এইচআইভি ছড়াচ্ছে ‘নীরব ঘাতক’: এক বছরে আক্রান্ত ২০০০
বিজনেসটুডে২৪ প্রতিনিধি, ঢাকা: আজ, ১ ডিসেম্বর, বিশ্ব এইডস দিবস ২০২৫। ‘সব বাধা দূর করি, এইডসমুক্ত সমাজ গড়ি’—এই প্রতিপাদ্যকে সামনে রেখে যখন বিশ্ব এইডসমুক্তির প্রত্যয় নিচ্ছে, তখন বাংলাদেশের স্বাস্থ্য অধিদপ্তর থেকে পাওয়া তথ্য জনস্বাস্থ্যে এক নতুন উদ্বেগের সৃষ্টি করেছে। সরকারি তথ্যে দেখা যাচ্ছে, গত এক বছরে দেশে নতুন করে এইচআইভি আক্রান্তের সংখ্যা প্রায় ২,০০০ জনে দাঁড়িয়েছে, যা আগের বছরের তুলনায় উল্লেখযোগ্যভাবে বেশি।
স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের জাতীয় যক্ষ্মা, কুষ্ঠ ও এইডস নিয়ন্ত্রণ কর্মসূচির (টিবিএল অ্যান্ড এএসপি) তথ্যে জানা যায়, ২০২৪ সালের নভেম্বর থেকে চলতি বছরের অক্টোবর পর্যন্ত নতুন করে আনুমানিক ২,০০০ জন এইচআইভি আক্রান্ত হয়েছেন। আগের বছর এই সংখ্যা ছিল ১ হাজার ৪৩৮ জন। এই সময়ে এইডসে মারা গেছেন ২০০ জন, যা আগের বছরের ১৯৫ জনের চেয়ে বেশি। স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের তথ্যমতে, দেশে এখন পর্যন্ত শনাক্ত রোগীর সংখ্যা ১৪ হাজারের বেশি এবং মৃত্যু হয়েছে প্রায় ২,৫০০ জনের। বর্তমানে দেশে জীবিত রোগীর সংখ্যা ১১ হাজারের বেশি।
ঝুঁকিপূর্ণ আচরণ ও জনসংখ্যাগত চিত্র
স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, নতুন শনাক্ত রোগীদের মধ্যে সমকামী পুরুষের আচরণ ঝুঁকিপূর্ণ। কর্তৃপক্ষ তাদেরকে ‘সমাজের নীরব ঘাতক’ হিসেবে চিহ্নিত করেছে, যারা রোগটি অন্যদের মাঝে ছড়িয়ে দিচ্ছে।
২০২৪ সালের পরিসংখ্যানে আক্রান্তদের জনসংখ্যাগত চিত্র আরও স্পষ্ট:
লিঙ্গ: আক্রান্তদের ৭৭ শতাংশ পুরুষ, ২২ শতাংশ নারী এবং ১ শতাংশ তৃতীয় লিঙ্গের মানুষ।
বয়স: আক্রান্তদের ৬৩ শতাংশের বয়স ২৫ থেকে ৪৯ বছরের মধ্যে, অর্থাৎ কর্মক্ষম ও প্রজননক্ষম জনগোষ্ঠী সবচেয়ে বেশি ঝুঁকিতে।
ভূগোল: সবচেয়ে বেশি রোগী শনাক্ত হয়েছে ঢাকা বিভাগে। এরপর সিলেট, চট্টগ্রাম ও খুলনা বিভাগে রোগীর সংখ্যা বেশি। রাজধানীর ঘনবসতি, অনিয়ন্ত্রিত ঝুঁকিপূর্ণ আচরণ এবং উচ্চঝুঁকির জনগোষ্ঠীর একাংশের নিয়মিত চিকিৎসার আওতায় না আসাকে বিশেষজ্ঞরা রোগ ছড়িয়ে পড়ার অন্যতম কারণ হিসাবে দেখছেন।
