Home Third Lead চৌধুরী গ্রুপ ও সাহেদ ছরওয়ার: তিন প্রজন্মের এক অবিচ্ছেদ্য আস্থার গল্প

চৌধুরী গ্রুপ ও সাহেদ ছরওয়ার: তিন প্রজন্মের এক অবিচ্ছেদ্য আস্থার গল্প

সাহেদ ছরওয়ার
স্বপ্ন ছিল বাবার মতো বর্ণিল ক্যারিয়ার, লক্ষ্য ছিল টেক্সটাইল
সাহেদ ছরওয়ার। উপদেষ্টা: বাংলাদেশ শিপিং এজেন্টস অ্যাসোসিয়েশন।
সাহেদ ছরওয়ার। খ্যাতিমান শিপিং ব্যক্তিত্ব। চৌধুরী গ্রুপের উপ-ব্যবস্থাপনা পরিচালক। দীর্ঘ ৩৮ বছরের কর্মজীবন যেন বাংলাদেশের শিপিং সেক্টরের বিবর্তনের এক জীবন্ত দলিল। ১৯৯০ সালের ১ জানুয়ারি থেকে আজ অবধি, তিনি নিজেকে একটি প্রতিষ্ঠানের সাথে এমনভাবে মিশিয়ে নিয়েছেন যে, সাহেদ ছরওয়ার এবং চৌধুরী গ্রুপ আজ একে অপরের পরিপূরক। দীর্ঘ কর্মজীবনে তিনি দেশে এবং বিদেশে বেশ কয়েকবার কোম্পানির পক্ষ থেকে শ্রেষ্ঠ কর্মীর পদক পেয়েছেন।
সাধারণ একজন জুনিয়র এক্সিকিউটিভ থেকে আজ তিনি ডিএমডি—তার এই বর্ণিল যাত্রার নেপথ্য গল্প ও ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতার চুম্বক অংশ নিয়ে সাজানো হয়েছে এই বিশেষ সাক্ষাৎকারটি।

প্রশ্ন: আপনার ক্যারিয়ারের শুরুর গল্পটা বলুন। আপনি কি শুরু থেকেই শিপিং সেক্টরে আসতে চেয়েছিলেন?

