কামরুল ইসলাম, চট্টগ্রাম: গত শতাব্দীর ষাটের দশকে বাঁশখালীর জলদি পাহাড়ে তিনটি কূপ খনন করে তৎকালীন পাকিস্তান শেল অয়েল কোম্পানি। কিন্তু মাটির গভীর থেকে আসা গ্যাসের প্রচণ্ড চাপ (High Pressure) সামলাতে না পেরে এবং কারিগরি বিপর্যয়ের আশঙ্কায় প্রকল্পটিকে ‘ঝুঁকিপূর্ণ’ ও ‘অলাভজনক’ ঘোষণা করে কাজ বন্ধ করে দেওয়া হয়েছিল। দীর্ঘ ৬০ বছর পর আজ প্রশ্ন উঠেছে—তৎকালীন প্রযুক্তির সেই ব্যর্থতা কি আজও জলদির ভাগ্য নির্ধারণ করবে?
অনুসন্ধানে জানা যায়, বিশ্বজুড়ে এবং খোদ বাংলাদেশে এমন অনেক উদাহরণ রয়েছে যেখানে এক সময় ‘পরিত্যক্ত’ ঘোষিত খনি থেকেই আজ আধুনিক প্রযুক্তিতে বিপুল পরিমাণ জ্বালানি আহরণ করা হচ্ছে।
বৈশ্বিক নজির: ভারতের কেজি-ডি৬ (KG-D6) ব্লকের সাফল্য
জলদির মতো প্রায় একই সমস্যায় এক সময় থমকে গিয়েছিল ভারতের অন্ধ্রপ্রদেশ উপকূলের কৃষ্ণ-গোদাবরী অববাহিকা বা কেজি-ডি৬ (KG-D6) ব্লকের অনুসন্ধান। সত্তর ও আশির দশকে ভারতীয় রাষ্ট্রীয় কোম্পানি ওএনজিসি (ONGC) সেখানে কাজ শুরু করেও অতি গভীর সমুদ্র এবং♠ ভূ-তাত্ত্বিক জটিলতার কারণে সফল হতে পারেনি।
পরিবর্তন: পরবর্তীতে রিলায়েন্স ইন্ডাস্ট্রিজ এবং ব্রিটিশ পেট্রোলিয়াম (BP) অত্যাধুনিক ‘ডিপ ওয়াটার ড্রিলিং’ এবং ‘সাব-সি প্রোডাকশন’ প্রযুক্তি ব্যবহার করে সেই পরিত্যক্ত এলাকা থেকেই এশিয়ার অন্যতম বৃহৎ গ্যাস মজুদ আবিষ্কার করে। প্রযুক্তিগত উৎকর্ষই একটি ‘ব্যর্থ’ অঞ্চলকে ভারতের অন্যতম প্রধান জ্বালানি উৎসে পরিণত করেছে।
দেশীয় নজির: ভোলা ও ব্রাহ্মণবাড়িয়ার শিক্ষা
বাংলাদেশের অভ্যন্তরীণ জ্বালানি খাতের ইতিহাসও বলছে—আগে ব্যর্থ হওয়া মানেই শেষ নয়।
ভোলার শাহবাজপুর:
ভোলার শাহবাজপুর গ্যাস ক্ষেত্রেও শুরুর দিকে অনেক চ্যালেঞ্জ ছিল। অতীতে সেখানে খনন করে প্রত্যাশিত ফল না পাওয়ায় এক সময় সংশয় তৈরি হয়েছিল। কিন্তু পরবর্তীতে আধুনিক থ্রি-ডি (3D) সিসমিক সার্ভে এবং বাপেক্সের উন্নত ড্রিলিং প্রযুক্তির মাধ্যমে সেখানে বড় মজুদের সন্ধান মিলেছে।
ব্রাহ্মণবাড়িয়া (তিতাস ও সংলগ্ন এলাকা):
ব্রাহ্মণবাড়িয়ার তিতাস ও বাখরাবাদ গ্যাস ক্ষেত্রেও পুরোনো অনেক কূপ এক সময় পরিত্যক্ত ঘোষণা করা হয়েছিল। বর্তমানে আধুনিক ‘ওয়ার্কওভার’ প্রযুক্তির মাধ্যমে সেই কূপগুলো থেকেই আবার গ্যাস আহরণ করা হচ্ছে, যা জাতীয় গ্রিডে বড় ভূমিকা রাখছে।
জলদিতে আধুনিক প্রযুক্তির যৌক্তিকতা
বিশেষজ্ঞদের মতে, জলদি পাহাড়ের ক্ষেত্রে বর্তমান প্রযুক্তি ব্যবহারের তিনটি প্রধান যৌক্তিক কারণ রয়েছে:
১. HPHT ড্রিলিং প্রযুক্তি: জলদিতে মূলত উচ্চ তাপ ও উচ্চ চাপের (High Pressure High Temperature) কারণে খনন থমকে গিয়েছিল। বর্তমানের ড্রিলিং মাড (Drilling Mud) এবং কাসিং টেকনোলজি এই চাপকে অনায়াসেই নিয়ন্ত্রণ করতে সক্ষম।
২. হরাইজন্টাল ড্রিলিং: আগে শুধু সোজা (Vertical) খনন করা হতো। বর্তমানের প্রযুক্তিতে পাহাড়ের জটিল গঠন ভেদ করে ডানে-বামে বা বাঁকা হয়ে (Directional/Horizontal Drilling) সরাসরি গ্যাস স্তরে পৌঁছানো যায়।
৩. আমদানি বনাম নিজস্ব উৎপাদন: বর্তমানে এলএনজি আমদানিতে বিপুল বৈদেশিক মুদ্রা ব্যয় হচ্ছে। শাহবাজপুর বা কেজি-ডি৬-এর মতো জলদিতেও আধুনিক বিনিয়োগ ও প্রযুক্তি ব্যবহার করলে আমদানির ওপর নির্ভরতা অনেক কমবে।
প্রযুক্তিগত সীমাবদ্ধতার কারণে এক সময় যা ‘পরিত্যক্ত’ ছিল, আজ বিজ্ঞানের আশীর্বাদে তা ‘সোনার খনি’। স্থানীয়রা মনে করেন, জলদি পাহাড়ে আজও গ্যাসের যে বুদবুদ দেখা যায়, তা নিছক কোনো প্রাকৃতিক ঘটনা নয়, বরং এটি ভূ-গর্ভে আটকে থাকা এক বিশাল সম্পদের সংকেত। ভারত বা ভোলার মতো জলদিতেও আধুনিক প্রযুক্তির সমন্বয় ঘটানো গেলে তা বাংলাদেশের জ্বালানি নিরাপত্তার প্রধান স্তম্ভ হয়ে উঠতে পারে।