বিজনেসটুডে২৪ প্রতিনিধি, ঢাকা: বাংলাদেশের ব্যাংকিং খাতে চলমান নানামুখী সামষ্টিক অর্থনৈতিক চ্যালেঞ্জের মধ্যেও ব্যতিক্রমী ব্যবসায়িক সাফল্য ও সুশাসনের নজির দেখিয়েছে ন্যাশনাল ক্রেডিট অ্যান্ড কমার্স (এনসিসি) ব্যাংক পিএলসি। সাম্প্রতিক বছরগুলোতে ব্যাংকটি ঋণ পুনরুদ্ধার, খেলাপি ঋণ নিয়ন্ত্রণ এবং সরকারি সিকিউরিটিজে কৌশলগত বিনিয়োগের মাধ্যমে শক্তিশালী আর্থিক ভিত্তি গড়ে তুলতে সক্ষম হয়েছে। অর্থনৈতিক ও প্রাতিষ্ঠানিক পারফরম্যান্সের সূচকগুলো বিশ্লেষণ করলে ব্যাংকটির টেকসই অগ্রযাত্রার এক আশাব্যঞ্জক চিত্র ফুটে ওঠে।
রেকর্ড মুনাফা ও লভ্যাংশের ইতিহাস
সদ্য সমাপ্ত ২০২৫ হিসাব বছরে এনসিসি ব্যাংক তাদের ইতিহাসের সর্বোচ্চ নিট মুনাফা ও লভ্যাংশ ঘোষণা করে পুঁজিবাজারে চমক সৃষ্টি করেছে। ২০২৪ সালের তুলনায় ব্যাংকের কনসোলিডেটেড নিট মুনাফা প্রায় ৮.৬৭ শতাংশ বৃদ্ধি পেয়ে ৪৭৬ কোটি টাকায় উন্নীত হয়েছে, যা আগের বছর ছিল ৪৩৮ কোটি টাকা। এই অভাবনীয় সাফল্যের ওপর ভর করে ২০২৫ সালের জন্য ব্যাংকটি ২১ শতাংশ (১৭ শতাংশ নগদ এবং ৪ শতাংশ স্টক) লভ্যাংশ সুপারিশ করেছে, যা বিগত এক দশকের মধ্যে সর্বোচ্চ নগদ পে-আউট।
২০২৬ সালের প্রথম প্রান্তিকের (জানুয়ারি-মার্চ) অনিরীক্ষিত আর্থিক প্রতিবেদনেও ধারাবাহিকতা বজায় রেখে শেয়ার প্রতি আয় (ইপিএস) গত বছরের একই সময়ের ০.৯৪ টাকা থেকে বেড়ে ১.১১ টাকায় দাঁড়িয়েছে।
আর্থিক সূচকের তুলনামূলক বিশ্লেষণ
ব্যাংকটির ব্যালেন্স শিট এবং মূল কর্মদক্ষতার জায়গাগুলো পর্যালোচনা করলে দেখা যায়, প্রধান প্রধান আর্থিক সূচকগুলোতে ইতিবাচক পরিবর্তন এসেছে। বিগত দুই বছরের প্রধান অর্থনৈতিক ডেটা নিচে উপস্থাপন করা হলো:
আর্থিক সূচক (কনসোলিডেটেড)
২০২৪ সাল
২০২৫ সাল
২০২৬ (১ম প্রান্তিক)
শেয়ার প্রতি আয় (EPS)
৩.৯৪ টাকা
৪.২৯ টাকা
১.১১ টাকা
শেয়ার প্রতি নিট সম্পদ মূল্য (NAVPS)
২৪.৩২ টাকা
২৭.২০ টাকা
২৮.৪১ টাকা
শেয়ার প্রতি নিট অপারেটিং ক্যাশ ফ্লো (NOCFPS)
২.৮৩ টাকা
১৪.১৫ টাকা
১.৮৮ টাকা
এই সারণী থেকে স্পষ্ট যে, ব্যাংকটির শেয়ার প্রতি সম্পদ মূল্য (NAVPS) ধারাবাহিকভাবে বৃদ্ধি পাচ্ছে, যা দীর্ঘমেয়াদী বিনিয়োগকারীদের জন্য ইতিবাচক। ২০২৫ সালে শক্তিশালী আমানত প্রবাহের কারণে অপারেটিং ক্যাশ ফ্লো (NOCFPS) ১৪.১৫ টাকায় পৌঁছালেও, ২০২৬ সালের প্রথম প্রান্তিকে সরকারি সিকিউরিটিজ ক্রয় ও ব্যাংক ডিপোজিট পরিশোধের কারণে এটি সাময়িকভাবে কিছুটা হ্রাস পেয়েছে।