সাহেদ ছরওয়ার: সত্যি বলতে, শিপিংয়ে আসার পরিকল্পনা শুরুতে ছিল না। আমার বাবা ছিলেন একটি ব্যাংকের আগ্রাবাদ শাখার ম্যানেজার। ছোটবেলা থেকেই দেখতাম তিনি খুব পরিপাটি হয়ে, অত্যন্ত ‘হ্যান্ডসাম লুকে’ অফিসে যেতেন, গাড়ি আসত। বাবার সেই বর্ণিল ও স্মার্ট জীবন দেখে আমিও উদ্বুদ্ধ হতাম। তবে আমার প্রথম পছন্দ ছিল টেক্সটাইল বা গার্মেন্টস সেক্টর। বড় ভাই বিদেশি বায়িং হাউসে চাকরি করতেন বলে আমার ইচ্ছে ছিল অনুরূপ কোনো প্রতিষ্ঠানে ক্যারিয়ার শুরু করার। কিন্তু বড় ভাই পরামর্শ দিলেন শিপিং সেক্টরে তরুণদের ভালো সম্ভাবনা আছে। তার নির্দেশেই মূলত এই পেশার দিকে পা বাড়ানো।
বিয়ে নাকি চাকরি? এক অমলিন স্মৃতি
প্রশ্ন: আপনার কর্মজীবনের শুরুটা ‘কে লাইন’ (K-Line) এর সাথে, যা বর্তমানে চৌধুরী গ্রুপের অন্যতম গর্ব। ইন্টারভিউ প্যানেলের সেই মজার স্মৃতিটা যদি বলতেন?
সাহেদ ছরওয়ার : (হাসি) সেই স্মৃতি ভোলা সম্ভব নয়। এমডি সাহেব আমাকে জিজ্ঞেস করলেন, “শিপিং অপারেশন মানে কী বোঝো?” আমি জানালাম কোনো অভিজ্ঞতা নেই। তিনি তখন এক কঠিন পরিস্থিতির উদাহরণ টেনে বললেন, “ধরো তুমি বিয়ের পিঁড়িতে বসেছো, এমন সময় বন্দর থেকে কল আসলো যে জাহাজে সমস্যা—তোমাকে বিয়ের পিঁড়ি ফেলে বন্দরে ছুটতে হবে। এখন বলো, তুমি কোনটা বেছে নেবে?”
আমি সাথে সাথে উত্তর দিয়েছিলাম, “চাকরিকে অগ্রাধিকার দেব, বিয়ে পরে করলেও চলবে।” আমার উত্তর শুনে তিনি হো হো করে হেসে উঠলেন। ব্যস, ওই দিনই আমার ভাগ্য নির্ধারিত হয়ে গেল।
প্রথম দিনের অগ্নিপরীক্ষা: রাত ৩টার আগে ফেরা নেই
প্রশ্ন: প্রথম দিনেই নাকি আপনি চাকরি ছেড়ে দেওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছিলেন?
সাহেদ ছরওয়ার: হ্যাঁ, তখন প্রচণ্ড শীত। আমি ভেবেছিলাম ৯টা-৫টার আরামদায়ক অফিস। কিন্তু প্রথম দিনেই পোর্টের ৫ নম্বর গেট দিয়ে প্রবেশ করে ভিতরের অপারেশন কার্যক্রম দেখতে হলো রাত ৩টা পর্যন্ত। জ্যাকেট পরা অবস্থায় জীবনের প্রথম বন্দরে ঢুকে গার্মেন্টস পণ্য লোডিং দেখলাম। ট্যাক্সিতে করে যখন দেবপাহাড়ের বাসায় ফিরলাম, মনে মনে ঠিক করলাম—এ চাকরি আর করব না। কিন্তু সকালে ঘুম থেকে উঠে আবারও অফিসে গেলাম। বড় ভাইয়ের অনুপ্রেরণা ছিল যে শিপিং লাইনে যারা যোগ দিচ্ছে তারা খুব ভালো করছে। আজ বুঝি, সেই জেদ এবং চৌধুরী গ্রুপের মতো একটি প্রতিষ্ঠানের চমৎকার পরিবেশই আমাকে এখানে ধরে রেখেছে।
চৌধুরী গ্রুপ: যেখানে মেধার মূল্যায়নই শেষ কথা
প্রশ্ন: দীর্ঘ ৩৮ বছর একই প্রতিষ্ঠানে। চৌধুরী গ্রুপের প্রতি আপনার এই অটুট আস্থার রহস্য কী?
