Home অন্যান্য হরমুজ বন্ধ, বিশ্ব অচল: অর্থনীতি ও রাজনীতির টালমাটাল অবস্থা

হরমুজ বন্ধ, বিশ্ব অচল: অর্থনীতি ও রাজনীতির টালমাটাল অবস্থা

ডিএন রাকেশ, বিলোনিয়া, ত্রিপুরা:২০২৬ সালের ২৮ ফেব্রুয়ারি মধ্যপ্রাচ্যের ইতিহাসে এক প্রলয়ঙ্কারী দিন হিসেবে চিহ্নিত হয়ে থাকবে, যখন মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র এবং ইসরায়েলের যৌথ বাহিনী ইরানের বিরুদ্ধে “অপারেশন এপিক ফিউরি” (Operation Epic Fury) শুরু করে। এই অভিযানের শুরুতেই এক অভাবনীয় নাটকীয়তায় ইরানের দ্বিতীয় সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলী খামেনেই এক বিমান হামলায় নিহত হন, যা কেবল ইরানের অভ্যন্তরীণ রাজনীতিতেই নয়, বরং সমগ্র বিশ্ব ভূ-রাজনীতিতে এক বিশাল কম্পন সৃষ্টি করে।
এই হত্যাকাণ্ডের পরবর্তী এক সপ্তাহের মধ্যে ইরানের ৮৮ সদস্যের বিশেষজ্ঞ পরিষদ (Assembly of Experts) এক জরুরি বৈঠকে আলী খামেনেইর ৫৬ বছর বয়সী দ্বিতীয় পুত্র মোজতবা খামেনেইকে দেশের তৃতীয় সর্বোচ্চ নেতা হিসেবে ঘোষণা করে ।
সমালোচকরা এই উত্তরাধিকারকে ১৯৭৯ সালের বিপ্লবের আদর্শের পরিপন্থী এবং একটি ‘ধর্মীয় রাজতন্ত্রের’ সূচনা হিসেবে অভিহিত করলেও, ইসলামিক রেভল্যুশনারি গার্ড কর্পস (IRGC) দ্রুত তার প্রতি আনুগত্য প্রকাশ করে দেশটির ক্ষমতা কাঠামোতে নিজেদের নিরঙ্কুশ নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করে।
মোজতবা খামেনেইর এই অভিষেক এমন এক সময়ে ঘটে যখন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ইরানকে সামরিক ও অর্থনৈতিকভাবে পঙ্গু করে দেওয়ার জন্য এক নজিরবিহীন আক্রমণাত্মক নীতি গ্রহণ করেছেন। ১ এপ্রিল ২০২৬-এ হোয়াইট হাউস থেকে দেওয়া এক জাতীয় ভাষণে ট্রাম্প ঘোষণা করেন যে, ইরানের নৌবাহিনী এখন ইতিহাসের অংশ এবং তাদের বিমান বাহিনী ধ্বংসস্তূপে পরিণত হয়েছে ।
তিনি ইরানকে সতর্ক করে দিয়ে বলেন যে, যদি তারা মার্কিন শর্তে শান্তি চুক্তিতে রাজি না হয়, তবে আগামী দুই থেকে তিন সপ্তাহের মধ্যে দেশটিকে বোমায় উড়িয়ে ‘প্রস্তর যুগে’ (Stone Age) ফিরিয়ে নেওয়া হবে।
ট্রাম্পের এই ‘প্রস্তর যুগ’ হুমকির মূল লক্ষ্য ছিল ইরানের গুরুত্বপূর্ণ অসামরিক অবকাঠামো, যার মধ্যে রয়েছে বিদ্যুৎ উৎপাদন কেন্দ্র, জল শোধনাকার এবং খামেনেইর শাসনের অর্থনৈতিক ভিত্তি হিসেবে পরিচিত খার্গ দ্বীপের তেল টার্মিনাল। ইতিমধ্যই মার্কিন বাহিনী তেহরান ও কারাজের সংযোগকারী গুরুত্বপূর্ণ বি১ (বিলেঘান) সেতুটি ধ্বংস করে দিয়েছে, যা ইরানের অভ্যন্তরীণ যোগাযোগ ও ক্ষেপণাস্ত্র পরিবহনের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ছিল।
