আপনি কি পুষ্টি খাচ্ছেন নাকি ডিটারজেন্ট
সিরিজ প্রতিবেদন
পকেটে সিঁধ: ভোক্তার প্রতিদিনের লড়াই
কামরুল হাসান
শিশুর প্রধান খাদ্য থেকে শুরু করে বয়স্কদের আদর্শ পথ্য—দুধ ছাড়া আমাদের চলে না। কিন্তু এই দুধই এখন যমদূত হয়ে দাঁড়িয়েছে। অসাধু চক্র স্রেফ মুনাফার জন্য গরুর খাঁটি দুধের সাথে সয়াবিন তেল, ডিটারজেন্ট পাউডার, চিনি এবং ঘন করার জন্য ভাতের মাড় বা স্টার্চ মিশিয়ে দিচ্ছে। এই ‘দুধ-জালিয়াতি’ কেবল আপনার পকেট খালি করছে না, বরং আপনার পরিবারের কিডনি ও লিভার অকেজো করে দিচ্ছে।
বিভিন্ন সময়ে সরকারি সংস্থাসমূহের অনুসন্ধানে দুগ্ধজাত পণ্যের কিছু ভয়ংকর জালিয়াতি ও ধরা পড়া ঘটনার তথ্য বেরিয়ে এসেছে।
দুধের বাজারে যেভাবে চলে ‘সাদা’ জালিয়াতি
১. ডিটারজেন্ট ও সয়াবিন তেলের ‘সিন্থেটিক দুধ’: দুধের ফেনা বাড়াতে এবং একে ঘন দেখাতে ওয়াশিং পাউডার বা ডিটারজেন্ট মেশানো হয়। এছাড়া ফ্যাট বাড়ানোর জন্য মেশানো হয় সয়াবিন তেল। এই মিশ্রণটি দেখতে হুবহু দুধের মতো হলেও এটি আসলে একটি রাসায়নিক ককটেল।
২. ফরমালিন ও প্রিজারভেটিভ: দুধ যেন গরমের মধ্যে ফেটে না যায় বা নষ্ট না হয়, সেজন্য অসাধু ব্যবসায়ীরা এতে ফরমালিন বা হাইড্রোজেন পারক্সাইড মেশায়। এই বিষাক্ত উপাদানগুলো মানবদেহে ক্যান্সারের প্রধান কারণ।
৩. গুঁড়ো দুধে মেলামাইন ও স্টার্চ: আমদানিকৃত বা স্থানীয় গুঁড়ো দুধে প্রোটিনের পরিমাণ বেশি দেখাতে ক্ষতিকর মেলামাইন মেশানোর অভিযোগ দীর্ঘদিনের। এছাড়া ওজনে কারচুপি করতে সস্তা আটা বা স্টার্চ মিশিয়ে দেওয়া হয়।
অনুসন্ধান ও অভিযানে ধরা পড়া বাস্তব চিত্র:দুধের এই ভেজাল কেবল ধারণা নয়, বিভিন্ন সময়ে সরকারি ও বেসরকারি অনুসন্ধানে এর প্রমাণ পাওয়া গেছে।
বিএসটিআই ও আইসিডিডিআর,বি-র গবেষণা: ২০১৯ সালে আইসিডিডিআর,বি-র এক গবেষণায় দেখা গিয়েছিল, বাজারে থাকা প্যাকেটজাত (পাস্তুরিত) দুধের প্রায় ৭৫ শতাংশই অনিরাপদ। এতে সহনীয় মাত্রার চেয়ে বেশি ব্যাকটেরিয়া এবং অ্যান্টিবায়োটিকের উপস্থিতি পাওয়া গিয়েছিল।
হাইকোর্টের নির্দেশে পরীক্ষা: ২০১৯ সালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ফার্মেসি অনুষদের এক পরীক্ষায় দেশের নামী ১০টি কোম্পানির পাস্তুরিত দুধে মানবদেহের জন্য ক্ষতিকর অ্যান্টিবায়োটিক ও ডিটারজেন্টের উপস্থিতি ধরা পড়েছিল, যা সারা দেশে তোলপাড় সৃষ্টি করে।
ভোক্তা অধিকারের অভিযান: সাভার ও সিরাজগঞ্জের বিভিন্ন ডেইরি ফার্মে অভিযানে দেখা গেছে, বালতি বালতি দুধে চিনি, লবণ এবং সয়াবিন তেল মিশিয়ে মেশিনে তা ঘোল করা হচ্ছে যাতে ঘন ফেনা তৈরি হয়। অনেক ক্ষেত্রে গুঁড়ো দুধ গুলে তা লিকুইড দুধ হিসেবে বিক্রি করার সময় হাতেনাতে আটক করা হয়েছে।
দুধ কেনার সময় সচেতনতায় যা করবেন:
- ফেনা ও ঘ্রাণ পরীক্ষা: দুধের ওপর অস্বাভাবিক বেশি ফেনা থাকলে এবং আঙুল দিয়ে ঘষলে যদি সাবানের মতো পিচ্ছিল মনে হয়, তবে বুঝবেন এতে ডিটারজেন্ট আছে। খাঁটি দুধের একটি মিষ্টি প্রাকৃতিক ঘ্রাণ থাকে।
- রঙ পরিবর্তন: দুধ জ্বাল দেওয়ার পর যদি হালকা হলদেটে না হয়ে আরও ধবধবে সাদা বা নীলচে দেখায়, তবে এতে ভেজাল থাকার সম্ভাবনা বেশি।
- তাত্ক্ষণিক পরীক্ষা: এক ফোঁটা দুধ একটি মসৃণ ঢালু জায়গায় ফেলুন। খাঁটি দুধ হলে সেটি গড়িয়ে যাওয়ার সময় পেছনে সাদা রেখা রেখে যাবে। ভেজাল বা পানি মেশানো দুধ দ্রুত গড়িয়ে যাবে এবং কোনো চিহ্ন রাখবে না।
- পাস্তুরিত দুধের ক্ষেত্রে সতর্কতা: প্যাকেটজাত দুধ কেনার সময় বিএসটিআই-এর সিলের পাশাপাশি উৎপাদনের সময় ও তারিখ দেখে নিন। কোনো প্যাকেট ফুলা বা লিকেজ থাকলে সেটি কিনবেন না।










