Home নির্বাচন খাগড়াছড়ি: তিন বাঙালি প্রার্থীর লড়াই, ‘ট্রাম্পকার্ড’ আঞ্চলিক দলের হাতে

খাগড়াছড়ি: তিন বাঙালি প্রার্থীর লড়াই, ‘ট্রাম্পকার্ড’ আঞ্চলিক দলের হাতে

বিজনেসটুডে২৪ প্রতিনিধি, খাগড়াছড়ি: দ্বাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের আমেজ কাটতে না কাটতেই খাগড়াছড়ি সংসদীয় আসনে রাজনৈতিক উত্তাপ ছড়াতে শুরু করেছে। বিএনপি, জামায়াতে ইসলামী ও জাতীয় নাগরিক পার্টি (এনসিপি) ইতিমধ্যে তাদের প্রার্থীর নাম ঘোষণা করে মাঠে নেমেছে। চমকপ্রদ বিষয় হলো, পাহাড়ি অধ্যুষিত এই জনপদে ঘোষিত তিন প্রার্থীই বাঙালি। ফলে আদিবাসী বা পাহাড়ি কোনো প্রার্থী শেষ পর্যন্ত প্রতিদ্বন্দ্বিতায় আসবেন কি না, তা নিয়ে ধোঁয়াশা থাকলেও ভোটের চূড়ান্ত সমীকরণ মেলাতে অপেক্ষা করতে হবে আঞ্চলিক দলগুলোর সিদ্ধান্তের ওপর।

বাঙালি প্রার্থী বনাম পাহাড়ি ভোট ব্যাংক
খাগড়াছড়ি আসনে বিএনপি থেকে মনোনয়ন পেয়েছেন সাবেক সংসদ সদস্য ও উন্নয়ন বোর্ডের সাবেক চেয়ারম্যান ওয়াদুদ ভূঁইয়া। জামায়াতে ইসলামীর প্রার্থী হিসেবে মাঠে আছেন সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী অ্যাডভোকেট এয়াকুব আলী চৌধুরী। অন্যদিকে, জাতীয় নাগরিক পার্টি (এনসিপি) থেকে লড়বেন অ্যাডভোকেট মনজিলা ঝুমা।

রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, এই আসনে জয়ের মূল চাবিকাঠি বা ‘নিয়ামক’ শক্তি হলো আদিবাসী ভোটাররা। অতীতের নির্বাচনগুলো পর্যালোচনা করলে দেখা যায়, বাঙালি ভোট বিভিন্ন দলে বিভক্ত হলেও পাহাড়ি ভোটগুলো সাধারণত একটি নির্দিষ্ট বাক্সে পড়ার রেওয়াজ রয়েছে। বিএনপি, জামায়াত কিংবা এনসিপি—সবার জন্যই বড় চ্যালেঞ্জ পাহাড়ের অনিবন্ধিত আঞ্চলিক দলগুলো। ইউপিডিএফ, ইউপিডিএফ (গণতান্ত্রিক), জনসংহতি সমিতি (এম এন লারমা) এবং জেএসএস (সন্তু লারমা)—এই দলগুলো যদি ঐক্যবদ্ধভাবে একক কোনো প্রার্থী দেয়, তবে মূলধারার দলগুলোর সব হিসাবনিকাশ উল্টে যেতে পারে।

আঞ্চলিক দলগুলোর অবস্থান
জেলায় সাংগঠনিকভাবে সবচেয়ে শক্তিশালী প্রসিত বিকাশ খীসার নেতৃত্বাধীন ইউপিডিএফ। দলটির জেলা সংগঠক অংগ্য মারমা জানান, গত নির্বাচনে তাদের দল ৬৭ হাজার ভোট পেয়েছিল। সুষ্ঠু পরিবেশ ও লেভেল প্লেয়িং ফিল্ড নিশ্চিত হলে এবং নির্বাচন কমিশনের নিবন্ধন জট খুললে তারা নির্বাচনে অংশ নিতে প্রস্তুত।

অন্যদিকে, জনসংহতি সমিতির (এম এন লারমা) কেন্দ্রীয় সাংগঠনিক সম্পাদক সুধাকর ত্রিপুরা জানান, পরিস্থিতি বিবেচনা করে তারা একক নাকি জোটবদ্ধভাবে নির্বাচনে যাবেন, সে সিদ্ধান্ত নেবেন। তবে নির্বাচনে তাদের ভূমিকা থাকবেই।

দলীয় প্রার্থীদের দাবি ও প্রত্যাশা
বিএনপি নেতারা মনে করেন, পাহাড়ি-বাঙালি নির্বিশেষে সবার কাছে জনপ্রিয় ওয়াদুদ ভূঁইয়া। জেলা বিএনপির সাধারণ সম্পাদক এম এন আফছার বলেন, ‘অতীতের যেকোনো সময়ের চেয়ে বিএনপি এখন সুসংগঠিত। ২০০১ পরবর্তী সময়ে পাহাড়ে ওয়াদুদ ভূঁইয়ার উন্নয়ন কর্মকাণ্ড তাকে সব সম্প্রদায়ের কাছে গ্রহণযোগ্য করে তুলেছে।’

জামায়াতের প্রার্থী অ্যাডভোকেট এয়াকুব আলী চৌধুরী বলেন, ‘মানুষ এখন আর নেতা চায় না, সেবক চায়। ৫৪ বছরের শাসনে হতাশ মানুষ এবার দুর্নীতিমুক্ত ও সৎ প্রার্থী হিসেবে আমাকে বেছে নেবে।’

এদিকে এনসিপির প্রার্থী ও জেলা পরিষদ সদস্য অ্যাডভোকেট মনজিলা ঝুমা বৈষম্যমুক্ত এবং পাহাড়ি-বাঙালি সমতাপূর্ণ পরিবেশ গড়ার প্রতিশ্রুতি দিয়ে গণসংযোগ করছেন।

ভোটের পরিসংখ্যান ও অতীত ইতিহাস
৯টি উপজেলা, ৩টি পৌরসভা ও ৩৮টি ইউনিয়ন নিয়ে গঠিত খাগড়াছড়ি আসনে মোট ভোটার ৫ লাখ ৪২ হাজার ৫৯৪ জন। ১৯৭৩ সালে প্রথম সংসদে এখানে এমপি হয়েছিলেন স্বতন্ত্র প্রার্থী মানবেন্দ্র নারায়ণ লারমা। এরপর বিভিন্ন সময়ে জাসদ, জাতীয় পার্টি, আওয়ামী লীগ ও বিএনপির প্রার্থীরা জয়ী হয়েছেন। ২০০১ সালে বিএনপি জিতলেও নবম থেকে দ্বাদশ সংসদ পর্যন্ত আসনটি আওয়ামী লীগের দখলে ছিল।

এখন দেখার বিষয়, পাহাড়ের নীরব আঞ্চলিক শক্তিগুলো শেষ পর্যন্ত কী সিদ্ধান্ত নেয় এবং বাঙালি প্রার্থীদের ভিড়ে ভোটের মাঠের নিয়ন্ত্রণ কার হাতে থাকে।