
বিজনেসটুডে২৪ রিপোর্ট
বিদায়ী বছরের মে মাসে সরাসরি সামরিক সংঘাত এবং গত চার দশকের মধ্যে চরমতম কূটনৈতিক উত্তজনা শেষে দক্ষিণ এশিয়ার দুই পরমাণু শক্তিধর প্রতিবেশী ভারত ও পাকিস্তানের মধ্যে প্রথমবার উচ্চপর্যায়ের সরাসরি যোগাযোগ স্থাপিত হয়েছে।
বাংলাদেশের রাজধানী ঢাকায় সাবেক প্রধানমন্ত্রী খালেদা জিয়ার জানাজায় অংশ নেওয়ার ফাঁকে পাকিস্তানের ন্যাশনাল অ্যাসেম্বলির স্পিকার আয়াজ সাদিক এবং ভারতের পররাষ্ট্রমন্ত্রী এস. জয়শঙ্করের মধ্যে এক সংক্ষিপ্ত অথচ তাৎপর্যপূর্ণ ‘হ্যান্ডশেক ডিপ্লোমেসি’ বা করমর্দন কূটনীতি সম্পন্ন হয়েছে।
জানাজার মাঠে আকস্মিক সৌজন্য: প্রেস রিলিজের নেপথ্য তথ্য
ইসলামাবাদে ফিরে আয়াজ সাদিকের দপ্তর থেকে প্রকাশিত বিস্তারিত প্রেস রিলিজে দাবি করা হয়েছে, এই সাক্ষাতের উদ্যোগটি ছিল সম্পূর্ণ ভারতীয় পররাষ্ট্রমন্ত্রীর পক্ষ থেকে। বিবৃতিতে বলা হয়: “ভারতের বিদেশ মন্ত্রী ড. এস জয়শঙ্কর নিজেই স্পিকারের কাছে এগিয়ে আসেন এবং করমর্দন করেন। তিনি নিজের পরিচয় দেন এবং জানান যে তিনি স্পিকারকে চিনতে পেরেছেন।”
কূটনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, ভিড়ের মাঝে জয়শঙ্করের এই অগ্রবর্তী পদক্ষেপ অত্যন্ত অর্থবহ। মে মাসের যুদ্ধের পর দুই দেশের মধ্যে যেখানে কথা বলাই বন্ধ ছিল, সেখানে এই সৌজন্য বিনিময় একটি অঘোষিত ‘তলোয়ারের ধার কমানোর’ চেষ্টা হতে পারে।
মে মাসের যুদ্ধ ও পাহালগাম ছায়া
এই সাক্ষাতের গুরুত্ব বুঝতে হলে আমাদের ফিরে তাকাতে হবে মে মাসে। ভারত-শাসিত কাশ্মীরের পাহালগামে হামলার পর ভারত সরাসরি পাকিস্তানকে দায়ী করে। পাকিস্তান একে ‘ফলস ফ্ল্যাগ অপারেশন’ বা সাজানো ঘটনা বলে অভিহিত করে একটি স্বাধীন আন্তর্জাতিক তদন্তের দাবি জানায়।
সামরিক সংঘাত: গত ৭ মে ভারত পাঞ্জাব ও আজাদ কাশ্মীরে বিমান হামলা চালালে চার দিনব্যাপী আকাশযুদ্ধ শুরু হয়।
যুদ্ধবিরতি: ১০ মে আমেরিকার হস্তক্ষেপে যুদ্ধবিরতি হলেও দুই দেশের সম্পর্ক তলানিতে ঠেকে। সিন্ধু পানি চুক্তি (IWT) স্থগিত করা এবং প্রধান সীমান্ত পথ বন্ধ করার মতো কঠোর পদক্ষেপ নেয় নয়াদিল্লি।
সিন্ধু পানি চুক্তি ও ‘পানির অস্ত্রায়ন’ (Water Weaponization)
সাদিক-জয়শঙ্কর সাক্ষাতের ঠিক আগের সপ্তাহগুলোতে সম্পর্কের নতুন বিষফোঁড়া হয়ে দাঁড়ায় পানির হিস্যা।
আন্তর্জাতিক আদালতের চপেটাঘাত: জুন মাসে হেগের পারমানেন্ট কোর্ট অফ আরবিট্রেশন (PCA) রায় দেয় যে, ভারত একতরফাভাবে সিন্ধু পানি চুক্তি স্থগিত করতে পারে না।
বর্তমান সংকট: চলতি মাসে চেনাব ও ঝিলাম নদীতে পানির প্রবাহে অস্বাভাবিক হ্রাসের কারণে পাকিস্তানের পাঞ্জাব প্রদেশের কৃষকরা চরম সংকটে পড়েছেন। ইসলামাবাদ একে ভারতের ‘পানির অস্ত্রায়ন’ হিসেবে বর্ণনা করেছে। স্পিকার আয়াজ সাদিক ঢাকা সফরে এই বিষয়টি পাকিস্তানের ‘শান্তি ও সংলাপের’ নীতির অংশ হিসেবে তুলে ধরেছেন।
পাকিস্তান ও ভারতের সংবাদমাধ্যমের বিপরীতমুখী বয়ান
এই একটি করমর্দন নিয়ে দুই দেশের সংবাদমাধ্যমে চলছে চুলচেরা বিশ্লেষণ:
পাকিস্তানি মিডিয়া (Dawn, Tribune): তারা একে পাকিস্তানের নৈতিক বিজয় হিসেবে দেখাচ্ছে। তাদের দাবি, আন্তর্জাতিক চাপের মুখে ভারত এখন নমনীয় হতে বাধ্য হচ্ছে।
ভারতীয় মিডিয়া (Republic, Times of India): ভারতীয় সংবাদমাধ্যমগুলো বিষয়টিকে অত্যন্ত ছোট করে দেখার চেষ্টা করছে। তাদের মতে, এটি কেবলই একটি সামাজিক সৌজন্য এবং এর সাথে নীতিগত পরিবর্তনের কোনো সম্পর্ক নেই।
চূড়ান্ত বিশ্লেষণ: এটি কি টেকসই কোনো শুরু?
