Home অন্যান্য সতীত্ব ভঙ্গের অপরাধে কুমারী সেবিকাদের ‘জীবন্ত সমাধি’

সতীত্ব ভঙ্গের অপরাধে কুমারী সেবিকাদের ‘জীবন্ত সমাধি’

ফিচার
প্রাচীন রোমের অন্ধকার অধ্যায়: (দ্বিতীয় ও শেষ পর্ব)
স্মৃতি সরকার
প্রথম পর্বে আমরা জেনেছি প্রাচীন রোমের সবচেয়ে সম্মানিত এবং অলৌকিক ক্ষমতার অধিকারী ‘ভেস্টাল ভার্জিন’ বা সতী কুমারী সেবিকাদের কথা। সমাজে তাদের মর্যাদা যেমন আকাশচুম্বী ছিল, তেমনি তাদের ওপর ছিল কঠোর সতীত্ব রক্ষার নিয়ম। কোনো সেবিকার বিরুদ্ধে সতীত্ব ভঙ্গের বা পবিত্রতা নষ্টের সামান্যতম সন্দেহ বা প্রমাণ মিললে রোমান শাসকেরা তার জন্য যে ভয়াবহ শাস্তি নির্ধারণ করে রেখেছিল, তা শুনলে আজও শিউরে উঠতে হয়।
রক্তপাতহীন কিন্তু মৃত্যুর চেয়েও নির্মম— সেই ‘জীবন্ত সমাধি’ কীভাবে কার্যকর করা হতো এবং রোমের সেই গোপন অন্ধকার কুঠুরিতে শেষ পর্যন্ত কী ঘটত, আজ উন্মোচিত হবে সেই ইতিহাস।
ক্যাম্পাস স্কেলেরাটাস: রোমের সবচেয়ে অভিশপ্ত প্রান্তর
রোমান আইন অনুযায়ী, ভেস্টাল ভার্জিনদের শরীর অত্যন্ত পবিত্র ছিল। তাই তাদের শরীরে কোনো তরবারি ছোঁয়ানো বা রক্তপাত ঘটানো সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ ছিল। কিন্তু অপরাধের শাস্তি তো দিতেই হবে! তাই রোমের শাসকেরা এক কুৎসিত ও চতুর পথ বেছে নিয়েছিল— রক্তপাতহীন এক ধীর, যন্ত্রণাদায়ক মৃত্যু।
শাস্তি কার্যকরের জন্য রোমের উত্তর গেটের কাছে একটি বিশেষ প্রান্তর বেছে নেওয়া হয়েছিল। স্থানটির নাম ছিল ‘ক্যাম্পাস স্কেলেরাটাস’বা ‘অভিশপ্ত প্রান্তর’। এই প্রান্তরে মাটির নিচে তৈরি করা হতো ছোট ছোট গোপন পাথুরে কুঠুরি বা সেল। বাইরে থেকে বোঝার কোনো উপায় ছিল না যে, মাটির নিচে এমন একটি মৃত্যুর ফাঁদ লুকিয়ে আছে।
যেভাবে শুরু হতো শেষ যাত্রা
কোনো ভেস্টাল ভার্জিনের বিরুদ্ধে সতীত্ব ভঙ্গের অভিযোগ বা ‘ইনসেস্টাস’ প্রমাণিত হলে, রোম জুড়ে নেমে আসত শোক ও ভয়ের ছায়া। সেই উৎসবের শহর আচমকা স্তব্ধ হয়ে যেত। সাজাপ্রাপ্ত সেবিকাকে প্রথমে তার সমস্ত রাষ্ট্রীয় সম্মান ও পবিত্র পোশাক থেকে বঞ্চিত করা হতো। তাকে পরানো হতো একটি সাধারণ মৃতদেহের কাফন বা চাদর।
এরপর তাকে একটি সম্পূর্ণ বন্ধ এবং চামড়া দিয়ে মোড়ানো পালকিতে তোলা হতো, যাতে তার কান্নার আওয়াজ বাইরে আসতে না পারে। রোমের বুক চিরে যখন এই পালকি ক্যাম্পাস স্কেলেরাটাসের দিকে এগিয়ে যেত, রাস্তার দুই পাশে হাজার হাজার রোমান নাগরিক পিনপতন নীরবতায় দাঁড়িয়ে থাকত। কেউ একটি কথাও বলত না, কারণ বিশ্বাস করা হতো এই নীরবতা দেবী ভেস্টার প্রতি ভয়ের প্রতীক।
