Home Third Lead রাতের আঁধারে ঘোড়া জবাই, মাংস যেত ‘গরু’র নামে

রাতের আঁধারে ঘোড়া জবাই, মাংস যেত ‘গরু’র নামে

ছবি সংগৃহীত
বিজনেসটুডে২৪ প্রতিনিধি, ঢাকা: গভীর রাত। জনমানবহীন পূর্বাচল উপশহরের ১০ নম্বর সেক্টরের একটি নির্জন প্লট। সেখানে নিঃশব্দে আনা হয়েছিল ২০টি ঘোড়া। উদ্দেশ্য- রাতের অন্ধকারে জবাই করে ভোরের বাজারে ‘গরুর মাংস’ হিসেবে চালিয়ে দেওয়া। কিন্তু স্থানীয়দের সতর্কতায় ভেস্তে গেছে সেই ভয়ঙ্কর জালিয়াতি।
শুক্রবার (২৭ মার্চ) ভোরে রূপগঞ্জের ভাড়ারবাড়ী এলাকায় অভিযান চালিয়ে জবাই করা ৯টি ঘোড়া এবং জীবিত ১১টি ঘোড়া উদ্ধার করেছে পুলিশ। ৯৯৯-এ আসা একটি ফোন কলের সূত্র ধরে এই চক্রের হদিস মেলে।
স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে, একটি অসাধু চক্র দীর্ঘদিন ধরে পূর্বাচলের নির্জন এলাকা ব্যবহার করে এই কাজ করে আসছিল। শুক্রবার ভোরে ঘোড়া জবাইয়ের খবর পেয়ে র‌্যাব ও পুলিশের অভিযান চলে।  উপস্থিতি টের পেয়ে জড়িতরা পালিয়ে গেলেও ফেলে যায় জবাই করা ৯টি ঘোড়া। অভিযোগ রয়েছে, এই মাংস কম দামে বিভিন্ন রেস্তোরাঁ ও মাংসের দোকানে সরবরাহ করা হতো।
সাধারণ মানুষের মনে প্রশ্ন জেগেছে—ঘোড়ার মাংস খাওয়া কি আদতে বৈধ? কিংবা এটি কি স্বাস্থ্যের জন্য ঝুঁকিপূর্ণ?
ধর্মীয় বিধান (ইসলামি দৃষ্টিভঙ্গি): ইসলামি শরিয়াহ অনুযায়ী, ঘোড়ার মাংস খাওয়া নিয়ে আলেমদের মধ্যে মতপার্থক্য থাকলেও অধিকাংশের মতে এটি ‘মাকরুহ তানজিহি’ (অপছন্দনীয় কিন্তু হারাম নয়)। তবে ইমাম আবু হানিফা (র.)-এর মতে এটি মাকরুহ।
অন্যদিকে, বুখারি ও মুসলিম শরিফের হাদিস অনুযায়ী সাহাবায়ে কেরাম খাইবার যুদ্ধের সময় রাসূল (সা.)-এর অনুমতিতে ঘোড়ার মাংস খেয়েছিলেন। তবে যুদ্ধের প্রয়োজনে ঘোড়া সংরক্ষণের খাতিরে এটি এড়িয়ে চলার পরামর্শ দেওয়া হয়।
স্বাস্থ্যগত দিক: পুষ্টিবিজ্ঞানের দৃষ্টিতে ঘোড়ার মাংস উচ্চ প্রোটিন সমৃদ্ধ এবং এতে চর্বি কম থাকে। বিশ্বের অনেক দেশে (যেমন: কাজাখস্তান, জাপান বা ইউরোপের কিছু দেশ) এটি জনপ্রিয়। তবে মূল সমস্যা হলো—উৎস এবং প্রক্রিয়াজাতকরণ।
অসুস্থ বা ইনজেকশন দেওয়া ঘোড়ার মাংস মানবদেহের জন্য বিষাক্ত হতে পারে।
অপরিচ্ছন্ন পরিবেশে জবাই করায় এতে মারাত্মক ব্যাকটেরিয়া (যেমন: সালমোনেলা) থাকতে পারে।
৩. আইনগত ব্যাখ্যা ও দণ্ড: বাংলাদেশে ঘোড়ার মাংস খাওয়া সরাসরি নিষিদ্ধ না হলেও, ‘ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ আইন-২০০৯’ এবং ‘নিরাপদ খাদ্য আইন-২০১৩’ অনুযায়ী এটি একটি বড় অপরাধ। কারণ:
প্রতারণা: ঘোড়ার মাংসকে ‘গরুর মাংস’ বলে বিক্রি করা সরাসরি জালিয়াতি ও প্রতারণা।
মিথ্যা বিজ্ঞাপন: পণ্যের পরিচয় গোপন করে ক্রেতাকে ঠকানোর অপরাধে জেল ও জরিমানার বিধান রয়েছে।

লাইসেন্সবিহীন জবাই: নির্ধারিত কসাইখানা ছাড়া অনিরাপদ স্থানে পশুবধ করা আইনত দণ্ডনীয়।

পূর্ববর্তী ভয়াবহ কিছু ঘটনা:

নারায়ণগঞ্জের এই ঘটনাটি বিচ্ছিন্ন কোনো বিষয় নয়। ইতিপূর্বে দেশের বিভিন্ন স্থানে একই কায়দায় ঘোড়া জবাই ও মাংস বিক্রির বেশ কিছু চাঞ্চল্যকর ঘটনা ঘটেছে:

 গাজীপুরে বিশাল সিন্ডিকেটের হদিস (নভেম্বর ২০২৫): গাজীপুরের হায়দারাবাদ এলাকায় একটি পরিত্যক্ত বাড়িতে হানা দিয়ে র‍্যাব ও জেলা প্রশাসন প্রায় ৪৫টি ঘোড়া উদ্ধার করে। তদন্তে বেরিয়ে আসে, চক্রটি দীর্ঘদিন ধরে অসুস্থ ও বুড়ো ঘোড়া সংগ্রহ করে রাতের আঁধারে জবাই করত। সেই মাংস বস্তাভর্তি করে রাজধানী ঢাকা, উত্তরা ও গাজীপুরের বিভিন্ন নামিদামি রেস্তোরাঁয় ‘গরুর মাংস’ হিসেবে সরবরাহ করা হতো। সেখানে ৮টি ঘোড়া জবাই করা অবস্থায় পাওয়া গিয়েছিল।

টাঙ্গাইলে মাংস প্যাকিংয়ের সময় হাতেনাতে আটক (ফেব্রুয়ারি ২০২৬): টাঙ্গাইলের গোপালপুরে গত মাসেই চারজনকে আটক করে পুলিশ। তারা একটি বাড়িতে ১২টি ঘোড়া এনে তার মধ্যে ৮টি জবাই করে


বাজারে অস্বাভাবিক কম দামে মাংস পাওয়া গেলে বা মাংসের আঁশ ও রঙে ভিন্নতা থাকলে সতর্ক হওয়া প্রয়োজন। এই চক্রের বাকি সদস্যদের ধরতে পুলিশের অভিযান অব্যাহত রয়েছে।