এই সামরিক উত্তেজনার সমান্তরালে বৈশ্বিক অর্থনীতিতে যে বিপর্যয় নেমে এসেছে, তা আধুনিক ইতিহাসে বিরল। ইরান কর্তৃক ৪ মার্চ ২০২৬-এ হরমুজ প্রণালী বন্ধ করে দেওয়ার ফলে বিশ্ববাজারে তেলের সরবরাহ এক-পঞ্চমাংশ হ্রাস পেয়েছে। এর ফলে ব্রেন্ট ক্রুড তেলের দাম ব্যারেল প্রতি ১২০ ডলার ছাড়িয়ে গেছে এবং আমেরিকার বাজারে পেট্রোলের দাম প্রতি গ্যালন ৪ ডলারের ওপরে পৌঁছেছে।
হরমুজ প্রণালীর এই অবরোধ কেবল জ্বালানি সংকটই তৈরি করেনি, বরং উপসাগরীয় দেশগুলোর (GCC) জন্য এক তীব্র খাদ্য সংকট সৃষ্টি করেছে, কারণ তারা তাদের খাদ্য চাহিদার ৮০ শতাংশ আমদানির জন্য এই জলপথের ওপর নির্ভরশীল। কাতার এনার্জি তাদের সমস্ত রপ্তানির ওপর ‘ফোর্স মেজিউর’ ঘোষণা করেছে, যা চীন, ভারত এবং জাপানের মতো বড় অর্থনীতির দেশগুলোকে শিল্প স্থবিরতার মুখে ঠেলে দিয়েছে।
এই পরিস্থিতির মধ্যে প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প বিশ্বনেতাদের প্রতি আহ্বান জানিয়েছেন যাতে তারা নিজ উদ্যোগে হরমুজ প্রণালীতে গিয়ে নিজেদের তেল ‘ছিনিয়ে’ নেয়, যা আন্তর্জাতিক সমুদ্র আইনের প্রতি সরাসরি অবজ্ঞা হিসেবে দেখা হচ্ছে।
ভূ-রাজনৈতিক এই দাবার বোর্ডে রাশিয়ার ভূমিকা এখন অত্যন্ত রহস্যময় এবং তাৎপর্যপূর্ণ। যদিও যুদ্ধের ফলে তেলের দাম বাড়ায় রাশিয়ার কোষাগারে অতিরিক্ত রাজস্ব জমা হচ্ছে, তবে ক্রেমলিন প্রকাশ্যে মার্কিন আগ্রাসনের তীব্র নিন্দা জানিয়েছে । রাশিয়ার বৈদেশিক গোয়েন্দা সংস্থা এসভিআর (SVR) প্রধান সের্গেই নারিশকিন ১ এপ্রিল নিশ্চিত করেছেন যে, তারা মধ্যপ্রাচ্যের পরিস্থিতি নিয়ে মার্কিন সিআইএ (CIA) প্রধান জন র‍্যাটক্লিফের সাথে নিয়মিত যোগাযোগ রাখছেন ।
পুতিন সরকার একদিকে ইরানকে প্রযুক্তিগত ও গোয়েন্দা সহায়তা দিচ্ছে, অন্যদিকে সৌদি আরব ও মিশরের মতো দেশগুলোর সাথে নিয়মিত আলোচনার মাধ্যমে নিজেকে প্রধান মধ্যস্থতাকারী হিসেবে তুলে ধরার চেষ্টা করছে । রাশিয়ার প্রস্তাবিত ৩-দফা শান্তি পরিকল্পনা—অবিলম্বে শত্রুতা বন্ধ, শক্তির প্রয়োগ বর্জন এবং কূটনৈতিক পথে ফেরা—এখন অনেক দেশের কাছেই একমাত্র বিকল্প হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে ।
