বিজনেসটুডে২৪ প্রতিনিধি, যশোর: হাতে ট্রলি ব্যাগ, সঙ্গী স্ত্রী মৃণাল ত্রিবেদী। প্রচলিত কূটনৈতিক প্রথা ভেঙে আকাশপথ এড়িয়ে সম্পূর্ণ ভিন্ন এক সুনির্দিষ্ট বার্তায় সড়কপথে বাংলাদেশে এলেন নতুন ভারতীয় হাইকমিশনার এইচ.ই. শ্রী দীনেশ ত্রিবেদী। গতকাল শুক্রবার সকালে তিনি ভারতের উত্তর ২৪ পারগনার পেট্রাপোল আন্তর্জাতিক চেকপোস্ট দিয়ে এবং বেলা সাড়ে ১১টার দিকে বাংলাদেশের বেনাপোল স্থলবন্দর হয়ে ঢাকার উদ্দেশে রওনা হন।
বাংলাদেশের ৫৫ বছরের কূটনৈতিক ইতিহাসে দীনেশ ত্রিবেদীই প্রথম রাজনৈতিক ব্যক্তিত্ব, যাকে হাইকমিশনার হিসেবে ঢাকায় পাঠিয়েছে নয়াদিল্লি। তিনি বিদায়ী হাইকমিশনার প্রণয় কুমার ভার্মার স্থলাভিষিক্ত হয়েছেন। উল্লেখ্য, গত ৫ই জুন ভারতের রাষ্ট্রপতি দ্রৌপদী মুর্মুর কাছ থেকে আনুষ্ঠানিকভাবে পরিচয়পত্র বা পত্রাধিকার গ্রহণ করেন দীনেশ ত্রিবেদী, যার মাধ্যমে তিনি বাংলাদেশে ভারতের হাইকমিশনার হিসেবে দায়িত্ব পালনের আইনি ও আনুষ্ঠানিক অনুমোদন লাভ করেন। ঢাকায় পৌঁছে তিনি বাংলাদেশের রাষ্ট্রপতির কাছে পরিচয়পত্র (ক্রিডেনশিয়ালস) পেশের মাধ্যমে আনুষ্ঠানিকভাবে তার কূটনৈতিক দায়িত্ব গ্রহণের কার্যক্রম শুরু করবেন।
সীমান্তে জমকালো অভ্যর্থনা ও কঠোর নিরাপত্তা
নতুন হাইকমিশনারের আগমনকে কেন্দ্র করে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের রাষ্ট্রাচার অনুবিভাগ থেকে আগেই স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় ও স্থানীয় প্রশাসনকে প্রয়োজনীয় নিরাপত্তা ও আনুষ্ঠানিকতা নিশ্চিত করার নির্দেশনা দেওয়া হয়েছিল। এর পরিপ্রেক্ষিতে বেনাপোল কাস্টমস হাউজ, ইমিগ্রেশন, বন্দর কর্তৃপক্ষ, পুলিশ ও বিজিবিসহ সংশ্লিষ্ট সব দপ্তর সর্বোচ্চ সতর্ক অবস্থানে ছিল। বেনাপোল চেকপোস্ট ও যশোর-ঢাকা মহাসড়কে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্যরা বিশেষ নিরাপত্তা বলয় তৈরি করেন এবং সফরের জন্য প্রয়োজনীয় সব ধরনের প্রটোকল নিশ্চিত করেন।
বেলা সাড়ে ১১টার দিকে তিনি বেনাপোল স্থলবন্দরে পৌঁছালে নো-ম্যান্সল্যান্ডে তাকে স্বাগত জানান বাংলাদেশের সরকারি কর্মকর্তা এবং ভারতীয় হাইকমিশনের প্রতিনিধি দল। স্বাগত অনুষ্ঠানে উপস্থিত ছিলেন বেনাপোল স্থলবন্দরের পরিচালক শামীম হোসেন, ডেপুটি চিফ অব প্রোটোকল আরিফ মোহাম্মদ, পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের সিনিয়র সহকারী সচিব সরোয়ার মোহাম্মদ শাহরিয়ার খান, উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা ফজলে ওয়াহিদ, সহকারী কমিশনার অতুল গোস্বামী, ইমিগ্রেশন, কাস্টমস, বন্দর ও প্রশাসনের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাসহ বিভিন্ন গোয়েন্দা সংস্থার প্রতিনিধিরা।
অন্যদিকে ভারতীয় হাইকমিশনের পক্ষ থেকে নতুন হাইকমিশনারকে স্বাগত জানাতে ভারপ্রাপ্ত হাইকমিশনার পবনকুমার তুলসীদাস বাধে এবং সেকেন্ড সেক্রেটারি গৌরব আগরওয়ালসহ একটি কূটনৈতিক প্রতিনিধিদল আগে থেকেই যশোরে অবস্থান করছিলেন এবং পরে সীমান্তে উপস্থিত হয়ে দীনেশ ত্রিবেদী দম্পতিকে অভ্যর্থনা জানান।
যৌথ শক্তির বৈশ্বিক দৃষ্টান্তের আহ্বান ও নতুন বার্তা
