Home ধর্ম ও জীবন রাসূল (সা.)-এর যুগে ঈদ: সাদাসিধে আনন্দ ও সাম্যের প্রতিচ্ছবি

রাসূল (সা.)-এর যুগে ঈদ: সাদাসিধে আনন্দ ও সাম্যের প্রতিচ্ছবি

মওলানা মোহাম্মদ কাউসার:

মদিনার আকাশে নতুন চাঁদ দেখার সাথে সাথেই শুরু হতো এক অন্যরকম আবহ। জাহেলি যুগের অর্থহীন আনন্দ উৎসবকে পাশ কাটিয়ে নবী করিম (সা.) মুসলমানদের উপহার দিয়েছিলেন দুটি পবিত্র দিন—ঈদুল ফিতর ও ঈদুল আজহা। সেই সময়ের ঈদ ছিল মূলত ইবাদত, কৃতজ্ঞতা এবং সামাজিক সংহতির এক অনন্য মিশ্রণ।

সাহাবায়ে কেরাম ঈদের জন্য বিশেষ প্রস্তুতি নিতেন, তবে তাতে বিলাসিতার নামগন্ধ ছিল না। তারা সামর্থ্য অনুযায়ী সবচেয়ে পরিচ্ছন্ন বা ভালো পোশাকটি পরতেন। সুগন্ধি ব্যবহার করা ছিল সুন্নাত। ঈদের দিনের শুরুতে ছিল বিশেষ কোনো সুস্বাদু খাবারের আয়োজন, যেমন—ঈদুল ফিতরের নামাজের আগে বিজোড় সংখ্যক খেজুর খাওয়া।

রাসূল (সা.) সাধারণত মসজিদের ভেতরে ঈদের নামাজ না পড়ে মদিনার শহরতলীর খোলা মাঠে (ঈদগাহ) নামাজ আদায় করতেন। এটি ছিল মুসলিম উম্মাহর শক্তির এক বিশাল মহড়া।

নারীদের অংশগ্রহণ: তৎকালীন যুগে নারী ও শিশুদেরও ঈদগাহে যাওয়ার বিশেষ উৎসাহ দেওয়া হতো, যাতে তারাও এই বারাকাহ ও আনন্দের অংশীদার হতে পারেন।

পথ পরিবর্তন: যাওয়ার সময় এক পথ ব্যবহার করা এবং ফেরার সময় অন্য পথ ব্যবহার করা ছিল রাসূলের (সা.) নিয়মিত চর্চা, যাতে সর্বোচ্চ সংখ্যক মানুষের সাথে শুভেচ্ছা বিনিময় করা যায়।

দান ও তাকওয়া (সাদাকাতুল ফিতর)

ঈদের মূল উদ্দেশ্য ছিল কেউ যেন ক্ষুধার্ত না থাকে। ঈদের নামাজের আগেই ‘সাদাকাতুল ফিতর’ আদায় করা ছিল বাধ্যতামূলক। সাহাবীরা সাধারণত এক ‘সা’ পরিমাণ খাদ্যশস্য (যেমন—খেজুর, যব বা কিশমিশ) দান করতেন। এর ফলে সমাজের দরিদ্রতম ব্যক্তিটিও ঈদের দিন আনন্দের সাথে আহার করার সুযোগ পেত।

আনন্দ উদযাপন ও বিনোদন

ইসলামের প্রাথমিক যুগে ঈদ মানে কেবল গম্ভীর ইবাদত ছিল না। রাসূল (সা.) সীমার মধ্যে থেকে আনন্দ প্রকাশকে উৎসাহিত করতেন।

হাবশিদের খেলা: একদিন ঈদের সময় মসজিদের পাশে হাবশি যুবকদের শারীরিক কসরত ও বর্শা খেলা দেখে রাসূল (সা.) এবং হযরত আয়েশা (রা.) আনন্দ উপভোগ করেছিলেন।

কবিতা ও সংগীত: ছোট ছোট বালিকারা ডাফ বাজিয়ে বীরত্বগাথা বা কবিতার চরণ গাইত। রাসূল (সা.) একে ‘ঈদের আনন্দ’ হিসেবে অভিহিত করে তাতে বাধা না দেওয়ার নির্দেশ দিয়েছিলেন।

পারস্পরিক সংহতি ও মোবারকবাদ

ঈদের দিনে সাহাবীদের মধ্যে দেখা হলে তারা একে অপরকে একটি বিশেষ দোয়ার মাধ্যমে শুভেচ্ছা জানাতেন:“তাকাব্বালাল্লাহু মিন্না ওয়া মিনকুম” > (আল্লাহ আমাদের এবং আপনার পক্ষ থেকে নেক আমলগুলো কবুল করুন)।

ইসলামের প্রাথমিক যুগের ঈদ আমাদের শিক্ষা দেয় যে, উৎসব মানে কেবল দামি পোশাক বা খাবারের পাহাড় নয়। বরং তা হলো সৃষ্টিকর্তার প্রতি কৃতজ্ঞতা প্রকাশ এবং সমাজের পিছিয়ে পড়া মানুষের হাত ধরার নাম। সেই সরলতা আর ভ্রাতৃত্ববোধ আজও আমাদের জন্য অনুকরণীয়।