পেশাদার সাংবাদিকতায় চার দশকের পথচলায় একটা বিষয় বারবার ফিরে আসে—সংবাদ সূত্রের বিচিত্র মনস্তত্ত্ব। একজন পোড়খাওয়া রিপোর্টারের ডেস্কে যখন কোনো আগন্তুক তথ্যের ঝুলি নিয়ে হাজির হন, তখন পর্দার আড়ালে চলে এক অদ্ভুত মনস্তাত্ত্বিক লড়াই।
অধিকাংশ ক্ষেত্রে দেখা যায়, কোনো ব্যক্তির ব্যক্তিগত স্বার্থ যখন ক্ষুণ্ণ হয় কিংবা প্রতিপক্ষকে ঘায়েল করার জেদ চাপে, তখনই তিনি সংবাদপত্রের দরজায় কড়া নাড়েন। অথচ উপস্থাপনার ঢংটি এমন হয় যে, মনে হবে তিনি বৃহত্তর জনস্বার্থে এক যুগান্তকারী তথ্য নিয়ে এসেছেন।
অভিজ্ঞ রিপোর্টার আগন্তুকের চোখের ভাষা আর বাচনভঙ্গি দেখেই বুঝে ফেলেন আসল উদ্দেশ্য। কিন্তু সেই মুহূর্তে আসল সত্যটা বুঝতে দেওয়া মানেই তথ্যের উৎসটি হারিয়ে ফেলা। তাই এখানে রিপোর্টারের সবচেয়ে বড় অস্ত্র হলো ‘বোকা সাজা’।
আগন্তুক যখন তার সাজানো বয়ান তুলে ধরেন, রিপোর্টার তখন অত্যন্ত বিনয়ের সাথে এমন ভাব করেন যেন তিনি এক মহা-উপকার পাচ্ছেন। এই কৃত্রিম বোকামির আড়ালে রিপোর্টার আসলে ঠান্ডা মাথায় সংগ্রহ করতে থাকেন খবরের প্রাথমিক সূত্রগুলো।
তথ্যদাতা যখন বিজয়ীর বেশে ফিরে যান এবং ভাবেন যে রিপোর্টারকে তিনি বেশ ভালোভাবেই নিজের স্বার্থে ব্যবহার করতে পেরেছেন, তখনই শুরু হয় সাংবাদিকের আসল কাজ। প্রাথমিক সূত্রের ওপর দাঁড়িয়ে শুরু হয় বস্তুনিষ্ঠ তথ্যের অনুসন্ধান, মাঠপর্যায়ের যাচাই-বাছাই এবং দুই পক্ষের ভারসাম্য রক্ষা।
খবরের ভেতরে লুকিয়ে থাকা সত্যকে বের করে আনতে একজন রিপোর্টারকে অনেক সময় নিজের চতুরতা বিসর্জন দিয়ে কেবল একজন মনোযোগী শ্রোতা হতে হয়।
অবশেষে যখন সেই সংবাদটি পত্রিকায় ছাপা হয়, তখন দৃশ্যপট আমূল বদলে যায়। তথ্যদাতা দেখেন, তার ব্যক্তিগত প্রতিহিংসা নয়, বরং নিখাদ সত্যটিই জনসমক্ষে উন্মোচিত হয়েছে। যে রিপোর্টারকে তিনি ‘সহজ-সরল’ ভেবেছিলেন, তার ক্ষুরধার লেখনী দেখে তিনি স্তব্ধ হয়ে যান।
দিনশেষে এটা স্পষ্ট হয় যে, সাংবাদিকরা যতটা না চতুর, তার চেয়ে বেশি কুশলী। আর তাদের এই ‘বোকা সাজা’র নেপথ্যেই লুকিয়ে থাকে একটি নির্ভীক ও প্রকৃত সংবাদের জন্মকথা।