বেনাপোল স্থলবন্দরে সাংবাদিকদের সঙ্গে আলাপকালে দীনেশ ত্রিবেদী বাংলাদেশ-ভারত সম্পর্ককে আরও এগিয়ে নেওয়ার দৃঢ় প্রত্যয় ব্যক্ত করেন। অত্যন্ত আবেগঘন কণ্ঠে তিনি বলেন, “একই আকাশ, একই বাতাস, একই জল তরঙ্গ। আমরা মিলেমিশে কাজ করব।”
হাইকমিশনার বলেন, “এখানে এসে খুবই ভালো লাগছে। ভারত ও বাংলাদেশ দুটি উন্নত ও শক্তিশালী গণতান্ত্রিক দেশ। দুই দেশের পারস্পরিক সহযোগিতা বাড়লে তা শুধু আঞ্চলিক নয়, বৈশ্বিক অর্থনৈতিক শক্তিতেও রূপ নিতে পারে।” জনসংখ্যার এক বিশাল সমীকরণের উল্লেখ করে তিনি বলেন, “ভারতের ১৪০ কোটি জনসংখ্যা আর বাংলাদেশের ২০ কোটি যদি একসাথে করা হয়, তবে তা দাঁড়ায় ১৬০ কোটি। দুই দেশের শক্তি এক হলে তা বিশ্ব শক্তিতে পরিণত হবে এবং আন্তর্জাতিকভাবে এটি একটি বৃহৎ জনশক্তিতে রূপান্তরিত হবে।”
ভবিষ্যৎ প্রজন্মের অগ্রগতির রোডম্যাপ তুলে ধরে তিনি আরও যোগ করেন, “শুধু একটি একক শক্তি যথেষ্ট হবে না। উভয় দেশ একত্রিত হলে যে শক্তি উৎপন্ন হয়, সেটাই প্রকৃত ও আসল শক্তি। সমগ্র বিশ্ব সেই শক্তি দেখুক। ভারত এবং বাংলাদেশে যে অনন্য ট্যালেন্ট বা প্রতিভা আছে, তা কাজে লাগিয়ে আগামী প্রজন্মের জন্য আমরা যোগাযোগ, শিক্ষা, স্বাস্থ্য, প্রযুক্তি এবং খেলাধুলাসহ প্রতিটি গুরুত্বপূর্ণ খাতে যৌথভাবে কাজ করব।”
ট্যুরিস্ট ভিসা ও পুশইন ইস্যু নিয়ে গুরুত্বপূর্ণ আশ্বাস
সীমান্তে বহুল আলোচিত ‘পুশইন’ বা অনুপ্রবেশ ইস্যু নিয়ে দুই দেশের মধ্যে চলমান মনস্তাত্ত্বিক চাপানউতোর সংক্রান্ত এক প্রশ্নের জবাবে হাইকমিশনার অত্যন্ত ইতিবাচক মনোভাব প্রদর্শন করেন। তিনি সরাসরি বলেন, “পুশইন দুই দেশের বন্ধুত্বের ক্ষেত্রে বড় কোনো বাধা নয়। এই ইস্যুটি নিয়ে দুই দেশ কাজ করছে। আশা করছি সহজে এই সমস্যার ইতি ঘটবে।”
একই সাথে সাধারণ বাংলাদেশিদের জন্য ভারতে যাতায়াতের ক্ষেত্রে অত্যন্ত সংবেদনশীল বিষয়—’ট্যুরিস্ট ভিসা’ বা পর্যটন ভিসা চালুর বিষয়ে জানতে চাওয়া হলে নতুন হাইকমিশনার আশ্বস্ত করে বলেন, বিষয়টি তার বিবেচনায় রয়েছে এবং ভবিষ্যতে এমন একটি উদ্যোগ নেওয়া হবে যাতে সবাই সন্তুষ্ট হয়।
তিনি আরও উল্লেখ করেন যে, ভারত ও বাংলাদেশ অভিন্ন আকাশ-বাতাস ভাগাভাগি করে, তাই দুই দেশের সাধারণ মানুষের জন্য যা কল্যাণকর ও মঙ্গলজনক, ভবিষ্যতে অবশ্যই সে ধরনের প্রতিটি পদক্ষেপ গুরুত্বের সাথে নেওয়া হবে।
সড়কপথ বেছে নেওয়ার নেপথ্য কৌশল
এর আগে ২০২০ সালে করোনা মহামারির কারণে বিমান চলাচল বন্ধ থাকায় তৎকালীন হাইকমিশনার বিক্রম দোরাইস্বামী আখাউড়া-আগরতলা সীমান্ত দিয়ে বাংলাদেশে এসেছিলেন। তবে বর্তমান স্বাভাবিক পরিস্থিতিতে দীনেশ ত্রিবেদীর এই সড়কপথ বেছে নেওয়ার সিদ্ধান্তের নেপথ্যে কূটনৈতিক বিশেষজ্ঞরা গভীর তাৎপর্য দেখছেন। প্রথমত, দুই দেশের মধ্যে সড়কপথের অবকাঠামোগত উন্নয়ন ও পরিকাঠামো সরাসরি প্রত্যক্ষ করা। দ্বিতীয়ত, সীমান্তে নিজে দাঁড়িয়ে পাসপোর্ট, ভিসাসহ সমস্ত প্রয়োজনীয় নথিপত্র বৈধভাবে প্রদর্শন করে বাংলাদেশে পা রেখে তিনি এই বার্তাই দিলেন যে, এক দেশের নাগরিকের অন্য দেশে প্রবেশের একমাত্র মাধ্যম হতে হবে সম্পূর্ণ আইনি ও বৈধ প্রক্রিয়া। সীমান্তের আনুষ্ঠানিকতা শেষে দীনেশ ত্রিবেদী দম্পতি ও তাদের সফরসঙ্গীরা সড়কপথে ঢাকার উদ্দেশ্যে রওনা হন।