মধ্যপ্রাচ্যের উপকূলে বিশ্ব অর্থনীতির অন্যতম প্রধান ধমনী ‘হরমুজ প্রণালি’ ঘিরে ঘনিয়ে আসছে এক মহাপ্রলয়ঙ্কারী যুদ্ধের ছায়া। মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের দেওয়া সময়সীমা বা আল্টিমেটাম আজ মঙ্গলবার রাত ৮টায় (গ্রিনিচ মান সময় মধ্যরাত) শেষ হতে চলেছে। ট্রাম্পের হুঁশিয়ারি অনুযায়ী, এই সময়ের মধ্যে প্রণালিটি সব ধরনের জাহাজ চলাচলের জন্য উন্মুক্ত না করলে যুক্তরাষ্ট্র ‘এক রাতেই’ ইরানকে ধ্বংস করে দেওয়ার হুমকি দিয়েছে। তবে রণহুঙ্কারের এই আবহে এশীয় শক্তিগুলো ওয়াশিংটনের সামরিক ছায়ার ওপর ভরসা না রেখে তেহরানের সঙ্গে সরাসরি সমঝোতার এক নতুন কূটনৈতিক কৌশল বেছে নিয়েছে।
ট্রাম্পের আল্টিমেটাম ও যুদ্ধের রণধ্বনি
প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের এবারের হুমকি গতানুগতিক সামরিক চাপের চেয়েও কয়েক গুণ কঠোর। তেহরানকে দেওয়া সরাসরি এই আল্টিমেটামে স্পষ্ট করা হয়েছে যে, নির্ধারিত সময়ের মধ্যে সমঝোতা না হলে যুক্তরাষ্ট্র এবং তার মিত্ররা ইরানের বিরুদ্ধে চূড়ান্ত সামরিক অ্যাকশনে যাবে। মূলত যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের বিমান হামলার প্রেক্ষাপটে ইরান যখন পালটা ব্যবস্থা হিসেবে বিশ্বের এক-পঞ্চমাংশ জ্বালানি সরবরাহকারী এই নৌপথটি বন্ধ বা বিঘ্নিত করার হুমকি দেয়, তখনই উত্তেজনার পারদ চরমে ওঠে। ওয়াশিংটন মনে করছে, বলপ্রয়োগের মাধ্যমেই কেবল এই সরু জলপথের নিয়ন্ত্রণ পুনরুদ্ধার সম্ভব।
এশিয়ার ‘জ্বালানি কূটনীতি’ ও তেহরান কার্ড
ওয়াশিংটন যখন রণসাজে সজ্জিত, তখন এশিয়ার প্রধান অর্থনীতির দেশগুলো ভিন্ন পথে হাঁটার সিদ্ধান্ত নিয়েছে। চীন, জাপান ও দক্ষিণ কোরিয়ার মতো দেশগুলো তাদের অর্থনীতির চাকা সচল রাখতে উপসাগরীয় অঞ্চলের তেলের ওপর ব্যাপকভাবে নির্ভরশীল। ট্রাম্পের হামলা শুরু হওয়ার পর কী হবে, সেই অনিশ্চয়তায় বসে না থেকে তারা সরাসরি তেহরানের সঙ্গে আলোচনায় বসেছে। নির্ভরযোগ্য সূত্রে জানা গেছে, কয়েকটি এশীয় দেশ ইরানের সঙ্গে পৃথক ‘নিরাপত্তা সমঝোতা’ করেছে, যাতে উত্তেজনার মধ্যেও তাদের তেলবাহী জাহাজগুলো নির্বিঘ্নে চলাচল করতে পারে।
এই পদক্ষেপটি ভূ-রাজনীতিতে অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ। এটি একদিকে যেমন ওয়াশিংটনের একক আধিপত্যের প্রতি চ্যালেঞ্জ, অন্যদিকে এটি প্রমাণ করে যে, জ্বালানি নিরাপত্তার প্রশ্নে এশিয়ার দেশগুলো বড় কোনো যুদ্ধের অংশীদার হতে অনিচ্ছুক।
বিশ্ববাজারে অস্থিরতা ও তেলের দামের প্রভাব
হরমুজ প্রণালি বন্ধের সামান্য আশঙ্কাতেই বিশ্ববাজারে তেলের সরবরাহ শিকল ভেঙে পড়ার উপক্রম হয়েছে। গত কয়েক দিনে আন্তর্জাতিক বাজারে অপরিশোধিত তেলের দাম লাফিয়ে লাফিয়ে বাড়ছে। সরবরাহকারী দেশগুলো আশঙ্কা করছে, যদি সত্যি আজ রাতে কোনো সামরিক সংঘাত শুরু হয়, তবে জ্বালানি সংকট এক অভাবনীয় পর্যায়ে পৌঁছাবে। জাহাজ চলাচল বিঘ্নিত হওয়ার প্রভাব ইতিমধ্যে উন্নয়নশীল দেশগুলোর বাজারে পড়তে শুরু করেছে।
এক অনিশ্চিত মধ্যরাতের অপেক্ষায়
আজ রাত ৮টার পর মধ্যপ্রাচ্যের আকাশে নতুন করে বোমারু বিমানের গর্জন শোনা যাবে, নাকি পর্দার আড়ালের কূটনীতি কোনো সমাধানের পথ দেখাবে—সেটাই এখন বড় প্রশ্ন। ইরান যদি তাদের অবস্থানে অনড় থাকে এবং এশীয় দেশগুলোর সঙ্গে করা সমঝোতাকে ঢাল হিসেবে ব্যবহার করতে চায়, তবে ট্রাম্পের প্রতিক্রিয়া কী হবে তা নিয়ে বিশ্বজুড়ে উদ্বেগ বাড়ছে।
সব মিলিয়ে, ঘড়ির কাঁটা যতই গ্রিনিচ মান সময় মধ্যরাতের দিকে এগোচ্ছে, ততই সংকুচিত হয়ে আসছে শান্তির সুযোগ। বিশ্ব এখন তাকিয়ে আছে এক চরম অনিশ্চয়তার দিকে, যার কেন্দ্রে রয়েছে মাত্র কয়েক মাইল প্রশস্ত একটি জলপথ আর কয়েক ঘণ্টার একটি আল্টিমেটাম।
businesstoday24.com-এর সাথে থাকুন। নিয়মিত আপডেট পেতে আমাদের ফলো করুন এবং আপনার মূল্যবান মন্তব্য নিচে শেয়ার করুন।