Home Second Lead সমাধান ও সম্ভাবনা: মৃত্যুফাঁদ থেকে ‘গ্রিন ইকোনমি’

সমাধান ও সম্ভাবনা: মৃত্যুফাঁদ থেকে ‘গ্রিন ইকোনমি’

শেষ পর্ব

সিরিজ প্রতিবেদন: মৃত্যুর সৈকতে বিষাক্ত জাহাজ

কামরুল ইসলাম, চট্টগ্রাম:  গত পাঁচ পর্বে আমরা দেখেছি জাহাজ ভাঙা শিল্পের অন্ধকার দিক—মৃত্যু, পরিবেশ বিপর্যয় আর আইনি জালিয়াতি। কিন্তু এই চক্র থেকে কি বের হওয়া সম্ভব? ২০২৫ সালের প্রতিবেদনে এনজিও শিপব্রেকিং প্ল্যাটফর্ম দেখিয়েছে কীভাবে এই ধ্বংসাত্মক শিল্পকে একটি আধুনিক ও লাভজনক ‘বৃত্তাকার অর্থনীতি’তে (Circular Economy) রূপান্তর করা যায়।
 ‘বিচিং’ পদ্ধতির অবসান ও বিশেষজ্ঞ প্রস্তাবনা
সৈকতে জাহাজ নামিয়ে (Beaching) কাটা বন্ধ করাই হলো প্রথম সমাধান। এনজিও শিপব্রেকিং প্ল্যাটফর্মের সিনিয়র কমিউনিকেশন অ্যান্ড পলিসি অ্যাডভাইজার নিকোলা মুলিনারিস এই বিষয়ে অত্যন্ত কড়া অভিমত ব্যক্ত করেছেন।

নিকোলা মুলিনারিস বলেন: “বিপুল সংখ্যক জাহাজ এখন ভাঙার অপেক্ষায় আছে, যার মধ্যে ‘ডার্ক ফ্লিট’ বা ছায়া জাহাজও রয়েছে। এগুলোকে অবশ্যই নিরাপদ, স্বচ্ছ এবং ড্রাইডকের মতো সম্পূর্ণ নিয়ন্ত্রিত ইয়ার্ডে রিসাইকেল করতে হবে। ইউরোপীয় ইউনিয়নে এমন অনেক উন্নত ইয়ার্ড আছে যা বর্তমানে অর্ধেকেরও কম সক্ষমতায় চলছে। নিরাপদ বিকল্প থাকা সত্ত্বেও জাহাজ মালিকরা স্রেফ মুনাফার জন্য সেগুলো পদ্ধতিগতভাবে এড়িয়ে যাচ্ছেন।”

নীতিমালার আমূল সংস্কার ও রাষ্ট্রীয় দায়বদ্ধতা
কেবল হংকং কনভেনশন দিয়ে নিরাপত্তা নিশ্চিত হবে না বলে মনে করেন বিশেষজ্ঞরা। কারণ এই কনভেনশন ‘বিচিং’ বা সৈকতে জাহাজ ভাঙার মতো ত্রুটিপূর্ণ পদ্ধতিকে সরাসরি নিষিদ্ধ করেনি।

নির্বাহী পরিচালক ইংভিল্ড জেনসেনের অভিমত: “হংকং কনভেনশন বর্তমানে পর্যালোচনার অধীনে আছে। এখন সময় এসেছে এর প্রয়োজনীয়তাগুলোকে আরও শক্তিশালী করার এবং প্রাণঘাতী বিচিং পদ্ধতি পর্যায়ক্রমে বন্ধ করার। একই সাথে ব্যাসেল কনভেনশনের প্রয়োগ নিশ্চিত করতে হবে। এর জন্য দায়বদ্ধতা পরিবর্তন করে সেই সব রাষ্ট্রের ওপর দিতে হবে, যাদের নিয়ন্ত্রণে জাহাজ মালিকরা ব্যবসা পরিচালনা করেন।”

সেকেন্ডারি স্টিল: ডিকার্বোনাইজেশনের চাবিকাঠি
জাহাজ ভাঙা থেকে পাওয়া লোহা বা ‘স্ক্র্যাপ স্টিল’ কেবল আবর্জনা নয়, এটি একটি মূল্যবান সম্পদ। এনজিও শিপব্রেকিং প্ল্যাটফর্মের পলিসি অফিসার বেনেডেটা মান্তোয়ান একে ভবিষ্যতের সম্ভাবনা হিসেবে দেখছেন।

বেনেডেটা মান্তোয়ান বলেন: “উদীয়মান আঞ্চলিক কৌশলগুলো এখন কাঁচামালের স্বয়ংসম্পূর্ণতার ওপর জোর দিচ্ছে। এতে স্ক্র্যাপ স্টিল বা জাহাজ ভাঙা লোহা উচ্চমানের কাঁচামাল হিসেবে সবার নজরে এসেছে। স্টিল উৎপাদন ও নির্মাণ খাতের কার্বন নিঃসরণ কমাতে জাহাজ রিসাইক্লিং বড় ভূমিকা রাখতে পারে।”

 ইতিবাচক দৃষ্টান্ত: যারা পথ দেখাচ্ছে
সব কোম্পানিই যে নিয়ম ভাঙছে তা নয়। CMA CGM এবং Höegh Autoliners-এর মতো কোম্পানিগুলো এখন ‘Oppsirk’-এর মতো উদ্ভাবনী স্টার্টআপের সাথে কাজ করছে। তারা জাহাজকে কেবল বর্জ্য হিসেবে না দেখে ‘সম্পদ’ হিসেবে দেখছে এবং নিরাপদ রিসাইক্লিং নিশ্চিত করতে বাজার চালকের ভূমিকা পালন করছে।
 বাংলাদেশের জন্য করণীয়
বিশেষজ্ঞদের মতে, বাংলাদেশের মতো দেশগুলোকে কেবল সস্তা শ্রমের উৎস হিসেবে ব্যবহৃত হলে চলবে না। বরং আন্তর্জাতিক তহবিল ও প্রযুক্তিগত সহায়তা দাবি করতে হবে যাতে ইয়ার্ডগুলোকে প্রকৃত অর্থেই আধুনিক ড্রাইডকে রূপান্তর করা যায়। স্বচ্ছতা নিশ্চিত করতে ইয়ার্ডগুলোতে স্বাধীন তদারকি সংস্থা ও শ্রমিক ইউনিয়নের প্রবেশাধিকার নিশ্চিত করা জরুরি।
জাহাজ ভাঙা শিল্প মানেই মৃত্যু আর দূষণ হতে হবে—এমন কোনো কথা নেই। বিশেষজ্ঞ অভিমত এবং বৈশ্বিক সফল উদাহরণগুলো বলছে, সদিচ্ছা থাকলে এই সৈকতগুলোও হতে পারে পরিবেশবান্ধব অর্থনীতির ভিত্তি।