আন্তর্জাতিক ডেস্ক: ঢাকায় সাবেক প্রধানমন্ত্রী খালেদা জিয়ার অন্তেষ্টিক্রিয়ায় অংশ নিতে এসে ভারতের পররাষ্ট্রমন্ত্রী এস জয়শঙ্করের পাকিস্তানের জাতীয় পরিষদের স্পিকারের সঙ্গে করমর্দনের ঘটনা এখনো দক্ষিণ এশিয়ার কূটনৈতিক অঙ্গনে আলোচনার কেন্দ্রে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম থেকে শুরু করে নীতিনির্ধারক মহল পর্যন্ত বিষয়টি নিয়ে নানা ব্যাখ্যা ও প্রতিক্রিয়া দেখা যাচ্ছে।
এমন এক সংবেদনশীল প্রেক্ষাপটে ভারতের মাদ্রাজে ইন্ডিয়ান ইনস্টিটিউট অব টেকনোলজি আইআইটি–এর শিক্ষার্থীদের উদ্দেশে দেওয়া জয়শঙ্করের বক্তব্য নতুন করে তাৎপর্যপূর্ণ হয়ে উঠেছে।
আইআইটির বক্তৃতায় জয়শঙ্কর স্পষ্ট ভাষায় বলেন, ভারতের কী করা উচিত বা কী করা উচিত নয় তা অন্য কেউ ঠিক করে দিতে পারে না। তাঁর এই বক্তব্যকে কেবল একটি নীতিগত ঘোষণা হিসেবে নয়, বরং সাম্প্রতিক কূটনৈতিক বিতর্কের প্রেক্ষাপটে একটি বার্তাবাহী বক্তব্য হিসেবেও দেখছেন বিশ্লেষকেরা।
ঢাকায় পাকিস্তানি স্পিকারের সঙ্গে করমর্দনকে কেউ কেউ স্বাভাবিক কূটনৈতিক সৌজন্য হিসেবে দেখলেও, ভারতের ভেতরে ও বাইরে একটি অংশ এটিকে দিল্লির অবস্থান নিয়ে প্রশ্ন তোলার সুযোগ হিসেবে ব্যবহার করছে। ঠিক এই সময় জয়শঙ্করের বক্তব্য ভারতের সিদ্ধান্ত গ্রহণে সার্বভৌমত্বের বিষয়টি নতুন করে সামনে এনে দেয়।
বক্তৃতায় ‘অপারেশন সিন্দুর’-এর প্রসঙ্গ টেনে জয়শঙ্কর বলেন, দুর্ভাগ্যজনকভাবে ভারতের একটি খারাপ প্রতিবেশী রয়েছে।
তিনি বলেন, যদি কোনো দেশ ইচ্ছাকৃতভাবে, ধারাবাহিকভাবে এবং অনুতপ্ত না হয়ে সন্ত্রাসবাদ চালিয়ে যেতে চায়, তাহলে ভারতের জনগণকে রক্ষা করার অধিকার ভারতের আছে। শুধু অধিকার থাকাই নয়, ভারত সেই অধিকার প্রয়োগ করবে বলেও তিনি জোর দেন। এই বক্তব্য অনেকের কাছেই পাকিস্তানকেন্দ্রিক ভারতের দীর্ঘদিনের নিরাপত্তা উদ্বেগেরই প্রকাশ।
ঢাকায় করমর্দনের ঘটনায় যে বার্তা বিভ্রান্তি তৈরি হয়েছে, আইআইটির বক্তৃতা সেই বিভ্রান্তি দূর করার এক ধরনের প্রয়াস বলেও মনে করছেন কূটনৈতিক বিশ্লেষকেরা।
তাঁদের মতে, জয়শঙ্কর বোঝাতে চেয়েছেন যে আনুষ্ঠানিক বা শোকসভা-সংক্রান্ত কূটনৈতিক আচরণ আর রাষ্ট্রীয় নীতি এক বিষয় নয়। সৌজন্যমূলক সাক্ষাৎ বা করমর্দন ভারতের সন্ত্রাসবিরোধী অবস্থান কিংবা নিরাপত্তা নীতিতে কোনো পরিবর্তনের ইঙ্গিত দেয় না।
আইআইটির শিক্ষার্থীদের উদ্দেশে দেওয়া বক্তব্যে জয়শঙ্কর আরও বলেন, আন্তর্জাতিক রাজনীতিতে অনেক সময় নৈতিকতার ভাষা ব্যবহার করে কোনো কোনো দেশ অন্য দেশের ওপর চাপ সৃষ্টি করতে চায়। ভারত সে ধরনের চাপ মেনে নেবে না। তাঁর মতে, জাতীয় স্বার্থ, জনগণের নিরাপত্তা এবং সার্বভৌম সিদ্ধান্তই ভারতের পররাষ্ট্রনীতির মূল ভিত্তি।
এই বক্তৃতা তরুণ প্রজন্মের সামনে ভারতের কূটনৈতিক দর্শন তুলে ধরার পাশাপাশি সাম্প্রতিক ঘটনাবলির পর দিল্লির অবস্থান স্পষ্ট করার একটি কৌশলগত পদক্ষেপ হিসেবেও দেখা হচ্ছে।
ঢাকার ঘটনাকে ঘিরে যে প্রশ্ন ও সমালোচনা উঠেছে, তার জবাব সরাসরি না দিলেও জয়শঙ্করের বক্তব্যের সারবত্তা ছিল স্পষ্ট। ভারত সৌজন্য দেখাতে পারে, কিন্তু নিজের নিরাপত্তা ও নীতিগত অবস্থান থেকে একচুলও সরে আসবে না।
সব মিলিয়ে, ঢাকায় করমর্দনের কূটনৈতিক আলোড়ন এবং মাদ্রাজে আইআইটির মঞ্চে দেওয়া জয়শঙ্করের বক্তব্য একসঙ্গে বিচার করলে স্পষ্ট হয়, ভারত বর্তমান আঞ্চলিক বাস্তবতায় দ্বিমুখী কৌশল অনুসরণ করছে।
একদিকে আনুষ্ঠানিক কূটনৈতিক আচরণ বজায় রাখা, অন্যদিকে সন্ত্রাসবাদ ও জাতীয় নিরাপত্তা প্রশ্নে কঠোর অবস্থান স্পষ্ট করে দেওয়া। দক্ষিণ এশিয়ার রাজনীতিতে এই বার্তাই এখন দিল্লির পক্ষ থেকে সবচেয়ে জোরালোভাবে উঠে আসছে।