Home First Lead মালয়েশিয়ায় সরাসরি কর্মী নিয়োগ: বন্ধ হচ্ছে মধ্যস্বত্বভোগীদের দৌরাত্ম্য

মালয়েশিয়ায় সরাসরি কর্মী নিয়োগ: বন্ধ হচ্ছে মধ্যস্বত্বভোগীদের দৌরাত্ম্য

আনোয়ার আহমেদ, কুয়ালালামপুর: মালয়েশিয়ার শ্রমবাজারে বাংলাদেশি কর্মীদের জন্য এক নতুন আশার আলো দেখা দিয়েছে। দেশটিতে বিদেশি কর্মী নিয়োগে তৃতীয় পক্ষ বা মধ্যস্বত্বভোগীদের দৌরাত্ম্য চিরতরে বন্ধ করতে সরাসরি নিয়োগের (Direct Hiring) একটি বিশেষ প্ল্যাটফর্ম তৈরির ঘোষণা দিয়েছে মালয়েশিয়া সরকার। দেশটির মানবসম্পদ উপমন্ত্রী দাতুক সেরি আর. রামানান সম্প্রতি এই পরিকল্পনার কথা নিশ্চিত করেছেন।
বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে এই উদ্যোগ অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ, কারণ মালয়েশিয়া বর্তমানে বাংলাদেশের অন্যতম বৃহত্তম শ্রমবাজার এবং রেমিট্যান্স আহরণের অন্যতম প্রধান উৎস।
মধ্যস্বত্বভোগীদের দৌরাত্ম্য ও সীমাহীন ভোগান্তি
দীর্ঘদিন ধরে মালয়েশিয়ার জনশক্তি রপ্তানি খাতটি একদল প্রভাবশালী সিন্ডিকেট ও মধ্যস্বত্বভোগীদের কবলে জিম্মি। বাংলাদেশে নিযুক্ত বিভিন্ন রিক্রুটিং এজেন্ট ও মালয়েশিয়ার স্থানীয় দালালদের কারণে একজন কর্মীকে মালয়েশিয়ায় আসতে ১৬,০০০ থেকে ২৫,০০০ রিঙ্গিত (প্রায় ৪ থেকে ৬ লক্ষ টাকা) পর্যন্ত খরচ করতে হয়। অথচ আন্তর্জাতিক শ্রম সংস্থার (ILO) নীতিমালা অনুযায়ী এই খরচ এক মাসের বেতনের বেশি হওয়ার কথা নয়।
অতিরিক্ত এই অভিবাসন ব্যয়ের কারণে অনেক কর্মী ভিটেমাটি বিক্রি করে বা চড়া সুদে ঋণ নিয়ে মালয়েশিয়ায় ‘ঋণের জালে’ (Debt Bondage) আটকে পড়ছেন, যা আধুনিক দাসত্বেরই একটি রূপ।
বেতন ও কাজ নিয়ে প্রতারণার অবসান
বাংলাদেশের কর্মীদের একটি বড় অভিযোগ হলো—দেশ থেকে ‘ক’ কাজের কথা বলে নেওয়া হলেও মালয়েশিয়ায় পৌঁছানোর পর তাদের ‘খ’ কাজ বা তুলনামূলক কম বেতনের কাজে বাধ্য করা হয়। প্রস্তাবিত ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মটি চালু হলে:
সরাসরি ইন্টারভিউ: নিয়োগকর্তা সরাসরি কর্মীর ইন্টারভিউ নিতে পারবেন।
এআই (AI) অনুবাদক: ভাষা না জানলেও কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার সাহায্যে রিয়েল-টাইম অনুবাদে সরাসরি কথা বলা যাবে। ফলে কাজের ধরন ও বেতন নিয়ে কোনো অস্পষ্টতা থাকবে না।
সরাসরি যোগাযোগ: কোনো এজেন্ট ছাড়াই নিয়োগকর্তা এবং কর্মী একে অপরকে পছন্দ করতে পারবেন।
রেমিট্যান্স প্রবাহে ইতিবাচক প্রভাব
বাংলাদেশের অর্থনীতিতে মালয়েশিয়ার রেমিট্যান্স বড় ভূমিকা রাখে। বর্তমানে কর্মীরা দালালের ঋণের টাকা শোধ করতেই তাদের উপার্জনের একটি বড় অংশ ব্যয় করে ফেলেন। সরাসরি নিয়োগের মাধ্যমে খরচ কমে আসলে কর্মীরা দ্রুত ঋণমুক্ত হতে পারবেন এবং দেশে পাঠানো রেমিট্যান্সের পরিমাণ উল্লেখযোগ্য হারে বৃদ্ধি পাবে।
মালয়েশিয়ার লক্ষ্য
মালয়েশিয়া সরকার চাইছে ২০২৮ সালের মধ্যে দেশটিকে এশিয়ার ‘নৈতিক নিয়োগের কেন্দ্র’ হিসেবে গড়ে তুলতে। মূলত মানব পাচার রোধ এবং বিদেশি কর্মীদের অধিকার রক্ষায় তারা এই কঠোর পদক্ষেপ নিচ্ছে। এই প্ল্যাটফর্মটি এ বছরের শেষ নাগাদ চালু হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে।
বাংলাদেশি জনশক্তি সংশ্লিষ্টদের মতে, এই উদ্যোগ সফল হলে বাংলাদেশ থেকে মালয়েশিয়াগামী কর্মীদের আর্থিক শোষণ কমবে এবং  বাংলাদেশের শ্রমবাজার আরও টেকসই ও সম্মানজনক হবে মালয়েশিয়ায়।