ফরিদুল আলম, ঢাকা: নতুন একটি আবাসিক এলাকায় নিজের এক টুকরো জমি বা ফ্ল্যাট কেনা মানেই এক বুক স্বপ্ন। কিন্তু সেই স্বপ্নের ঠিকানায় স্থায়ী হতে গিয়ে রাজধানী ঢাকা ও বন্দরনগরী চট্টগ্রামসহ দেশের বড় বড় শহরগুলোর উপকণ্ঠে হাজারো মানুষ এখন আবিষ্কার করছেন এক রূঢ় বাস্তবতা। একেক মালিকের একেক সময়ে বাড়ি তৈরির নেশায় এলাকাগুলো পরিণত হয়েছে এক ‘অনন্ত নির্মাণাধীন প্রান্তরে’। বিশ-ত্রিশ বছর ধরে চলা ইট-পাথর আর সিমেন্টের এই অবিরাম কর্মযজ্ঞে বাসিন্দাদের স্বাভাবিক জীবন এখন অস্বাভাবিক হয়ে দাঁড়িয়েছে।
যেখানে ‘স্বাভাবিক’ জীবনই বিলাসিতা
উত্তরা এক্সটেনশন, বসুন্ধরা কিংবা চট্টগ্রামের অনন্যা এলাকার মতো নতুন প্রকল্পগুলোতে জমি সস্তা হওয়ায় অনেকেই বিনিয়োগ করেন। কিন্তু সমন্বিত কোনো সময়সীমা না থাকায় একেকজন নিজের সামর্থ্য অনুযায়ী নির্মাণ শুরু করেন। ফলে পুরো এলাকাটি বসবাসের উপযোগী হতে তিন দশক পর্যন্ত সময় লেগে যাচ্ছে। এই দীর্ঘ সময়ে স্থায়ী বাসিন্দাদের জীবন কাটছে তিনটি প্রধান যন্ত্রণায়:
রাস্তার মরণদশা ও যানজট: বালু, রড ও সিমেন্টবাহী ভারী ট্রাকের দাপটে রাস্তাগুলো স্থায়ী হওয়ার আগেই ধ্বংস হয়ে যাচ্ছে। তৈরি হচ্ছে বড় বড় গর্ত, যা বর্ষায় মরণফাঁদে পরিণত হয়।
২৪ ঘণ্টার শব্দদূষণ: সকালের হাতুড়ির পিটুনি থেকে শুরু করে রাতের গ্রাইন্ডারের চিৎকার—বিশ্রাম বা পড়াশোনা করার কোনো পরিবেশ নেই।
ধুলার আস্তরণ: নির্মাণ সামগ্রী ও ভাঙাচোরা রাস্তা থেকে ওড়া ধুলা ঘরবাড়ি, আসবাব এমনকি বাসিন্দাদের ফুসফুসকেও গ্রাস করছে। বিশেষ করে শিশু ও বয়স্করা শ্বাসকষ্ট ও মারাত্মক অ্যালার্জিতে ভুগছেন।
বাসিন্দাদের আর্তনাদ: “খোলা কারখানায় বাস করছি”
পাঁচ বছর আগে উত্তরায় থিতু হওয়া রফিকুল ইসলাম হতাশা নিয়ে বলেন, “ভেবেছিলাম এলাকাটা দ্রুতই পূর্ণ হবে। কিন্তু প্রতিদিন নতুন নতুন বাড়ির কাজ শুরু হচ্ছে। বারান্দায় পা রাখা যায় না ধুলার জন্য, বাচ্চার অ্যালার্জি এখন নিত্যসঙ্গী।” একই আক্ষেপ চট্টগ্রাম ও ঢাকার বিভিন্ন নতুন আবাসন প্রকল্পের বাসিন্দাদের। তাদের মতে, জানালা বন্ধ রেখেও ধুলো আর ট্রাকের হর্নের হাত থেকে নিস্তার মিলছে না।
বিনিয়োগের আগে সাবধান!
নগর পরিকল্পনাবিদ ও বিশেষজ্ঞরা সতর্ক করে বলছেন, এমন অবস্থা কেবল রাজধানীতে নয়, চট্টগ্রামসহ দেশের প্রায় সব নতুন আবাসিক এলাকার সাধারণ চিত্র হয়ে দাঁড়িয়েছে। তাই কেউ যদি নতুন আবাসিক এলাকায় প্লট বা ফ্ল্যাট কিনে এখনই স্থায়ী হওয়ার কথা ভাবেন, তবে তাকে এই দীর্ঘমেয়াদী দুর্ভোগগুলোর কথা আগেভাগে মাথায় রাখতে হবে। অন্তত দুই দশকের অস্থির পরিবেশ মেনে নেওয়ার মানসিক প্রস্তুতি না থাকলে স্বপ্নের ঠিকানা বিষাদে পরিণত হতে পারে।
সমাধান কোন পথে?
এই বিশৃঙ্খলা রোধে কর্তৃপক্ষের কঠোর হস্তক্ষেপ জরুরি বলে মনে করেন বিশেষজ্ঞরা। তাদের প্রস্তাবনা:
ফেজভিত্তিক পরিকল্পনা: এলাকা অনুমোদনের সময়ই ব্লকভিত্তিক নির্দিষ্ট ‘নির্মাণ সময়সূচি’ বাধ্যতামূলক করা।
কঠোর আইন প্রয়োগ: নির্দিষ্ট সময়ের বাইরে কাজ বন্ধ রাখা এবং নির্মাণস্থল ঘেরাও ও পানি ছিটানো নিশ্চিত করা।
শহরের বিস্তার অনিবার্য, কিন্তু তা যেন মানুষের সুস্থভাবে বেঁচে থাকার অধিকারকে কেড়ে না নেয়। উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ ও নগর পরিকল্পনাবিদদের সমন্বিত উদ্যোগ ছাড়া এই ‘স্বপ্নের বাসা’গুলো কেবল দীর্ঘমেয়াদী নির্মাণ সাইট হিসেবেই রয়ে যাবে।