Home আন্তর্জাতিক স্বর্ণে বিনিয়োগে হাওয়া ১.২ ট্রিলিয়ন উন, সেই ‘ব্যর্থতা’ই এখন বিশাল লাভ!

স্বর্ণে বিনিয়োগে হাওয়া ১.২ ট্রিলিয়ন উন, সেই ‘ব্যর্থতা’ই এখন বিশাল লাভ!

আন্তর্জাতিক ডেস্ক:
দক্ষিণ কোরিয়ার কেন্দ্রীয় ব্যাংক (ব্যাংক অফ কোরিয়া) একসময় স্বর্ণে বিনিয়োগ করে তীব্র রাজনৈতিক সমালোচনার মুখে পড়েছিল। ২০১৩ সালে ন্যাশনাল অ্যাসেম্বলির অডিটের সময় তৎকালীন গভর্নর কিম চুং-সু-কে তুলাধোনা করেছিলেন রাজনীতিবিদরা।
অভিযোগ ছিল, তিনি ভুল সময়ে ৫.৫ ট্রিলিয়ন কোরিয়ান উন মূল্যের স্বর্ণ কিনে দেশের ১.২ ট্রিলিয়ন উন ‘হাওয়া’ করে দিয়েছেন। তবে ১২ বছর পর এসে দেখা যাচ্ছে, সেই ‘ব্যর্থ’ বিনিয়োগই এখন দেশটির বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভের অন্যতম শক্তিতে পরিণত হয়েছে।
২০১৩-এর সেই উত্তাল অডিট ও ‘স্বর্ণ-ট্রমা’
২০১০ সাল পর্যন্ত দক্ষিণ কোরিয়ার স্বর্ণের মজুদ ছিল মাত্র ১৪.৪ টন। গভর্নর কিম চুং-সু দায়িত্ব নেওয়ার পর ২০১১ থেকে ২০১৩ সালের মধ্যে দ্রুত এই মজুদ বাড়িয়ে ১০৪.৪ টনে নিয়ে যান। দুর্ভাগ্যবশত, এরপরই বিশ্ববাজারে স্বর্ণের দাম কমতে শুরু করে।
২০১৩ সালের ১৮ নভেম্বর সংসদীয় কমিটির বৈঠকে তৎকালীন বিরোধী দলীয় নেত্রী কিম হিউন-মি গভর্নরকে আক্রমণ করে বলেন, “স্বর্ণের দামের পূর্বাভাস দিতে না পেরে আপনি দেশকে লোকসানের মুখে ঠেলে দিয়েছেন।”
চাপে পড়ে গভর্নর কিম তখন বলেছিলেন, “স্বর্ণ কেনাবেচার জন্য নয়, বরং এটি সংকটের সময় ঢাল হিসেবে কাজ করে।” কিন্তু তৎকালীন ক্ষমতাসীন ও বিরোধী—উভয় পক্ষের তোপের মুখে পড়ে ব্যাংক অফ কোরিয়া স্বর্ণ কেনা পুরোপুরি বন্ধ করে দেয়।
বিশ্লেষকদের মতে, সেই সময়কার সমালোচনা ব্যাংকটির মধ্যে এক ধরনের ‘ট্রমা’ বা আতঙ্ক তৈরি করেছিল, যার ফলে গত এক দশকে তারা আর এক গ্রাম স্বর্ণও কেনেনি।
লোকসান কাটিয়ে ১৬০% প্রবৃদ্ধি
ব্যাংক অফ কোরিয়ার হিসাব অনুযায়ী, ২০১৩ সালে যে স্বর্ণের বাজারমূল্য ছিল মাত্র ৪.০৪ বিলিয়ন ডলার, ২০১৫ সালে তা আরও কমে ৩.৮৯ বিলিয়ন ডলারে নেমেছিল। কিন্তু ২০২০ সালের করোনা মহামারীর পর থেকে দৃশ্যপট বদলে যায়। টানা ছয় বছর স্বর্ণের দাম বাড়ার ফলে গত বছর এই মজুদের মূল্য ১০ বিলিয়ন ডলার ছাড়িয়ে যায়।
২০২৬ সালের ৪ ফেব্রুয়ারির হিসাব অনুযায়ী, ব্যাংকটির ১০৪.৪ টন স্বর্ণের বর্তমান বাজারমূল্য দাঁড়িয়েছে ১৬.৫৩ বিলিয়ন ডলারে। অর্থাৎ, ২০১৩ সালের ক্রয়মূল্যের তুলনায় বর্তমানে এটি প্রায় ৩.৫ গুণ বেশি মূল্যবান।
গভর্নর কিমের দেওয়া ‘ক্রাইসিস সিনারিও’ (১৯০০ ডলার প্রতি আউন্স) থেকে স্বর্ণের বর্তমান দাম প্রায় ১৬০% বেশি।
সুযোগ হারানোর আক্ষেপ
বর্তমানে স্বর্ণের মূল্যায়ন বাড়লেও ব্যাংক অফ কোরিয়া সমালোচনার ঊর্ধ্বে নেই। ২০১৩ সালের সেই রাজনৈতিক চাপের কারণে ব্যাংকটি আর স্বর্ণ না কেনায় এখন আক্ষেপ প্রকাশ করছেন খোদ ব্যাংকের সাবেক কর্মকর্তারা।
বৈদেশিক রিজার্ভ ব্যবস্থাপনা বিভাগের এক সাবেক কর্মকর্তা জানান, “রাজনীতিবিদদের সেই কঠোর মনোভাবের কারণে স্বর্ণ কেনা বন্ধ হয়ে গিয়েছিল। এখন দাম এত বেশি যে নতুন করে কেনার সাহস করা কঠিন।”
ওয়ার্ল্ড গোল্ড কাউন্সিলের তথ্যমতে, বর্তমানে দক্ষিণ কোরিয়ার মোট বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভের মাত্র ৩% স্বর্ণ, যা বিশ্বের ১০০টি দেশের মধ্যে ৯৮তম। একদিকে ২০১৩ সালের বিনিয়োগটি এখন লাভজনক হলেও, দীর্ঘ সময় নিষ্ক্রিয় থাকার ফলে বৈশ্বিক মানে দক্ষিণ কোরিয়া স্বর্ণ মজুদে এখনো অনেক পিছিয়ে রয়েছে।