সেই অন্ধকার কুঠুরির লোমহর্ষক বাস্তবতা
অভিশপ্ত প্রান্তরে পৌঁছানোর পর পালকি থেকে নামানো হতো সেই হতভাগ্য নারীকে। প্রধান পুরোহিত আকাশের দিকে হাত তুলে দেবতাদের উদ্দেশ্যে কিছু গোপন প্রার্থনা করতেন। এরপর মাটির নিচে চলে যাওয়া সেই সংকীর্ণ সুড়ঙ্গের মুখটি খুলে দেওয়া হতো, যেখানে অপেক্ষা করত একটি মই।
নিয়ম অনুযায়ী, সেই নারীকে নিজের পায়ে হেঁটে ওই মই বেয়ে মাটির নিচের অন্ধকার কুঠুরিতে নামতে হতো। সেই কুঠুরিটি ছিল অত্যন্ত ছোট এবং দমবন্ধ করা। সেখানে আগে থেকেই রাখা থাকত:
  • একটি ছোট বিছানা
  • একটি তেলের প্রদীপ (সামান্য আলোর জন্য)
  • সামান্য কিছু রুটি, জল, দুধ এবং তেল
রোমানরা পৃথিবীকে দেখাতে চাইত যে তারা সরাসরি কোনো সেবিকাকে না খাইয়ে মারছে না (যা ধর্মীয়ভাবে পাপ ছিল), বরং তারা তাকে বেঁচে থাকার ন্যূনতম রসদ দিচ্ছে। কিন্তু বাস্তবতা ছিল এটি এক চরম ভণ্ডামি।
শেষ প্রদীপ এবং এক ধীর, নির্মম মৃত্যু
নারীটি কুঠুরিতে নেমে যাওয়ার পরপরই জল্লাদেরা মইটি ওপরে তুলে নিত। এরপর বিশাল একটি পাথর দিয়ে সুড়ঙ্গের প্রবেশপথটি চিরতরে বন্ধ করে দেওয়া হতো। শুধু তাই নয়, ওপর থেকে প্রচুর পরিমাণে মাটি ফেলে স্থানটিকে চারপাশের মাটির সাথে একদম সমান করে দেওয়া হতো, যাতে ভবিষ্যতে কেউ বুঝতেও না পারে এখানে কোনো মানুষের কবর রয়েছে। ইতিহাসের পাতা থেকে সেই নারীর নাম এবং চিহ্ন চিরতরে মুছে দেওয়া হতো।
মাটির নিচের সেই নিকষ কালো অন্ধকারে, তেলের প্রদীপের টিমটিমে আলোয় একা বসে থাকতেন সেই প্রাক্তন সেবিকা। প্রদীপের তেল ফুরিয়ে যাওয়ার সাথে সাথে চারপাশ গ্রাস করত অনন্ত অন্ধকার। ফুরিয়ে আসত কুঠুরির সীমিত অক্সিজেন। ক্ষুধা, তৃষ্ণা এবং তীব্র মানসিক ট্রমা বা আতঙ্কে ধীরে ধীরে মৃত্যুর কোলে ঢলে পড়তেন রোমের একসময়ের সবচেয়ে ক্ষমতাধর এই দেবকন্যারা।
প্রাচীন রোমের এই অন্ধকার অধ্যায় আমাদের মনে করিয়ে দেয়, সভ্যতার জাঁকজমক আর আইনের আড়ালে ধর্মীয় অন্ধত্ব এবং রাজনৈতিক স্বার্থ কীভাবে মানবতাকে পদদলিত করতে পারে।
নিয়মিত এমন বৈচিত্র্যময় ঐতিহাসিক ও তথ্যসমৃদ্ধ ফিচার প্রতিবেদন পড়তে এবং আপনার মূল্যবান মতামত জানাতে Visit www.businesstoday24.com