মহাখালী সংক্রামক ব্যাধি হাসপাতালের তত্ত্বাবধায়ক (ভারপ্রাপ্ত) ডা. আরিফুল বাশারের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, হাসপাতালের রোগীদের মধ্যে ৪০ শতাংশ পুরুষ সমকামী, ৫০ শতাংশ প্রবাসী শ্রমিক এবং বাকিরা পেশাজীবী যৌনকর্মী ও তৃতীয় লিঙ্গের মানুষ। হাসপাতালের কনসালট্যান্ট ডা. এ আর এম সাখাওয়াত হোসেন পুরুষ সমকামী রোগী বাড়ার কারণ হিসেবে নৈতিক অবক্ষয়, ধর্মীয় জীবনব্যবস্থা থেকে দূরে সরে যাওয়া এবং পাশ্চাত্য সংস্কৃতির প্রভাবকে দায়ী করেছেন। তিনি জানান, নতুন রোগীদের মধ্যে ২০ থেকে ৩০ বছর বয়সীদের সংখ্যা বেশি।
চিকিৎসা কাঠামোয় দুর্বলতা ও চ্যালেঞ্জ
দেশে এইচআইভি রোগীদের চিকিৎসার আওতায় আনার ক্ষেত্রে এখনো ঘাটতি রয়েছে। বিভিন্ন সংস্থার হিসাবে অনুমিত এইচআইভি রোগীর সংখ্যা প্রায় ১৬ হাজার, যার মধ্যে ৭৮ শতাংশ বর্তমানে চিকিৎসার আওতায় আছেন।
চিকিৎসা কেন্দ্র: সরকারি পর্যায় ছাড়া বেসরকারিতে এইচআইভি চিকিৎসা এখনো নেই। দেশে ২৭টি কেন্দ্রে শনাক্তকরণ এবং ১৩টি কেন্দ্রে নিয়মিত ওষুধ ও চিকিৎসা দেওয়া হয়। তবে জটিল রোগীদের ভর্তি করে চিকিৎসার সুযোগ আছে কেবল মহাখালী সংক্রামক ব্যাধি হাসপাতালে।
হাসপাতালে রোগীর চাপ: এই হাসপাতালটিতে প্রতিবছরই শনাক্ত রোগীর সংখ্যা বাড়ছে—২০২১ সালে ১০৫ জন, ২০২২ সালে ১৫৫ জন, ২০২৩ সালে ১৮৪ জন এবং ২০২৪ সালে ২৭৪ জন।
তত্ত্বাবধায়ক (ভারপ্রাপ্ত) ডা. আরিফুল বাশার জটিল রোগীদের চিকিৎসায় হাসপাতালের অবকাঠামোগত চ্যালেঞ্জ তুলে ধরে বলেন, “জটিল রোগীদের চিকিৎসায় অনেক চ্যালেঞ্জ রয়েছে—এ হাসপাতালে নেই এমআরআই, বায়োপসি, সিডি-৪ কাউন্টসহ বেশ কিছু জরুরি পরীক্ষা। নেই ডায়ালিসিস, নেই প্রয়োজনীয় অ্যাডভান্সড অ্যান্টিবায়োটিকের পর্যাপ্ত সরবরাহ। জনবল সংকটও বড় সমস্যা।”
তিনি আরও জানান, এইডস রোগীদের মৃত্যুর প্রধান কারণ হলো সাধারণ সংক্রমণ, কারণ এইচআইভি শরীরের রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা সম্পূর্ণরূপে নষ্ট করে দেয়। অন্যদিকে, কনসালট্যান্ট ডা. এ আর এম সাখাওয়াত হোসেন জানান, অধিকাংশ রোগী জ্বর, ডায়রিয়া ও মুখে ঘায়ের মতো সাধারণ সমস্যা নিয়ে আসেন এবং এসব রোগী প্রাথমিক পর্যায়ে পরিচয় গোপন করে অন্য অনেক জায়গায় চিকিৎসা নিয়ে থাকেন।
এইডস দিবসে বিশেষজ্ঞদের অভিমত, সংক্রমণের লাগাম টানতে কেবল সচেতনতা নয়, ঝুঁকিপূর্ণ গোষ্ঠীগুলোর জীবনযাত্রার পরিবর্তন, তাদের সামাজিক সুরক্ষা নিশ্চিত করা এবং বিশেষ করে সরকারি হাসপাতালগুলোর চিকিৎসা অবকাঠামোতে অত্যাধুনিক সুযোগ-সুবিধা যুক্ত করা অপরিহার্য।










