমালায় বর্জ্যজনিত রোগ সংক্রমণ ঠেকাতে বেশ কিছু বৈপ্লবিক পরিবর্তন আনা হয়েছে:

১. উৎসস্থলেই কঠোর পৃথকীকরণ: নতুন নিয়ম অনুযায়ী, কোনোভাবেই চিকিৎসা বর্জ্য সাধারণ বর্জ্যের সাথে মেশানো যাবে না। সংক্রামক বর্জ্য, ধারালো বর্জ্য এবং সাধারণ বর্জ্য আলাদা করার জন্য রঙিন বিন (হলুদ, লাল, নীল, কালো) ব্যবহার বাধ্যতামূলক করা হয়েছে। বিশেষ করে ধারালো সুচ বা সেফটি পিন রাখতে হবে লাল রঙের ‘পাংচার প্রুফ’ বা ছিদ্র-প্রতিরোধী পাত্রে।

২. ৪৮ ঘণ্টার আল্টিমেটাম: আগে বর্জ্য দিনের পর দিন পড়ে থাকলেও কোনো শাস্তির বিধান ছিল না। নতুন বিধিমালায় স্পষ্ট বলা হয়েছে, কোনোভাবেই অপরিশোধিত বিপজ্জনক বর্জ্য ৪৮ ঘণ্টার বেশি সংরক্ষণ করা যাবে না। নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে তা প্রক্রিয়াজাতকারী সংস্থার কাছে হস্তান্তর করতে হবে।

৩. নিরাপদ পরিবহন ও ডাবল লেয়ার সুরক্ষা: সংক্রামক বর্জ্য পরিবহনের সময় তা যেন লিক না করে, সেজন্য ‘ডাবল ব্যাগ’ (দ্বিগুণ স্তর) পদ্ধতি ব্যবহারের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। বর্জ্যবাহী যানবাহনে অবশ্যই ‘বিপজ্জনক বর্জ্য’ সংবলিত সতর্কবার্তা থাকতে হবে।

৪. কঠোর শাস্তি ও তদারকি: যদি কোনো হাসপাতাল বা ক্লিনিক বর্জ্য ব্যবস্থাপনায় অবহেলা করে, তবে তাদের লাইসেন্স বাতিলের পাশাপাশি জেল ও জরিমানার বিধান রাখা হয়েছে। জেলা প্রশাসক ও সিটি কর্পোরেশনের নেতৃত্বে গঠিত কমিটি নিয়মিত ঝটিকা অভিযান পরিচালনা করবে।

৫. কর্মীদের টিকাদান ও সুরক্ষা: বর্জ্য থেকে যেন কর্মীরা আক্রান্ত না হন, সেজন্য তাদের বিশেষ পোশাক (PPE) এবং হেপাটাইটিস-বি ও টিটেনাস টিকা প্রদান বাধ্যতামূলক করা হয়েছে।

 স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা বলছেন, শুধু আইন করলেই হবে না, এর প্রয়োগ নিশ্চিত করা জরুরি। নতুন বিধিমালা ২০২৫ যদি মাঠ পর্যায়ে সঠিকভাবে বাস্তবায়িত হয়, তবেই হাসপাতালের বর্জ্য থেকে রোগ ছড়ানোর এই অশুভ চক্র বন্ধ করা সম্ভব হবে।