আ’লীগের বিশাল ভোটব্যাংক ও সংখ্যালঘু ভোটাররাই জয়ের চাবিকাঠি
আমিরুল মোমেনিন, খুলনা: পৌষের হিমেল হাওয়া আর ঘন কুয়াশায় প্রকৃতি যখন আড়ষ্ট, তখন রাজনীতির উত্তাপে ফুটছে খুলনা। ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনকে সামনে রেখে তপশিল ঘোষণার আগেই প্রচারণায় সরগরম হয়ে উঠেছে জেলার ছয়টি সংসদীয় আসন।
আওয়ামী লীগ নির্বাচনে না থাকায় এবার ভোটের মাঠে নতুন মেরুকরণ দেখা যাচ্ছে। মূলত মাঠ দখলে রাখতে মুখোমুখি অবস্থানে রয়েছে বিএনপি ও জামায়াতে ইসলামী।
প্রতিদিন ভোরে কুয়াশার চাদর ভেদ করে গভীর রাত পর্যন্ত চলছে গণসংযোগ, উঠান বৈঠক, মোটরসাইকেল র্যালি ও পথসভা। ভোটারদের মন জয়ে দুই দলই দিচ্ছে নানা প্রতিশ্রুতি। তবে রাজনীতি সচেতনরা মনে করছেন, আওয়ামী লীগের অনুপস্থিতিতে দলটির বিশাল ভোটব্যাংক এবং সংখ্যালঘু ভোটারদের নিজেদের পক্ষে টানাই হবে প্রার্থীদের জয়ের মূল চাবিকাঠি।
আসনভিত্তিক ভোটের চালচিত্র
খুলনা-১ (দাকোপ-বটিয়াঘাটা): সংখ্যালঘু অধ্যুষিত ও আওয়ামী লীগের ঘাঁটি হিসেবে পরিচিত এ আসনে এবার ভিন্ন চিত্র। চমক হিসেবে জামায়াতে ইসলামী এখানে প্রার্থী করেছে ডুমুরিয়া উপজেলা হিন্দু কমিটির সভাপতি কৃষ্ণ নন্দীকে। হিন্দু সম্প্রদায়ের ভোট টানতে এই কৌশল নিয়েছে দলটি। অন্যদিকে, বিএনপি আস্থা রেখেছে জেলা বিএনপির সাবেক আহ্বায়ক কুদরত-ই-আমির এজাজ খানের ওপর। স্থানীয় বাসিন্দা হিসেবে তার ব্যাপক জনপ্রিয়তা রয়েছে। ভোটারদের ধারণা, আওয়ামী লীগের ভোট এবার বিএনপির ব্যালটেই পড়ার সম্ভাবনা বেশি।
খুলনা-২ (সদর-সোনাডাঙ্গা): খুলনার ‘ভিআইপি’ আসন হিসেবে খ্যাত ও বিএনপির দুর্গ বলে পরিচিত এ আসনে লড়াই হবে সেয়ানে-সেয়ানে। বিএনপির প্রার্থী সাবেক সংসদ সদস্য নজরুল ইসলাম মঞ্জুর ব্যক্তি জনপ্রিয়তা তুঙ্গে। তবে দলের অভ্যন্তরীণ বিভাজন কিছুটা ভাবাচ্ছে নেতাকর্মীদের। অন্যদিকে, জামায়াতে ইসলামী এখানে প্রার্থী করেছে মহানগর সেক্রেটারি শেখ জাহাঙ্গীর হুসাইন হেলালকে। মঞ্জু বনাম হেলাল—এই দ্বৈরথেই নির্ধারিত হবে এ আসনের ভবিষ্যৎ।
খুলনা-৩ (শিল্পাঞ্চল): শ্রমিক অধ্যুষিত এ আসনে বিএনপির প্রার্থী রকিবুল ইসলাম বকুল। দলে কোনো অভ্যন্তরীণ কোন্দল না থাকায় বেশ সুবিধাজনক অবস্থানে আছেন তিনি। জামায়াতে ইসলামীর প্রার্থী হিসেবে জোর প্রচারণা চালাচ্ছেন অধ্যাপক মাহফুজুর রহমান। এছাড়া ইসলামী আন্দোলনের নায়েবে আমির আব্দুল আউয়ালও মাঠে সক্রিয়। তরুণ ও সাধারণ ভোটারদের টানতে যার কৌশল যত নিখুঁত হবে, বিজয় তার ঘরেই যাবে।
