একটি প্রতিষ্ঠানের মূল চালিকাশক্তি হলো তার দক্ষ ও মেধাবী জনবল। কিন্তু বর্তমান কর্পোরেট সংস্কৃতিতে এক নীরব মহামারী হিসেবে জেঁকে বসেছে ‘অফিস রাজনীতি’। যোগ্যতা ও পারফরম্যান্সের চেয়ে যখন গ্রুপিং, তোষামোদ আর কাদা ছড়াছড়ি প্রধান হয়ে ওঠে, তখন সবচেয়ে বড় ধাক্কাটি আসে প্রতিষ্ঠানের ওপরই। রাজনীতির নোংরা খপ্পরে পড়ে প্রতিনিয়ত অসংখ্য যোগ্য ও দক্ষ কর্মী নীরবে প্রতিষ্ঠান ছেড়ে চলে যাচ্ছেন। এই মেধা পাচারের ফলে প্রতিষ্ঠানগুলো হারাচ্ছে তাদের সেরা সম্পদ, যা দীর্ঘমেয়াদে তাদের দেউলিয়া করে তুলছে।
মেধার মূল্যায়ন বনাম তোষামোদের সংস্কৃতি
যেকোনো সুস্থ কর্মপরিবেশে কর্মীরা আশা করেন তাদের মেধা, পরিশ্রম এবং কাজের ফলাফল দেখে তাদের মূল্যায়ন করা হবে। কিন্তু যে সব প্রতিষ্ঠানে অভ্যন্তরীণ রাজনীতি প্রবল, সেখানে দৃশ্যপট একদম উল্টো। সেখানে বসের গুড বুকে থাকা বা বিশেষ কোনো সিন্ডিকেটের অংশ হওয়াটাই পদোন্নতি ও সুযোগ-সুবিধার মূল চাবিকাঠি হয়ে দাঁড়ায়।
যখন একজন দক্ষ কর্মী দেখেন যে তার দিনরাত এক করা পরিশ্রমের কোনো স্বীকৃতি নেই, বরং টেবিলের তলা দিয়ে বা কানের কাছে ফিসফিসানি করে অযোগ্য কেউ ওপরে উঠে যাচ্ছে, তখন তার কাজের স্পৃহা নষ্ট হয়ে যায়। এই প্রাতিষ্ঠানিক বৈষম্যই মেধা পাচারের প্রথম ধাপ।
সুস্থ কর্মপরিবেশের মৃত্যু এবং মানসিক ক্লান্তি
অফিস পলিটিক্স কর্মক্ষেত্রকে একটি যুদ্ধক্ষেত্রে পরিণত করে। যেখানে প্রতিদিন কাজে আসার মূল লক্ষ্য হওয়া উচিত উৎপাদনশীলতা বাড়ানো, সেখানে কর্মীদের ব্যস্ত থাকতে হয় কে কার পেছনে কাঠি করল তা সামলাতে।
দক্ষ কর্মীরা সাধারণত কাজের পেছনে শক্তি খরচ করতে পছন্দ করেন, নোংরা রাজনীতিতে নয়। যখন কাজের চেয়ে নিজেকে বাঁচানোর লড়াইয়ে বেশি শক্তি ক্ষয় করতে হয়, তখন তীব্র মানসিক ক্লান্তি বা ‘বার্নআউট’ তৈরি হয়। বিষাক্ত এই পরিবেশ থেকে নিজের মানসিক স্বাস্থ্য এবং আত্মসম্মান বাঁচাতে তারা একসময় পদত্যাগপত্র জমা দিতে বাধ্য হন।
প্রতিষ্ঠান যেভাবে নিজের পায়ে কুড়াল মারছে
অনেক অপেশাদার বা অদূরদর্শী দূরত্বের ম্যানেজমেন্ট মনে করে, ‘একজন গেলে আরেকজন আসবে’। কিন্তু বাস্তবতা হলো, একজন সাধারণ কর্মী আর একজন ‘কি পারসন’ বা দক্ষ কর্মীর মধ্যে আকাশ-পাতাল তফাৎ। দক্ষ কর্মীর বিদায়ের ফলে প্রতিষ্ঠান যে সব বড় ক্ষতির মুখে পড়ে:
উৎপাদনশীলতা ও গুণগত মান হ্রাস: বিদায়ী কর্মীর কাজের মান এবং কাজের গতি হুট করে নতুন কেউ এসে পূরণ করতে পারে না। ফলে প্রজেক্টের মান পড়ে যায়।
আর্থিক ক্ষতি: একজন দক্ষ কর্মীর বিকল্প খুঁজে বের করা, তাকে ট্রেইনিং দেওয়া এবং থিতু করার পেছনে যে বিপুল পরিমাণ সময় ও অর্থ ব্যয় হয়, তা প্রতিষ্ঠানের জন্য বড় লস।
অন্যান্য কর্মীদের মনোবল ভাঙন: যখন সবাই দেখে একজন যোগ্য মানুষ রাজনীতির শিকার হয়ে চলে গেলেন, তখন বাকি ভালো কর্মীদের মধ্যেও এক ধরণের অস্থিতিশীলতা ও ভয় কাজ করে। তারাও ভেতরে ভেতরে নতুন চাকরি খোঁজা শুরু করেন।
মেধা পাচার রোধে করণীয়
প্রতিষ্ঠানকে যদি টিকিয়ে রাখতে হয়, তবে শীর্ষ নেতৃত্বকে চোখ-কান খোলা রাখতে হবে। শুধু প্রজেক্টের ডেডলাইন দেখলে হবে না, ভেতরের পরিবেশ কেমন তাও পর্যবেক্ষণ করতে হবে।
এর জন্য পারফরম্যান্স রিভিউ সিস্টেম সম্পূর্ণ স্বচ্ছ এবং ডেটা-ভিত্তিক করা জরুরি, যেখানে কারো ব্যক্তিগত পছন্দ-অপছন্দের সুযোগ থাকবে না। এছাড়া হিউম্যান রিসোর্স (HR) বিভাগকে কেবল নামকাওয়াস্তে না রেখে স্বাধীনভাবে কাজ করতে দিতে হবে, যেন কর্মীরা যেকোনো অন্যায়ের বিরুদ্ধে নির্ভয়ে অভিযোগ জানাতে পারেন।
দিনশেষে, রাজনীতি করে সাময়িকভাবে কিছু মানুষ সুবিধা পেতে পারে, কিন্তু দীর্ঘমেয়াদে পুরো প্রতিষ্ঠানটিই ধ্বংসের মুখে পড়ে। মেধা ধরে রাখতে না পারলে কোনো প্রতিষ্ঠানই প্রতিযোগিতামূলক বাজারে টিকে থাকতে পারে না। তাই সময় থাকতেই এই বিষাক্ত কালচার রুখে দেওয়া জরুরি।