বিজনেসটুডে২৪ প্রতিনিধি, বরগুনা: একসময় গ্রামের হাটে কিংবা বাড়ির আঙিনায় পড়ে থাকা নারকেলের খোসা ছিল একেবারেই ফেলনা। রান্না শেষ হলে বা পিঠা বানানোর পর খোসাগুলো ছুড়ে ফেলা হতো ঝোপে কিংবা পুকুরপাড়ে। সেই নারকেলের খোসাই যে কারও ভাগ্য বদলে দিতে পারে, তা বিশ্বাস করার মতো মানুষ খুব কমই ছিল। কিন্তু বাস্তবতা বদলে দিয়েছেন উপকূলীয় অঞ্চলের এক সাধারণ মানুষ।
তাঁর হাত ধরেই ফেলে দেওয়া নারকেল আজ পরিণত হয়েছে বৈদেশিক মুদ্রা আয়ের উৎসে। তিনি প্রমাণ করেছেন, মেকার কখনও বেকার থাকে না।
বরগুনা জেলার এক প্রত্যন্ত গ্রামের বাসিন্দা এই উদ্যোক্তার জীবন শুরু হয়েছিল দারিদ্র্যের সঙ্গে লড়াই করেই। বাবা ছিলেন দিনমজুর, মা গৃহিণী। সংসারের হাল ধরতে স্কুল ছাড়তে হয়েছিল অল্প বয়সেই। জীবিকার তাগিদে কাজ করেছেন নারকেল ভাঙার শ্রমিক হিসেবে। প্রতিদিন শত শত নারকেল ভাঙার পর পাহাড় হয়ে জমত খোসা।
সেই খোসা দেখেই প্রথম তাঁর মাথায় আসে ভিন্ন চিন্তা। বড়রা বলতেন, এসব খোসার কোনও দাম নেই। কিন্তু তিনি লক্ষ্য করলেন, খোসা শুকিয়ে গেলে শক্ত আঁশ পাওয়া যায়, যা সহজে নষ্ট হয় না।
নিজের উদ্যোগে কয়েকজন বন্ধুকে নিয়ে শুরু করেন পরীক্ষামূলক কাজ। খোসা শুকিয়ে, ভিজিয়ে, পিটিয়ে বের করতে থাকেন আঁশ। সেই আঁশ দিয়ে বানানো হয় মোটা দড়ি। প্রথমদিকে স্থানীয় বাজারে বিক্রি করার চেষ্টা হলেও তেমন সাড়া মেলেনি। অনেকেই হাসাহাসি করেছেন। কিন্তু হাল ছাড়েননি তিনি।
ধীরে ধীরে দড়ির মান উন্নত করেন। লক্ষ্য রাখেন যেন দড়ি টেকসই হয়, পানিতে সহজে নষ্ট না হয়। এই বৈশিষ্ট্যই একসময় তাঁর পণ্যের বড় শক্তিতে পরিণত হয়।
এক পর্যায়ে চট্টগ্রাম বন্দরের এক ঠিকাদারের মাধ্যমে জানতে পারেন, জাহাজে ব্যবহারের জন্য বিশেষ ধরনের নারকেল আঁশের দড়ির চাহিদা রয়েছে। যোগাযোগ করেন সরাসরি। নমুনা পাঠান। কয়েক সপ্তাহ পর আসে বড় অর্ডার। সেই প্রথম তাঁর তৈরি দড়ি ব্যবহার হয় সমুদ্রগামী জাহাজে। সেখান থেকেই খুলে যায় ভাগ্যের দরজা।
এরপর আর পেছনে তাকাতে হয়নি। শুধু দড়ি নয়, নারকেল আঁশ দিয়ে তৈরি করতে শুরু করেন মাদুর, ঝাড়ু, ফুলের মালা, দেয়াল সাজানোর সামগ্রী, ঝুলন্ত টব। গ্রামের নারীদের যুক্ত করেন কাজে। প্রশিক্ষণ দিয়ে শেখান আঁশ পরিষ্কার করা, বুনন, গাঁথুনি। আজ তাঁর কারখানায় নিয়মিত কাজ করছেন অর্ধশতাধিক মানুষ। যাঁদের বেশিরভাগই আগে ছিলেন বেকার বা অনিশ্চিত জীবনে আটকে থাকা।
সবচেয়ে বড় সাফল্য আসে রপ্তানির মাধ্যমে। ইউরোপ ও মধ্যপ্রাচ্যের কয়েকটি দেশে নিয়মিত যাচ্ছে তাঁর তৈরি নারকেল আঁশের দড়ি ও ঘর সাজানোর পণ্য। পরিবেশবান্ধব হওয়ায় এসব পণ্যের চাহিদা দিন দিন বাড়ছে। বছরে কয়েক কোটি টাকার লেনদেন হচ্ছে তাঁর এই উদ্যোগ থেকে। গ্রামের সেই দরিদ্র শ্রমিক আজ কোটিপতি উদ্যোক্তা।
তিনি বলেন, নারকেল গাছ আমাদের দেশে সর্বত্র আছে। আমরা শুধু ফলটাই ব্যবহার করি, বাকিটা ফেলে দিই। অথচ সঠিক চিন্তা আর পরিশ্রম থাকলে এই ফেলনা জিনিসই মানুষের জীবন বদলে দিতে পারে। তাঁর গল্প শুধু একজনের সাফল্যের নয়, এটি গ্রামীণ অর্থনীতির সম্ভাবনার গল্প। এটি দেখিয়ে দেয়, হাতের কাজ জানা মানুষ কখনও বেকার থাকে না, যদি সে নিজের শ্রমকে বিশ্বাস করতে পারে।
এই উদ্যোগ আজ আশপাশের গ্রামগুলোতেও ছড়িয়ে পড়ছে। অনেক তরুণ তাঁর কাছ থেকে শিখে আলাদা ছোট ইউনিট গড়ে তুলছেন। ফেলে দেওয়া নারকেল খোসা এখন আর আবর্জনা নয়, এটি হয়ে উঠেছে জীবনের রসদ। এই গল্প প্রমাণ করে, মেকার কখনও থাকে না বেকার।










