Home Second Lead সিমেন্টের বাজারে ওজন ও গুণগত মান জালিয়াতি

সিমেন্টের বাজারে ওজন ও গুণগত মান জালিয়াতি

ছবি এ আই

আপনার বাড়ির ছাদ কি আসলে নিরাপদ?

সিরিজ প্রতিবেদন

পকেটে সিঁধ: ভোক্তার প্রতিদিনের লড়াই

কামরুল হাসান

বাড়ি বানানোর সময় আমরা সবচেয়ে বেশি টাকা খরচ করি রড ও সিমেন্টে। কিন্তু চড়া দামে নামী ব্র্যান্ডের সিমেন্ট কিনেও অনেক সময় দেখা যায় ঢালাইয়ে ফাটল ধরছে বা প্লাস্টার খসে পড়ছে। এর পেছনে রয়েছে সিমেন্টের ওজন জালিয়াতি এবং পুরনো জমাট বাঁধা সিমেন্টকে পুনরায় গুঁড়ো করে নতুন প্যাকেটে ভরে বাজারজাত করার মতো ভয়ংকর কারসাজি।
এই ‘সিমেন্ট-জালিয়াতি’ কেবল আপনার পকেট কাটছে না, বরং আপনার আজীবনের সঞ্চয়ে গড়া ভবনটিকে ধসের ঝুঁকিতে ফেলছে।
বিজনেসটুডে২৪-এর অনুসন্ধানে সিমেন্ট বাজারের কিছু অন্ধকার দিক ও অভিযানে ধরা পড়া বাস্তব চিত্র বেরিয়ে এসেছে।
সিমেন্টের বাজারে যেভাবে চলে ‘ধূসর’ জালিয়াতি
  • ১. ওজনে সূক্ষ্ম চুরি: নিয়ম অনুযায়ী সিমেন্টের প্রতিটি ব্যাগের ওজন হওয়ার কথা ৫০ কেজি (নীট)। কিন্তু অসাধু ডিলার বা খুচরা বিক্রেতারা বিশেষ মেশিনের সাহায্যে প্রতিটি ব্যাগ থেকে ৫০০ গ্রাম থেকে ১ কেজি পর্যন্ত সিমেন্ট সরিয়ে ফেলে। এরপর পুনরায় সেলাই করে তা বিক্রি করে। আপনি যদি ১০০ ব্যাগ সিমেন্ট কেনেন, তবে গড়ে আপনার ২-৩ ব্যাগ সিমেন্ট চুরি হয়ে যাচ্ছে।
  • ২. পুরনো সিমেন্ট রি-প্যাকিং: সিমেন্ট উৎপাদনের ৩ মাসের মধ্যে ব্যবহার করা উচিত। বৃষ্টির পানি বা আর্দ্রতায় সিমেন্ট শক্ত হয়ে ‘ডেলা’ পাকিয়ে গেলে তার কার্যকারিতা নষ্ট হয়ে যায়। অসাধু চক্র এই জমাট বাঁধা সিমেন্টগুলো কম দামে কিনে নিয়ে মেশিনে গুঁড়ো করে নতুন ব্যাগে ভরে ‘ফ্রেশ’ বলে চালিয়ে দেয়।
  • ৩. ফ্লাই অ্যাশ ও ক্লিংকারের অপব্যবহার: পিসিএন (PCC) সিমেন্টে ক্লিংকারের সাথে নির্দিষ্ট মাত্রায় ফ্লাই অ্যাশ বা জিপসাম মেশানোর কথা। কিন্তু অনেক অসাধু মিল মালিক বা লোকাল ব্র্যান্ড খরচ কমাতে অতিরিক্ত ফ্লাই অ্যাশ বা নিম্নমানের পাথরের গুঁড়ো মিশিয়ে দেয়, যা ঢালাইয়ের শক্তি কমিয়ে দেয়।
সিমেন্টের এই জালিয়াতি নিয়ে বিভিন্ন সময়ে ভোক্তা অধিকারের অভিযানে ভয়াবহ তথ্য মিলেছে:
