বিশ্বজুড়ে জনপ্রিয়তার শীর্ষে থাকা পানীয় চা নিয়ে সম্প্রতি একটি চাঞ্চল্যকর তথ্য সামনে এসেছে। আমরা যখন আয়েশ করে চায়ের কাপে চুমুক দিই, তখন কি কেবল চা-ই পান করছি, নাকি তার সঙ্গে মিশে যাচ্ছে কোটি কোটি ক্ষুদ্র প্লাস্টিক কণা? ১৯টি বৈজ্ঞানিক গবেষণার একটি সাম্প্রতিক পর্যালোচনা এই প্রশ্নেরই উত্তর খোঁজার চেষ্টা করেছে।
প্লাস্টিকের অদৃশ্য হানা: এমএনপি (MNP) কী?
গবেষকরা প্রধানত মাইক্রোপ্লাস্টিক এবং ন্যানোপ্লাস্টিক (একত্রে MNPs) নিয়ে কাজ করেছেন। এই কণাগুলো এতই ক্ষুদ্র যে খালি চোখে দেখা অসম্ভব। একটি মানুষের চুল যতটা পুরু, এই কণাগুলো তার চেয়েও অনেক গুণ ছোট হতে পারে। গবেষণায় দেখা গেছে, প্যাকেজিং, প্রক্রিয়াজাতকরণ এবং এমনকি চা তৈরির উপকরণের মাধ্যমে এই প্লাস্টিক চায়ে মিশতে পারে।
টি-ব্যাগ: কাগজ নাকি প্লাস্টিক?
অনেকেই মনে করেন টি-ব্যাগ মানেই তা কাগজ দিয়ে তৈরি। কিন্তু গবেষকরা বলছেন, বাস্তবতা ভিন্ন।
প্লাস্টিক মেশ: অনেক পিরামিড আকৃতির স্যাশে বা ব্যাগে প্লাস্টিক মেশ ব্যবহার করা হয়।
তাপ-নিরোধক স্তর: সাধারণ কাগজের ব্যাগেও অনেক সময় মুখ বন্ধ করার জন্য পলিপ্রোপিলিনের একটি স্তর থাকে।
বায়ো-প্লাস্টিক: এমনকি ‘কম্পোস্টেবল’ বা ‘বায়োডিগ্রেডেবল’ হিসেবে দাবি করা ব্যাগেও প্লাস্টিকের উপস্থিতি পাওয়া গেছে।
পিলে চমকানো পরিসংখ্যান: গবেষণার একটি পরীক্ষায় দেখা গেছে, একটি মাত্র প্লাস্টিক টি-ব্যাগ গরম পানিতে প্রায় ১৪৭০ কোটি (১৪.৭ বিলিয়ন) ক্ষুদ্র কণা নির্গত করতে পারে। অন্য একটি গবেষণায় এই সংখ্যা পাওয়া গেছে প্রায় ১৩০ কোটি। এমনকি উদ্ভিদজাত প্লাস্টিক (PLA) দিয়ে তৈরি ব্যাগ থেকেও উল্লেখযোগ্য পরিমাণ কণা নির্গত হতে দেখা গেছে।
স্বাস্থ্যের ওপর প্রভাব কতটুকু?
গবেষণাটি সরাসরি মানুষের ওপর কোনো ক্লিনিকাল ট্রায়াল না চালালেও ল্যাবরেটরিতে কিছু উদ্বেগজনক ফলাফল পেয়েছে:
জলজ প্রাণীর ওপর প্রভাব: প্লাস্টিক মিশ্রিত পানিতে থাকা ‘ড্যাফনিয়া’ নামক জলজ পোকার শরীরে অস্বাভাবিক শারীরিক গঠন ও চলাফেরায় দুর্বলতা দেখা গেছে।
কোষের ওপর পরীক্ষা: মানুষের অন্ত্রের কোষের মডেলে পরীক্ষা করে দেখা গেছে, কোষগুলো এই প্লাস্টিক কণা গ্রহণ করছে। তবে স্বল্পমেয়াদী পরীক্ষায় কোষের বড় কোনো ক্ষতি বা মৃত্যু লক্ষ্য করা যায়নি।
রাসায়নিকের ঝুঁকি: প্লাস্টিক একা আসে না; এর সাথে থাকে বিভিন্ন রাসায়নিক উপাদান যেমন প্লাস্টিসাইজার এবং বিসফেনল-টাইপ যৌগ। ফুটন্ত গরম পানি এই রাসায়নিকগুলোকে টি-ব্যাগ থেকে বের করে চায়ে মিশিয়ে দিতে পারে, যা দীর্ঘমেয়াদে শরীরের জন্য চিন্তার কারণ হতে পারে।
সংবাদটি আতঙ্কিত হওয়ার জন্য নয়, বরং সচেতন হওয়ার জন্য। গবেষকদের মতে, প্লাস্টিক কণার এই সংখ্যা ল্যাবরেটরির পরিমাপ পদ্ধতির ওপর নির্ভর করে ভিন্ন হতে পারে। তবে প্লাস্টিকমুক্ত জীবনযাপনে অভ্যস্ত হতে চাইলে টি-ব্যাগের বদলে সরাসরি চা পাতা ব্যবহার করা একটি নিরাপদ বিকল্প হতে পারে।
‘ফুড কেমিস্ট্রি’ (Food Chemistry) সাময়িকীতে এই পূর্ণাঙ্গ গবেষণাটি প্রকাশিত হয়েছে।