Home আন্তর্জাতিক এপস্টাইন নথি: ক্ষমতার আড়ালে অন্ধকার জগতের পর্দা ফাঁস

এপস্টাইন নথি: ক্ষমতার আড়ালে অন্ধকার জগতের পর্দা ফাঁস

আন্তর্জাতিক ডেস্ক: মার্কিন বিচার বিভাগ (DOJ) কুখ্যাত যৌন অপরাধী জেফরি এপস্টাইন সংক্রান্ত তদন্তের সর্বশেষ এবং বিশাল এক নথিপত্র শুক্রবার ৩০ জানুয়ারি জনসমক্ষে প্রকাশ করেছে। দীর্ঘ প্রতীক্ষার পর প্রকাশিত এই ৩০ লক্ষাধিক পৃষ্ঠার নথি বিশ্ব রাজনীতির প্রভাবশালী মহলে ব্যাপক কম্পন সৃষ্টি করেছে।

এই নথিগুলো প্রকাশের জন্য মার্কিন কংগ্রেস গত ১৯ ডিসেম্বর, ২০২৫ তারিখ নির্ধারণ করে দিয়েছিল। অর্থাৎ, সরকারিভাবে নির্ধারিত ডেডলাইন বা সময়সীমা পার হওয়ার প্রায় এক মাস ১০ দিন পর এগুলো জনসমক্ষে আনা হলো।

বিচার বিভাগ জানিয়েছে, ৩০ লক্ষাধিক পৃষ্ঠা পর্যালোচনা এবং ভুক্তভোগীদের নিরাপত্তার জন্য সংবেদনশীল তথ্যগুলো মুছে ফেলার (Redaction) কারণেই এই বিলম্ব হয়েছে।বোনাস তথ্য হিসেবে জানানো হয়েছে যে, আগামী ১৫ দিনের মধ্যে কংগ্রেসের কাছে সরকারি কর্মকর্তাদের সংশ্লিষ্টতা নিয়ে আরও একটি বিস্তারিত রিপোর্ট পেশ করা হবে।

