Home Third Lead জঙ্গল সলিমপুর: দুর্ভেদ্য পাহাড়ে ‘আলাদা রাজ্য’

জঙ্গল সলিমপুর: দুর্ভেদ্য পাহাড়ে ‘আলাদা রাজ্য’

সংগৃহীত ছবি
বিজনেসটুডে২৪ প্রতিনিধি, চট্টগ্রাম: মহানগরীর বায়েজীদ বোস্তামী থেকে মাত্র দুই কিলোমিটার পশ্চিমে অবস্থিত জঙ্গল সলিমপুর। চট্টগ্রামের সীতাকুণ্ড উপজেলার এই এলাকাটি খাতা-কলমে সরকারি খাসজমি হলেও গত চার দশক ধরে এটি হয়ে উঠেছে এক ‘নিষিদ্ধ নগরী’। পাহাড় কেটে গড়ে তোলা হয়েছে হাজার হাজার অবৈধ বসতি, আর সেই দখল বজায় রাখতে তৈরি করা হয়েছে নিজস্ব সশস্ত্র বাহিনী।
সোমবার  অস্ত্র উদ্ধার অভিযানে গিয়ে জঙ্গল সলিমপুরে সন্ত্রাসীদের হামলার শিকার হয়েছেন র‌্যাব সদস্যরা।  একজন র‌্যাব কর্মকর্তা নিহত হয়েছেন এবং তিনজন র‌্যাব সদস্য আহত হয়েছেন।
পাহাড়খেকোদের দখলে ৩০ হাজার কোটির সম্পদ
জেলা প্রশাসনের তথ্যমতে, ৩ হাজার ১০০ একর আয়তনের এই বিশাল পাহাড়ি এলাকার বর্তমান বাজারমূল্য প্রায় ৩০ হাজার কোটি টাকা। নব্বইয়ের দশকে কুখ্যাত সন্ত্রাসী আলী আক্কাসের হাত ধরে এখানে পাহাড় কাটার মহোৎসব শুরু হয়।
আক্কাস র‌্যাবের সাথে বন্দুকযুদ্ধে নিহত হলেও তার উত্তরাধিকার বহন করছে ইয়াসিন মিতা, কাজী মশিউর রহমান ও গাজী সাদেকের মতো কয়েক ব্যক্তি। তারা কয়েক হাজার ছিন্নমূল মানুষকে সদস্য করে ‘সমিতি’র নামে স্ট্যাম্পের মাধ্যমে বিক্রি করছে সরকারি পাহাড়।
‘রাজ্যের’ ভেতরে ‘রাজ্য’: প্রবেশাধিকার সংরক্ষিত
জঙ্গল সলিমপুরের প্রবেশপথে বসানো হয়েছে লোহার গেট। প্রতিটি মোড়ে থাকে সশস্ত্র পাহারাদার। এলাকাটির বাসিন্দাদের জন্য রয়েছে বিশেষ পরিচয়পত্র। এই পরিচয়পত্র ছাড়া কোনো লোক সেখানে সহজে ঢুকতে পারেন না। গত কয়েক বছরে একাধিকবার জেলা প্রশাসন ও পুলিশ অভিযানে গিয়ে পাহাড়ের ওপর থেকে ছোড়া ইট-পাটকেল ও ককটেল হামলার শিকার হয়েছে। আহত হয়েছেন নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট ও পুলিশ কর্মকর্তাসহ অনেকে।
থমকে আছে ১১টি মেগা প্রকল্প
জনাকীর্ণ চট্টগ্রাম কেন্দ্রীয় কারাগার স্থানান্তর, মডেল মসজিদ, নভোথিয়েটার এবং আইটি পার্কসহ ১১টি গুরুত্বপূর্ণ সরকারি প্রকল্প এই জঙ্গল সলিমপুরে বাস্তবায়নের পরিকল্পনা ছিল সরকারের। ৪৮টি সরকারি-বেসরকারি প্রতিষ্ঠান এখানে জমি চেয়ে আবেদন করে রেখেছে। কিন্তু দখলদারদের সশস্ত্র বাধার মুখে জেলা প্রশাসন জমি বুঝিয়ে দিতে না পারায় থমকে গেছে হাজার কোটি টাকার উন্নয়ন কর্মকাণ্ড।
৫ আগস্টের পর বেড়েছে রক্তপাত
রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর এলাকাটির নিয়ন্ত্রণ নিয়ে শুরু হয়েছে নতুন করে সংঘাত। আগে যারা সাবেক সংসদ সদস্যের আশ্রয়ে ছিলেন, তাদের হটিয়ে এখন দখল নিতে চাইছে অন্য পক্ষ। গত ১৪ মাসে এই এলাকায় চারজন খুন হয়েছেন। সর্বশেষ গত ২ জানুয়ারি খুন হন এক স্থানীয় শ্রমিক দল নেতা। সম্প্রতি ৬O লাখ টাকার অস্ত্র কেনার অডিও ফাঁস হওয়ার ঘটনায় এলাকাটিতে থমথমে পরিস্থিতি বিরাজ করছে।
সমাধানের পথ কী?
পরিবেশ অধিদপ্তর ও আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর কর্মকর্তাদের মতে, জঙ্গল সলিমপুর এখন কেবল একটি ভূমি দখলের জায়গা নয়, এটি সন্ত্রাসীদের নিরাপদ আস্তানা।
পরিবেশ অধিদপ্তরের সহকারী পরিচালক মুক্তাদির হাসান বলেন, “সরকারের উচ্চপর্যায় থেকে বড় ধরনের যৌথ অভিযান ছাড়া এই পাহাড় রক্ষা করা সম্ভব নয়।”
চট্টগ্রাম জেলা পুলিশ সুপার সাইফুল ইসলাম জানান, সমন্বিত পরিকল্পনার মাধ্যমে এলাকাটিকে সন্ত্রাসমুক্ত করার প্রস্তুতি চলছে।
চট্টগ্রামের ফুসফুস খ্যাত এই পাহাড়গুলো যদি এখনই রক্ষা করা না যায়, তবে অদূর ভবিষ্যতে এটি কেবল একটি অপরাধের জনপদ নয়, বরং পরিবেশগত বিপর্যয়ের কেন্দ্রবিন্দুতে পরিণত হবে।