ঢাকার এই সাক্ষাৎ কি কেবলই একটি ব্যক্তিগত সৌজন্য, নাকি কোনো বড় কূটনৈতিক আলোচনার প্রস্তাবনা? বিশেষজ্ঞরা বলছেন:
আন্তর্জাতিক চাপ: সিন্ধু পানি চুক্তি নিয়ে আন্তর্জাতিক আদালতের নেতিবাচক পর্যবেক্ষণ ভারতকে কিছুটা রক্ষণাত্মক অবস্থানে ঠেলে দিয়েছে।
কূটনৈতিক চ্যানেল: সরাসরি যুদ্ধের পর দুই দেশের সামরিক ও বেসামরিক গোয়েন্দা সংস্থাগুলোর মধ্যে যে ‘ব্যাক-চ্যানেল’ আলোচনা বন্ধ হয়ে গিয়েছিল, ঢাকার এই মুহূর্তটি তা পুনরুজ্জীবনের সংকেত হতে পারে।
যদিও পাহাড়গাম হামলা বা কাশ্মীর ইস্যুতে দুই দেশের মৌলিক অবস্থানের কোনো পরিবর্তন হয়নি, তবে ঢাকার মাটিতে দুই শীর্ষ নেতার এই করমর্দন অন্তত এটুকু নিশ্চিত করেছে যে, প্রতিবেশী এই দুই রাষ্ট্র চিরকাল যুদ্ধের ময়দানে থাকতে পারে না।
ভারত ও পাকিস্তানের সংবাদমাধ্যমের প্রতিক্রিয়ার তুলনা
| বিষয় | পাকিস্তানি সংবাদমাধ্যমের সুর (Dawn, Express Tribune) | ভারতীয় সংবাদমাধ্যমের সুর (Times of India, Livemint) |
| সাক্ষাতের উদ্যোগ | আয়াজ সাদিকের উদ্ধৃতি দিয়ে বলা হয়েছে, জয়শঙ্কর নিজেই এগিয়ে এসেছেন এবং করমর্দন করেছেন। এটিকে পাকিস্তানের কূটনৈতিক বিজয়ের ইঙ্গিত হিসেবে দেখা হচ্ছে। | ভারতীয় মিডিয়া বিষয়টিকে একটি ‘সৌজন্যমূলক বিনিময়’ (Courtesy Handshake) হিসেবে বর্ণনা করছে। তারা বলছে, পাকিস্তান এটিকে অতিরঞ্জিত করে প্রচার করছে। |
| প্রধান বার্তা | পাকিস্তান সংবাদমাধ্যম একে “মে মাসের যুদ্ধের পর বরফ গলার প্রথম সংকেত” হিসেবে অভিহিত করছে। সংলাপ ও শান্তির প্রস্তাবে ভারতের নমনীয় হওয়ার সম্ভাবনা খুঁজছে তারা। | ভারতীয় মিডিয়াগুলো একে “তথাকথিত করমর্দন” বলছে এবং মনে করিয়ে দিচ্ছে যে, সন্ত্রাসবাদ বন্ধ না হওয়া পর্যন্ত কোনো আনুষ্ঠানিক দ্বিপাক্ষিক আলোচনা সম্ভব নয়। |
| পাহালগাম হামলা | এটিকে একটি “ফলস ফ্ল্যাগ” বা সাজানো ঘটনা হিসেবে সন্দেহ প্রকাশ করে যৌথ তদন্তের ওপর জোর দিচ্ছে পাকিস্তানি মিডিয়া। | ভারতীয় মিডিয়ায় পাহালগাম হামলাকে “পাকিস্তানের মদতপুষ্ট সন্ত্রাস” হিসেবে অভিহিত করে মে মাসের সামরিক অভিযানের (Operation Sindoor) যৌক্তিকতা তুলে ধরছে। |
| পানির ইস্যু | সিন্ধু পানি চুক্তিতে ভারতের একতরফা সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে আন্তর্জাতিক আদালতের (PCA) রায়কে গুরুত্ব দিচ্ছে পাকিস্তানের পত্রিকাগুলো। | ভারতের সংবাদমাধ্যমগুলো পানি প্রবাহের পরিবর্তনকে যান্ত্রিক কারণ হিসেবে দেখে একে পাকিস্তানের “ভুয়া প্রোপাগান্ডা” হিসেবে আখ্যায়িত করছে। |