জেফরি এপস্টাইন। ছবিতে বামে
এপস্টাইন নথি আসলে কী?
সহজ কথায়, জেফরি এপস্টাইন ছিলেন একজন ধনকুবের যিনি দশকের পর দশক ধরে অপ্রাপ্তবয়স্ক মেয়েদের পাচার এবং যৌন শোষণ চক্র চালিয়েছিলেন। ২০১৯ সালে কারাগারে তার রহস্যময় আত্মহত্যার পর এই চক্রের সাথে জড়িত রাঘববোয়ালদের তথ্য আড়ালে থেকে গিয়েছিল। বর্তমান নথিগুলো মূলত এফবিআই এবং বিচার বিভাগের সংগ্রহ করা সেই গোপন প্রমাণ, যেখানে এপস্টাইনের দৈনন্দিন কর্মকাণ্ড, তার ডায়েরি, ইমেইল এবং তার সাথে যোগাযোগ রাখা বিশিষ্ট ব্যক্তিদের বিস্তারিত তথ্য রয়েছে।
কেন এই নথিগুলো এত গুরুত্বপূর্ণ?
এপস্টাইন কেবল একজন অপরাধী ছিলেন না, তার যোগাযোগ ছিল বিশ্বের শীর্ষস্থানীয় রাজনীতিবিদ, বিজ্ঞানী এবং রাজপরিবারের সদস্যদের সাথে। এই নথিগুলো প্রকাশের প্রধান কারণ হলো:
  • স্বচ্ছতা: সাধারণ মানুষ জানতে চায় কীভাবে একজন অপরাধী বছরের পর বছর ক্ষমতার আশ্রয়ে থেকে এমন জঘন্য কাজ চালিয়ে গেছেন।
  • সহযোগীদের চিহ্নিত করা: এপস্টাইন একা এই কাজ করেননি; এই নথির মাধ্যমে তার সহযোগী ও মদদদাতাদের খুঁজে বের করার চেষ্টা চলছে।
  • আইনি বাধ্যবাধকতা: মার্কিন কংগ্রেসের পাস করা নতুন আইনের ফলে সরকার এই তথ্যগুলো প্রকাশ করতে বাধ্য হয়েছে।
বিশিষ্ট ব্যক্তিদের নিয়ে চাঞ্চল্যকর তথ্য
নথিগুলোতে বর্তমান ও সাবেক অনেক প্রভাবশালী ব্যক্তির নাম ও কর্মকাণ্ড উঠে এসেছে:
ডোনাল্ড ট্রাম্প: নথিতে প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের নাম হাজারো বার এসেছে। যদিও অনেকগুলো কেবল নিউজ ক্লিপিং, তবে কিছু নথিতে তার বিরুদ্ধে অতীতে করা গুরুতর যৌন নিপীড়নের অপ্রমাণিত অভিযোগের বর্ণনা রয়েছে। বিচার বিভাগ জানিয়েছে, নিয়ম মেনেই সব তথ্য (ভুয়া অভিযোগসহ) প্রকাশ করা হয়েছে।
বিল ক্লিনটন ও প্রিন্স অ্যান্ড্রু: সাবেক মার্কিন প্রেসিডেন্ট বিল ক্লিনটন এবং ব্রিটিশ রাজপরিবারের প্রিন্স অ্যান্ড্রুর নামও একাধিকবার এসেছে। প্রিন্স অ্যান্ড্রুর বিরুদ্ধে থাকা অভিযোগগুলো এবং এপস্টাইনের সাথে তার ঘনিষ্ঠতা আবারও নতুন করে আলোচনায় এসেছে।
হাওয়ার্ড লুটনিক: বর্তমান প্রশাসনের বাণিজ্য সচিব লুটনিক ২০১২ সালে এপস্টাইনের ব্যক্তিগত দ্বীপে লাঞ্চ করার পরিকল্পনা করেছিলেন বলে নতুন প্রমাণ পাওয়া গেছে।
বিল গেটস ও ইলন মাস্ক: তাদের সাথে এপস্টাইনের ইমেইল যোগাযোগ বা সামাজিক সাক্ষাতের তথ্যও এই বিশাল নথির কোনো না কোনো অংশে স্থান পেয়েছে।
জনগণের প্রতিক্রিয়া: মিশ্র ও উত্তাল
নথিগুলো প্রকাশের পর সাধারণ মানুষের মধ্যে তীব্র প্রতিক্রিয়া দেখা দিয়েছে:
১. অবিশ্বাসের পরিবেশ: সাধারণ জনগণ সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ক্ষোভ প্রকাশ করে বলছেন যে, প্রভাবশালী ব্যক্তিরা আইনের ঊর্ধ্বে থেকে যাচ্ছেন।
২. অসম্পূর্ণতার অভিযোগ: ৩০ লক্ষ পৃষ্ঠা প্রকাশিত হলেও বিচার বিভাগ প্রায় ২ লক্ষ পৃষ্ঠা ‘গোপনীয়তার’ কারণে আটকে দিয়েছে। এটি নিয়ে জনগণের মধ্যে সন্দেহ তৈরি হয়েছে যে, কাউকে হয়তো এখনও রক্ষা করার চেষ্টা চলছে।
৩. ন্যায়বিচারের দাবি: ভুক্তভোগীদের আইনজীবীরা এবং সাধারণ মানুষ দাবি তুলেছেন যে, নথিতে যাদের নাম এসেছে তাদের বিরুদ্ধে যেন নিরপেক্ষ তদন্ত করা হয়।
বিচার বিভাগ জানিয়েছে, এই নথিগুলো প্রকাশ করার মাধ্যমে তাদের আইনি দায়িত্ব শেষ হচ্ছে। তবে বিশ্লেষকরা মনে করছেন, এই বিশাল তথ্যভাণ্ডার থেকে আগামী দিনগুলোতে আরও অনেক চাঞ্চল্যকর গোপন সত্য বেরিয়ে আসবে যা বিশ্ব রাজনীতিকে প্রভাবিত করতে পারে।