সাহেদ ছরওয়ার: আমি মনে করি, কোনো কর্মী যখন প্রতিষ্ঠানে সঠিক মূল্যায়ন পায়, তখন সে আর অন্য কোথাও যাওয়ার চিন্তা করে না। চৌধুরী গ্রুপ কেবল একটি ব্যবসা প্রতিষ্ঠান নয়, এটি একটি পরিবার। শুরুতে আমরা ছিলাম কে লাইন বাংলাদেশ, পরে তা চৌধুরী গ্রুপ হিসেবে ব্র্যান্ডিং পায়। মালিকপক্ষ আমার ওপর যে আস্থা রেখেছেন, তা আমাকে প্রতিটি সংকটে আরও শক্তিশালী করেছে। ৩টি প্রজন্ম ধরে আমি এই গ্রুপে আছি, যা আমার জীবনের বড় গর্ব।
প্রশ্ন: আপনার একটি বাইকের শখ পূরণের গল্প আছে, সেটি যদি পাঠকদের জন্য শেয়ার করতেন?
সাহেদ ছরওয়ার: ১৯৯৩ সালে আমার ইমিডিয়েট বস হঠাৎ দুবাই চলে গেলে এমডি সাহেব আমাকে তার সব দায়িত্ব নিতে বললেন। আমি শর্ত দিলাম, যদি আমাকে একটা ১০০ সিসি হোন্ডা বাইক কিনে দেওয়া হয়, তবে আমি দিনরাত ২৪ ঘণ্টা কাজ করতে পারব। তিনি বিন্দুমাত্র দ্বিধা না করে সাথে সাথে ৬৪ হাজার টাকার চেক লিখে দিলেন। সেই সময়ে চৌধুরী গ্রুপের পক্ষ থেকে পাওয়া ওই বাইকটি ছিল আমার কাছে আকাশের চাঁদ পাওয়ার মতো আনন্দ। এরপর জাপান সরকারের স্কলারশিপ নিয়ে ট্রেনিং, আমেরিকা ও ইউরোপে কোম্পানির প্রতিনিধিত্ব করা—সবই সম্ভব হয়েছে এই প্রতিষ্ঠানের উদার মানসিকতার কারণে।
স্মৃতির পাতায় ১৯৯১ সালের সেই প্রলয়
প্রশ্ন: আপনার দীর্ঘ ক্যারিয়ারে সবচেয়ে স্মরণীয় বা ভয়ংকর অভিজ্ঞতা কোনটি?
সাহেদ ছরওয়ার : ১৯৯১ সালের ২৯ এপ্রিলের সেই মহাপ্রলয়। সেদিন রাত ৯টা পর্যন্ত বন্দরে অপারেশনাল কাজ করেছি। বাসায় ফেরার পর জানলাম ১০ নম্বর মহাবিপদ সংকেতের কথা। পরদিন সকালে যখন বাইক নিয়ে বন্দরে গেলাম, দেখলাম শেড বিধ্বস্ত, রশি ছিঁড়ে জাহাজ ডাঙায় উঠে এসেছে। প্রকৃতির সেই রুদ্ররূপ আমার জীবনের সবচেয়ে স্মরণীয় ও ভয়ংকর ঘটনা।
তরুণ প্রজন্ম ও শিপিং সেক্টরের ভবিষ্যৎ
প্রশ্ন: বর্তমান সময়ের তরুণরা তো খুব দ্রুত চাকরি পরিবর্তন করতে চায়। তাদের জন্য আপনার পরামর্শ কী?
সাহেদ ছরওয়ার: এখনকার প্রজন্ম অনেক সময় একটু ধৈর্যহীন হয়ে পড়ে। সামান্য কিছু বাড়তি সুবিধার লোভে এক প্রতিষ্ঠান থেকে অন্য প্রতিষ্ঠানে লাফ দেয়। কিন্তু মনে রাখতে হবে, স্কিল গড়তে সময়ের প্রয়োজন। আমি বিভিন্ন জায়গা থেকে ভালো অফার পেয়ে রিজাইন দিয়েও বর্তমান মালিকের অনুরোধে থেকে গিয়েছি কারণ এখানে আমি যথাযথ মূল্যায়ন পেয়েছি। তরুণদের উচিত ধৈর্য ধরা এবং নিজের দক্ষতাকে শাণিত করা।
প্রশ্ন: বাংলাদেশের শিপিং সেক্টর নিয়ে আপনার প্রত্যাশা কী?
সাহেদ ছরওয়ার : আমাদের দেশে বে-টার্মিনাল বা মাতারবাড়ি টার্মিনাল হওয়া অবশ্যই ইতিবাচক দিক। তবে কথা কম বলে কাজ দ্রুত করা দরকার। শিপিং সেক্টরে আমাদের আরও সমন্বিত পলিসি প্রয়োজন। নীতিনির্ধারকদের ভাবা উচিত, কেন বড় বড় কোম্পানিগুলো বিদেশ থেকে সিনিয়র অফিসার আনছে। আমাদের মেধাবী তরুণদের এই সেক্টরে আগ্রহী করতে হলে বেতন কাঠামো উন্নত করা এবং দেশি মেধার মূল্যায়ন নিশ্চিত করা জরুরি।

–বিজনেসটুডে২৪ প্রতিনিধি, চট্টগ্রাম।