খেলাপি ঋণ নিয়ন্ত্রণ ও সম্পদ সুরক্ষা
বাংলাদেশের ব্যাংকিং খাতের সবচেয়ে বড় ক্ষত হলো কুঋণ বা খেলাপি ঋণ (NPL)। এই জায়গায় এনসিসি ব্যাংক দারুণ এক রূপান্তর ঘটিয়েছে। ২০২৪ সালে ব্যাংকটির খেলাপি ঋণের অনুপাত যেখানে ছিল ৭.৫০ শতাংশ, ২০২৫ সাল শেষে তা উল্লেখযোগ্যভাবে কমিয়ে ৪.১২ শতাংশে নামিয়ে আনা হয়েছে। দক্ষ ঋণ পুনরুদ্ধার সেল এবং মন্দ ঋণ অবলোপনের (Write-off) যথাযথ প্রক্রিয়াকরণের মাধ্যমে এটি সম্ভব হয়েছে। তবে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের কঠোর নীতিমালার সঙ্গে সংগতি রেখে ব্যাংকটিকে ঋণের বিপরীতে পর্যাপ্ত প্রভিশন বা নিরাপত্তা সঞ্চিতি সংরক্ষণ করতে হচ্ছে, যা সম্পদ সুরক্ষায় ব্যাংকটির দূরদর্শী পদক্ষেপের অংশ।
কৌশলগত বিনিয়োগ ও আয় বৃদ্ধি
এনসিসি ব্যাংকের এই ঐতিহাসিক মুনাফা বৃদ্ধির পেছনে অন্যতম প্রধান চালিকাশক্তি ছিল ট্রেডিং সরকারি সিকিউরিটিজ তথা বন্ড ও বিল-এ দূরদর্শী বিনিয়োগ। সামষ্টিক অর্থনৈতিক অস্থিরতার সময়ে বেসরকারি খাতে আগ্রাসী ঋণ বিতরণ না করে, অপেক্ষাকৃত নিরাপদ ও নিশ্চিত আয়ের উৎস হিসেবে সরকারি সিকিউরিটিজে বড় অংকের তহবিল বিনিয়োগ করে ব্যাংকটি। এর পাশাপাশি ব্যাংকিং খাতের মূল ব্যবসা—আমানত সংগ্রহ ও ঋণ বিতরণের সুদ হারের ব্যবধান (Spread) দক্ষতার সাথে সমন্বয় করায় নেট ইন্টারেস্ট মার্জিন শক্তিশালী অবস্থানে রয়েছে।
ভবিষ্যৎ টেকসই অর্থনৈতিক সম্ভাবনা
পুঁজিবাজারে ২০০০ সালে তালিকাভুক্ত এই ব্যাংকটির পরিশোধিত মূলধন বর্তমানে ১,১৪০.৪২ কোটি টাকা। এর মধ্যে উদ্যোক্তা পরিচালকদের হাতে রয়েছে ৩৭.২৮ শতাংশ শেয়ার এবং বাকি অংশ প্রাতিষ্ঠানিক, বিদেশী ও সাধারণ বিনিয়োগকারীদের মালিকানায়। ২০২৫ সালের রেকর্ড পারফরম্যান্সের পর দেশের উভয় স্টক এক্সচেঞ্জে ব্যাংকটির শেয়ারের প্রতি বিনিয়োগকারীদের আস্থা নতুন করে বৃদ্ধি পেয়েছে।
অর্থনৈতিক দৃষ্টিকোণ থেকে বলা যায়, শুধু মুনাফা অর্জনই নয়, বরং আয়ের একটি অংশ ভবিষ্যৎ ঝুঁকি মোকাবেলা ও দীর্ঘমেয়াদী টেকসই প্রবৃদ্ধির জন্য রিজার্ভে রেখে দেওয়ার যে সিদ্ধান্ত ব্যাংক কর্তৃপক্ষ নিয়েছে, তা ব্যাংকিং সুশাসনের একটি বড় উদাহরণ। তারল্য সংকট এবং খেলাপি ঋণের চাপ সামলে এনসিসি ব্যাংক পিএলসি যেভাবে নিজেকে সামলে নিয়েছে, তা আগামী দিনে দেশের সামগ্রিক আর্থিক খাতের জন্য একটি ইতিবাচক বার্তা বহন করে।