ভোক্তা অধিকারের অভিযান (চট্টগ্রাম ও নারায়ণগঞ্জ): গত বছর চট্টগ্রামের কর্ণফুলী ও নারায়ণগঞ্জের শীতলক্ষ্যা তীরবর্তী বিভিন্ন গুদামে অভিযানে দেখা গেছে, নামী ব্র্যান্ডের ছেঁড়া বস্তা থেকে সিমেন্ট বের করে নতুন বস্তায় ভরা হচ্ছে।
অভিযানে দেখা যায়, ৫০ কেজির বস্তায় ১ থেকে ২ কেজি পর্যন্ত সিমেন্ট কম ছিল। এ অপরাধে একাধিক ডিলারকে লক্ষাধিক টাকা জরিমানা করা হয়েছে।
বিএসটিআই-এর প্রতিবেদন: বিএসটিআই-এর পরীক্ষায় দেখা গেছে, কিছু স্থানীয় ব্র্যান্ডের সিমেন্টে ক্যালসিয়াম কার্বোনেটের পরিমাণ নির্ধারিত সীমার চেয়ে অনেক বেশি, যা সিমেন্টের জমাট বাঁধার ক্ষমতা কমিয়ে দেয়।
কনস্ট্রাকশন সাইটে জালিয়াতি: অনেক সময় সাইটের পাহারাদার বা ঠিকাদাররা ভালো সিমেন্ট সরিয়ে রেখে তাতে বালি বা ছাই মিশিয়ে দেয়, যা ভবন মালিকের অগোচরেই থেকে যায়।
সিমেন্ট কেনার সময় সচেতনতায় যা করবেন:
উৎপাদনের তারিখ (Manufacturing Date) পরীক্ষা: সিমেন্টের বস্তার গায়ে উৎপাদনের তারিখ ও ব্যাচ নম্বর অবশ্যই দেখে নিন। ৩ মাসের বেশি পুরনো সিমেন্ট কোনোভাবেই কিনবেন না।
ওজন যাচাই: শোরুম বা গুদাম থেকে সিমেন্ট নেওয়ার সময় অন্তত ৫-১০টি বস্তা রেন্ডমলি ওজন করে দেখুন। ৫০ কেজির কম হলে সেই লট গ্রহণ করবেন না।
সেলাই বা স্টিচিং পর্যবেক্ষণ: বস্তার ওপরের সেলাইটি কি অরিজিনাল ফ্যাক্টরি সেলাই নাকি হাতে করা, তা ভালো করে দেখুন। সেলাই ঢিলেঢালা বা সুতোর রঙ ভিন্ন হলে বুঝবেন এতে ভেজাল বা ওজন চুরি করা হয়েছে।
হাতের তালুতে পরীক্ষা: সিমেন্টের বস্তায় হাত ঢুকিয়ে দেখুন সেটি ঠান্ডা অনুভূত হয় কি না। যদি সিমেন্ট হালকা গরম লাগে, তবে বুঝবেন রাসায়নিক বিক্রিয়া শুরু হয়েছে বা এটি খুব টাটকা। সিমেন্ট আঙুল দিয়ে ঘষলে যদি মিহি পাউডারের মতো লাগে তবে ভালো, কিন্তু দানাদার বা বালুর মতো লাগলে বুঝবেন এতে ভেজাল আছে।
সতর্কতা: সিমেন্ট সবসময় শুকনো এবং আর্দ্রতামুক্ত জায়গায় রাখুন। কোনো ডিলার যদি ওজনে কম দেয় বা মেয়াদের তারিখ ঘষামাজা করা সিমেন্ট বিক্রি করে, তবে সাথে সাথে স্থানীয় প্রশাসন বা ভোক্তা অধিকারের হটলাইন ১৬১২১ নম্বরে অভিযোগ জানান।