আন্তর্জাতিক ডেস্ক:
করাচির শাদমান টাউনে ‘অনার’ বা সম্মানের দোহাই দিয়ে স্ত্রীকে গুলি করার অভিযোগে এক কর্মরত পুলিশ ইন্সপেক্টরকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। শনিবার সেন্ট্রাল জোনাল এসএসপি জিশান শফিক সিদ্দিকি এই তথ্য নিশ্চিত করেন।
ঘটনা: গত শুক্রবার ৪০ বছর বয়সী এক নারী তার নিজ বাড়িতে স্বামীর গুলিতে আহত হন (পরবর্তীতে মৃত্যুঝুঁকি বা অবস্থা অনুযায়ী মামলা রুজু হয়)।
অভিযুক্ত: গ্রেপ্তারকৃত ব্যক্তি স্পেশাল ইনভেস্টিগেশন ইউনিটে (SIU) কর্মরত একজন পুলিশ ইন্সপেক্টর।
কারণ: প্রাথমিক তদন্তে জানা গেছে, এটি একটি পারিবারিক কলহ। অভিযুক্তের এটি দ্বিতীয় বিয়ে ছিল। তার সন্দেহ ছিল যে, তার স্ত্রী এখনও তার প্রাক্তন স্বামীর সাথে যোগাযোগ রাখছেন।
বর্তমান অবস্থা: অভিযুক্তের কাছ থেকে হত্যাকাণ্ডে ব্যবহৃত অস্ত্র উদ্ধার করা হয়েছে এবং তার বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থা গ্রহণ করা হচ্ছে।
পাকিস্তানে ‘অনার কিলিং’ বা সম্মান রক্ষার্থে হত্যা একটি গভীর সামাজিক ক্ষত বা সংক্রামক ব্যাধির মতো ছড়িয়ে আছে। এটি এমন এক নৃশংস প্রথা যেখানে পরিবারের কোনো সদস্যকে (অধিকাংশ ক্ষেত্রে নারী) এই সন্দেহে হত্যা করা হয় যে, তিনি পরিবারের “সম্মান” ক্ষুণ্ণ করেছেন।
এই প্রথাটি মূলত প্রাক-ইসলামিক উপজাতীয় সংস্কৃতি থেকে উদ্ভূত বলে মনে করা হয়, যা পাকিস্তান ও আফগানিস্তানের গ্রামীণ এবং উপজাতীয় অঞ্চলে শিকড় গেড়ে আছে।
শুরু: এই প্রথা শতাব্দীর পর শতাব্দী ধরে চলে আসছে, তবে ১৯৯০-এর দশক থেকে মানবাধিকার সংস্থাগুলো এটি নিয়ে জোরালোভাবে সোচ্চার হতে শুরু করে।
কারণ: তথাকথিত ‘অবৈধ সম্পর্ক’, নিজের পছন্দে বিয়ে করা, এমনকি পরপুরুষের সাথে কথা বলার সন্দেহেও নারীকে হত্যা করা হয়। সিন্ধু প্রদেশে একে ‘কারো-কারি’ বলা হয়।
পরিসংখ্যান: হিউম্যান রাইটস কমিশন অফ পাকিস্তান (HRCP)-এর মতে, প্রতি বছর দেশটিতে গড়ে ১,০০০-এর বেশি নারী এই নিষ্ঠুরতার শিকার হন।
দীর্ঘকাল ধরে অপরাধীরা ‘দিয়াত’ বা রক্তপণ আইনের ফাঁকফোকর ব্যবহার করে পার পেয়ে যেত, যেখানে নিহতের পরিবার (যারা প্রায়ই হত্যাকারীরও আত্মীয়) হত্যাকারীকে ক্ষমা করে দিতে পারত। তবে ক্রমবর্ধমান চাপের মুখে পাকিস্তান সরকার কিছু গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ নিয়েছে:
১. অনার কিলিং বিরোধী আইন (২০১৬): ২০১৬ সালে পাকিস্তান পার্লামেন্টে একটি কঠোর আইন পাস করা হয়। এই আইনের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো—পরিবার ক্ষমা করে দিলেও অপরাধী শাস্তি থেকে পুরোপুরি রেহাই পাবে না। অপরাধীকে অন্তত যাবজ্জীবন কারাদণ্ড ভোগ করতে হবে। ২. ন্যায়বিচারের বিশেষ আদালত: এই ধরণের মামলা দ্রুত নিষ্পত্তির জন্য বিভিন্ন সময় বিশেষ সেল গঠন করা হয়েছে। ৩. সচেতনতামূলক প্রচারণা: সরকারি ও বেসরকারি পর্যায়ে গ্রামীণ বিচার ব্যবস্থা (জিরগা বা পঞ্চায়েত) এর ক্ষমতা খর্ব করার চেষ্টা চলছে, কারণ অনেক ক্ষেত্রে এই জিরগাগুলোই হত্যার আদেশ দেয়।
করাচির এই ঘটনাটি প্রমাণ করে যে, রক্ষক যখন ভক্ষক হয় এবং শিক্ষিত বা প্রশাসনিক স্তরেও যখন এই ধরণের মধ্যযুগীয় মানসিকতা বিরাজ করে, তখন কেবল আইন দিয়ে এই ব্যাধি নির্মূল করা কঠিন। এর জন্য প্রয়োজন ব্যাপক সামাজিক সংস্কার এবং নারীর অধিকার সম্পর্কে জনসচেতনতা।