পাকিস্তানের পরিস্থিতি এই সংকটে সবচেয়ে বেশি করুণ। ইসলামাবাদ নিজেকে শান্তি আলোচনার কেন্দ্রবিন্দু বা ‘ভেন্যু’ হিসেবে প্রস্তাব করলেও, ইরান তাদের মধ্যস্থতা প্রচেষ্টাকে সরাসরি প্রত্যাখ্যান করেছে। ইরানের পক্ষ থেকে স্পষ্ট করে দেওয়া হয়েছে যে, পাকিস্তান কেবল মার্কিন বার্তার বাহক হিসেবে কাজ করছে এবং তেহরান সরাসরি ওয়াশিংটনের সাথে কোনো আলোচনায় বসবে না। পাকিস্তানের এই কূটনৈতিক ব্যর্থতার অন্যতম কারণ হলো তাদের নিজস্ব অভ্যন্তরীণ ও সীমান্ত নিরাপত্তা সংকট।
ফেব্রুয়ারি থেকে পাকিস্তান আফগানিস্তানের তালিবান সরকারের সাথে ‘অপারেশন গজব লিল-হক’ (Operation Ghazab lil-Haq) নামক এক রক্তক্ষয়ী যুদ্ধে লিপ্ত রয়েছে। নিজ সীমান্তে শান্তি বজায় রাখতে ব্যর্থ একটি রাষ্ট্রের পক্ষে দুই পরাশক্তির মধ্যে মধ্যস্থতা করা কার্যত অসম্ভব হয়ে দাঁড়িয়েছে। চীনের উরুমকিতে আয়োজিত ত্রিপক্ষীয় বৈঠকেও পাকিস্তান তালিবানদের সাথে কোনো বড় ধরনের সমঝোতায় পৌঁছাতে পারেনি ।
ইরানের নতুন নেতৃত্ব এই সামরিক ও কূটনৈতিক চাপের মুখে নতি স্বীকার করতে নারাজ। ১ এপ্রিল মার্কিন হামলায় ইরানের অভিজ্ঞ কূটনীতিক কামাল খাররাজি গুরুতর আহত হওয়া এবং তার স্ত্রীর মৃত্যুর পর তেহরানের সুর আরও কঠোর হয়েছে । ইরান যুদ্ধের অবসানের জন্য পাঁচটি কঠিন শর্ত দিয়েছে, যার মধ্যে রয়েছে মার্কিন আগ্রাসনের ক্ষতিপূরণ প্রদান এবং হরমুজ প্রণালীর ওপর ইরানের পূর্ণ সার্বভৌমত্বের স্বীকৃতি।
মার্কিন প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের ১৫ দফার প্রস্তাবকে ‘অযৌক্তিক’ আখ্যা দিয়ে মোজতবা খামেনেইর অনুগত আইআরজিসি (IRGC) ঘোষণা করেছে যে, তারা মার্কিন প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠান যেমন অ্যাপল, গুগল ও মেটার ওপর সাইবার বা ক্ষেপণাস্ত্র হামলা চালাতে দ্বিধা করবে না।
এই অনমনীয় মনোভাব এবং ট্রাম্পের ‘প্রস্তর যুগ’ হুমকির সংঘাত মধ্যপ্রাচ্যকে এমন এক অন্ধকার গহ্বরে নিয়ে যাচ্ছে, যেখান থেকে উত্তরণের পথ দিন দিন সংকীর্ণ হয়ে আসছে।
পরিশেষে, ২০২৬ সালের এই ইরান যুদ্ধ বিশ্বকে এক নতুন মেরুকরণের দিকে ঠেলে দিয়েছে, যেখানে একদিকে মার্কিন একতরফাবাদ এবং অন্যদিকে রাশিয়া-চীন সমর্থিত একটি নতুন আঞ্চলিক অক্ষের মধ্যে টিকে থাকার লড়াই তীব্রতর হচ্ছে।
(লেখক পেশায় একজন ইতিহাসের  ও রাষ্ট্রবিজ্ঞানের শিক্ষক। প্রাক্তন সাংবাদিক ও কলামিস্ট)