খুলনা-৪ (রূপসা-দিঘলিয়া-তেরখাদা): এ আসনে বিএনপির প্রার্থী কেন্দ্রীয় নেতা আজিজুল বারী হেলাল। তিনি দীর্ঘ সময় ধরে এলাকায় নিয়মিত গণসংযোগ করছেন। জামায়াতে ইসলামীর প্রার্থী অধ্যক্ষ মাওলানা কবিরুল ইসলাম। তবে ইসলামি দলগুলোর মধ্যে সমঝোতা হলে ইসলামী আন্দোলনের মহাসচিব অধ্যক্ষ ইউনুস আহমাদের প্রার্থী হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে, যা ভোটের সমীকরণ বদলে দিতে পারে।
খুলনা-৫ (ডুমুরিয়া-ফুলতলা): জেলার সবচেয়ে জমজমাট লড়াইয়ের আভাস পাওয়া যাচ্ছে এই আসনে। এখানে মুখোমুখি দুই দলের দুই হেভিওয়েট প্রার্থী। জামায়াতে ইসলামীর সেক্রেটারি জেনারেল ও সাবেক এমপি মিয়া গোলাম পরওয়ারের শক্তিশালী ব্যক্তিগত ইমেজ ও সুসংগঠিত কর্মী বাহিনী রয়েছে। অন্যদিকে, দীর্ঘ ২৯ বছর পর এ আসনে দলীয় প্রার্থী দিয়েছে বিএনপি। সাবেক এমপি ও বিসিবির সাবেক সভাপতি আলী আসগর লবিকে ধানের শীষের প্রার্থী করায় উজ্জীবিত স্থানীয় বিএনপি। এখানেও হিন্দু ভোটার ও আওয়ামী লীগের ভোট ফ্যাক্টর হয়ে দাঁড়াবে।
খুলনা-৬ (কয়রা-পাইকগাছা): সুন্দরবন সংলগ্ন এ আসনে বিএনপির প্রার্থী মনিরুল হাসান বাপ্পী। সাংগঠনিকভাবে দক্ষ হলেও স্থানীয় রাজনীতিতে তার ‘বহিরাগত’ (বাড়ি রূপসায়) তকমা কিছুটা নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে। অন্যদিকে জামায়াতে ইসলামীর প্রার্থী মাওলানা আবুল কালাম আজাদ দীর্ঘদিনের পরিচিত মুখ হিসেবে সুবিধাজনক অবস্থানে আছেন।
অন্যান্য দলের তৎপরতা
প্রধান দুই দলের বাইরে ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশ, বাম গণতান্ত্রিক জোট, গণসংহতি আন্দোলন ও খেলাফত মজলিসের প্রার্থীরাও প্রচারণায় পিছিয়ে নেই। এছাড়া জাতীয় পার্টি (জাপা) ও এনসিপি ছয়টি আসনেই প্রার্থী দেওয়ার ঘোষণা দিয়েছে। দল দুটি শিগগিরই চূড়ান্ত প্রার্থী তালিকা প্রকাশ করবে বলে জানিয়েছে।
সব মিলিয়ে, শীতের তীব্রতা বাড়লেও খুলনার ভোটের মাঠ এখন জমজমাট। ভোটাররা এখন তাকিয়ে আছেন তপশিল ঘোষণা ও চূড়ান্ত লড়াইয়ের দিকে।










