Home First Lead মেগা প্রজেক্ট যখন মেগা বিপর্যয়: ভুল নকশার রেলপথ কি ‘স্থায়ী মৃত্যুফাঁদ’?

মেগা প্রজেক্ট যখন মেগা বিপর্যয়: ভুল নকশার রেলপথ কি ‘স্থায়ী মৃত্যুফাঁদ’?

বিজনেসটুডে২৪ প্রতিনিধি, চট্টগ্রাম: উন্নয়নের চাকা যখন প্রকৃতির স্বাভাবিক গতিপথকে নির্মমভাবে টেনে ধরে, তখন তার পরিণতি কতটা ভয়াবহ হতে পারে—তার জ্যান্ত প্রমাণ এখন দক্ষিণ চট্টগ্রাম। বুক চিতিয়ে দাঁড়িয়ে থাকা সদ্য নির্মিত দোহাজারী-কক্সবাজার রেলপথটি এখন আর কেবল কোনো রেললাইন নয়; বরং স্থানীয় কয়েক লাখ মানুষের জন্য এটি পরিণত হয়েছে এক কৃত্রিম ‘ডেথ ট্র্যাপ’ এ।
কয়েক হাজার কোটি টাকা ব্যয়ে নির্মিত এই মেগা প্রকল্প এক বিস্তীর্ণ অঞ্চলে ভৌগোলিক ও পরিবেশগত বিপর্যয় ডেকে এনেছে, নকশার আড়ালে ঢাকা পড়া মারাত্মক ভুলের খেসারত দিচ্ছে সাধারণ মানুষ।
অনুসন্ধানী চোখে সত্য: যেভাবে পানি প্রবাহের ‘কবর’ রচনা করল রেলপথ
পটিয়া, চন্দনাইশ, সাতকানিয়া ও লোহাগাড়ার ভূপ্রকৃতি হাজার বছর ধরে একটি সুনির্দিষ্ট প্রাকৃতিক নিয়মে পরিচালিত হয়ে আসছে। পূর্ব দিকের বান্দরবানের পাহাড়ি ঢাল থেকে নেমে আসা পানি বঙ্গোপসাগরে গিয়ে পড়ার জন্য অসংখ্য প্রাক-প্রাকৃতিক ছড়া, খাল ও নিচু বিল ব্যবহার করত।
সরেজমিন অনুসন্ধানে দেখা যায়, প্রায় ২০ থেকে ২৫ ফুট উঁচু মাটির বাঁধ দিয়ে তৈরি এই রেললাইনটি প্রাকৃতিকভাবে পানি নেমে যাওয়ার সেই চিরন্তন ঢালকে সম্পূর্ণ খণ্ড-বিখণ্ড করে দিয়েছে। আগে যেখানে পাহাড়ি ঢল বা ফ্ল্যাশ ফ্লাডের পানি সমতল এলাকা দিয়ে মাত্র ১২ থেকে ২৪ ঘণ্টার মধ্যে সাগরে নেমে যেত, এখন সেই পানি রেললাইনের বিশাল মাটির দেয়ালে ধাক্কা খেয়ে আটকে থাকছে। ফলে সাতকানিয়ার কেওচিয়া, বাজালিয়া এবং চন্দনাইশের বিস্তীর্ণ এলাকা সপ্তাহের পর সপ্তাহ ধরে আজ সাগরের মতো রূপ ধারণ করছে, যা অতীতে কখনো দেখা যায়নি।
নকশার আড়ালে গলদ: পরিকল্পনার যেসব মারাত্মক ও আত্মঘাতী ত্রুটি
পানি বিশেষজ্ঞদের মতামত বিশ্লেষণ করে এই প্রকল্পের পরিকল্পনায় ৩টি বড় ধরনের কাঠামোগত অপরাধ বা ত্রুটি চিহ্নিত করা গেছে:
শুষ্ক মৌসুমের ঠুনকো সমীক্ষা : রেলপথটির সম্ভাব্যতা ও নকশা প্রণয়ন করা হয়েছিল মূলত শুষ্ক মৌসুমের তথ্যের ওপর ভিত্তি করে। বর্ষাকালে উজান থেকে কী নজিরবিহীন গতি ও আয়তনে জলরাশি নেমে আসে, তার কোনো আধুনিক হাইড্রোলজিক্যাল মডেলিং করা হয়নি। প্রকৃতির রুদ্ররূপকে গণনায় না ধরাটাই ছিল এই প্রকল্পের সবচেয়ে বড় অন্ধত্ব।
টোকেন কালভার্ট ও অপর্যাপ্ত আউটলেট: মাইলের পর মাইল বিস্তৃত এই দীর্ঘ রেল ট্র্যাকে যে কয়েকটি কালভার্ট বা আন্ডারপাস দেওয়া হয়েছে, তা মহাসংকটের তুলনায় স্রেফ সমুদ্রের মাঝে বিন্দু। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এই অঞ্চলের ভূপ্রকৃতি অনুযায়ী প্রতি কিলোমিটারে যেখানে অন্তত ৫ থেকে ৭টি বড় স্প্যানের কালভার্ট বা ওপেনিং প্রয়োজন ছিল, সেখানে অনেক গুরুত্বপূর্ণ পয়েন্টে মাইলের পর মাইল কোনো পানি নিষ্কাশন পথই রাখা হয়নি। আর যে কয়েকটি রাখা হয়েছে, পাহাড়ি ঢলের বিপুল পলি ও কাঠের গুঁড়িতে সেগুলোর মুখ মুহূর্তেই বন্ধ হয়ে যায়।
স্থানীয় জ্ঞান ও দীর্ঘমেয়াদি ইতিহাসের অবমাননা: যেকোনো বড় মেগা প্রজেক্ট করার আগে স্থানীয় প্রবীণ বাসিন্দাদের অভিজ্ঞতা এবং বিগত ৫০ বছরের বন্যার সর্বোচ্চ সীমার ইতিহাস পর্যালোচনা করতে হয়। কিন্তু এই নকশায় স্থানীয় মানুষের অভিজ্ঞতাকে পুরোপুরি উপেক্ষা করে, পানি চলাচলের প্রাকৃতিক ম্যাপিংকে তোয়াক্কা না করে, কেবল জ্যামিতিক সরলরেখায় মাটির বাঁধ নির্মাণ করা হয়েছে।
খেসারত: যোগাযোগ সচল, কিন্তু জনপদ পঙ্গু
এই ত্রুটিপূর্ণ বাঁধের কারণে সবচেয়ে বড় ক্ষতির সম্মুখীন হয়েছে গ্রামীণ অর্থনীতি। হাজার হাজার একর ফসলি জমি মাসের পর মাস পানির নিচে তলিয়ে থাকায় নষ্ট হচ্ছে ফসল। ছোট ছোট ছড়া ও খালের মুখ বন্ধ হয়ে যাওয়ায় পানি নিষ্কাশন ব্যবস্থা সম্পূর্ণ ভেঙে পড়েছে, যার ফলে গ্রামীণ সড়কগুলো স্থায়ীভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। যোগাযোগের এক নতুন দিগন্ত উন্মোচিত হলেও, তার বিনিময়ে একটি প্রাচীন ও উর্বর জনপদকে স্থায়ী জলাবদ্ধতার দিকে ঠেলে দেওয়া হয়েছে।
বিপর্যয় থেকে বাঁচার উপায়: যা হতে পারে টেকসই সমাধান
স্থানীয়রা অভিমত দেন যে প্রকল্পের ভুল যখন প্রমাণিত, তখন জোড়াতালির সমাধান আর কাজে আসবে না। দক্ষিণ চট্টগ্রাম ও কক্সবাজারের অর্থনীতি এবং জনজীবনকে বাঁচাতে হলে অবিলম্বে একটি উচ্চপর্যায়ের বিশেষজ্ঞ কমিটির মাধ্যমে নিচের ক্র্যাশ প্রোগ্রামগুলো বাস্তবায়ন করতে হবে।
  • মাটির বাঁধ কেটে আরসিসি ‘ভায়াডাক্ট’ নির্মাণ: যেসব পয়েন্টে পাহাড়ি ঢলের পানির চাপ ও বেগ সবচেয়ে বেশি (বিশেষ করে সাতকানিয়ার বাজালিয়া ও চন্দনাইশ অংশ), সেসব এলাকার মাটির তৈরি উঁচু বাঁধ পুরোপুরি কেটে ফেলতে হবে। সেখানে আরসিসি পিলারের ওপর ভায়াডাক্ট বা উড়াল রেলপথ বসাতে হবে, যাতে নিচ দিয়ে বন্যার পানি সম্পূর্ণ বাধাহীনভাবে সাগরের দিকে চলে যেতে পারে।
  • মেগা ওয়াটার পাস ও কালভার্টের সংখ্যা বৃদ্ধি: বিদ্যমান রেললাইনের নিচে জরুরি ভিত্তিতে নতুন করে আরও অসংখ্য বড় ব্যাসের বক্স কালভার্ট এবং ওয়াটার পাস যুক্ত করতে হবে। বর্তমান কালভার্টগুলোর গভীরতা ও প্রশস্ততা অন্তত তিন গুণ বাড়াতে হবে।
  • প্রাকৃতিক ছড়া ও খালের ‘রাইট অব ওয়ে’ পুনরুদ্ধার: রেলপথের কারণে যেসব স্থানীয় ছড়া ও খালের মুখ ভরাট হয়ে গেছে, স্যাটেলাইট ম্যাপ দেখে সেগুলো চিহ্নিত করে পুনঃখনন করতে হবে। রেললাইনের উভয় পাশে সমন্বিত ড্রেনেজ নেটওয়ার্ক তৈরি করতে হবে।
  • নদীসমূহের ক্যাপিটাল ড্রেজিং: রেলপথের সংস্কারের পাশাপাশি সাঙ্গু, মাতামুহুরী ও বাঁকখালী নদীর তলদেশের বছরের পর বছর জমে থাকা পলি ক্যাপিটাল ড্রেজিংয়ের মাধ্যমে অপসারণ করতে হবে, যাতে তারা ঢলের পানি দ্রুত সাগরে বয়ে নিয়ে যেতে পারে।
উন্নয়ন আর ধ্বংসের মধ্যকার দূরত্ব খুবই কম। দোহাজারী-কক্সবাজার রেলপথের এই কাঠামোগত ও নকশাগত ত্রুটি যদি দ্রুত যুদ্ধকালীন তৎপরতায় সংশোধন করা না হয়, তবে প্রতি বছরের বর্ষা দক্ষিণ চট্টগ্রামের মানুষের জন্য কেবল অভিশাপই বয়ে আনবে।