Home Second Lead ‘ডার্ক ফ্লিট’ ও ক্রিপ্টোকারেন্সি: জাহাজ ভাঙার অন্ধকার অর্থনীতি

‘ডার্ক ফ্লিট’ ও ক্রিপ্টোকারেন্সি: জাহাজ ভাঙার অন্ধকার অর্থনীতি

পর্ব ৩:

সিরিজ প্রতিবেদন: মৃত্যুর সৈকতে বিষাক্ত জাহাজ

কামরুল ইসলাম, চট্টগ্রাম: সমুদ্রের বুকে এমন এক বিশাল জাহাজ বহর ঘুরে বেড়াচ্ছে যাদের কোনো বৈধ পরিচয় নেই, নেই কোনো স্বচ্ছ মালিকানা। বিশেষজ্ঞরা একে বলছেন ‘ডার্ক ফ্লিট’ বা ছায়া জাহাজ বহর। ২০২৫ সালের প্রতিবেদনে উঠে এসেছে এক চাঞ্চল্যকর তথ্য—আন্তর্জাতিক নিষেধাজ্ঞা এড়াতে এবং অবৈধ অর্থ লেনদেনের মাধ্যমে এই বিষাক্ত জাহাজগুলো এখন দক্ষিণ এশিয়ার সৈকতে এসে ভিড়ছে।
ছায়া জাহাজের রহস্যময় জগত
সারা বিশ্বে শত শত পুরোনো ট্যাংকার এখন ‘ডার্ক ফ্লিট’ হিসেবে কাজ করছে। এই জাহাজগুলো মূলত আন্তর্জাতিক নিষেধাজ্ঞা অমান্য করে তেল বা অন্যান্য পণ্য পরিবহন করে। যখন এগুলোর মেয়াদ শেষ হয়ে যায়, তখন কোনো নিয়ম-নীতির তোয়াক্কা না করেই এগুলোকে পাঠিয়ে দেওয়া হয় বাংলাদেশ বা ভারতের সৈকতে।
ধারণা করা হচ্ছে, এই ছায়া জাহাজ বহরের আকার যা ভাবা হয়েছিল, তার চেয়েও অনেক বড়।
লেনদেনে ক্রিপ্টো ও ক্যাশ: ধরাছোঁয়ার বাইরে মালিকরা
২০২৫ সালের তদন্তে দেখা গেছে, এই অন্ধকার বাণিজ্যে লেনদেনের ধরন বদলে গেছে। জাহাজ বিক্রির টাকা এখন আর সাধারণ ব্যাংকিং চ্যানেলে আসে না।
ক্যাশ ও ক্রিপ্টোকারেন্সি: নিষেধাজ্ঞা এড়াতে জাহাজের দাম মেটানো হচ্ছে নগদ অর্থ, ক্রিপ্টোকারেন্সি এবং বিদেশের বিভিন্ন মুদ্রার মাধ্যমে। এর ফলে আর্থিক গোয়েন্দা সংস্থাগুলো অর্থের উৎস বা জাহাজের প্রকৃত মালিককে আর শনাক্ত করতে পারছে না। এটি একটি সমান্তরাল ও অস্বচ্ছ অর্থনীতি তৈরি করছে যেখানে আইন ও নিরাপত্তা পুরোপুরি উপেক্ষিত।
বিষাক্ত বর্জ্যের চোরাচালান
এই অন্ধকার জাহাজগুলো কেবল লোহা নয়, বয়ে আনছে টন টন বিষাক্ত বর্জ্য। যেহেতু এগুলোর কোনো সঠিক নথিপত্র থাকে না, তাই জাহাজে থাকা ক্ষতিকর রাসায়নিক বা তেলের হিসাব কর্তৃপক্ষের কাছে থাকে না। ফলে কোনো সুরক্ষা ছাড়াই শ্রমিকরা এগুলো কাটতে গিয়ে বড় ধরণের দুর্ঘটনার শিকার হচ্ছেন।
দায় এড়ানোর কৌশল
ছায়া জাহাজের মালিকরা সাধারণত এমন দেশ বা সংস্থার আড়ালে থাকেন যাদের খুঁজে বের করা প্রায় অসম্ভব। এনজিও শিপব্রেকিং প্ল্যাটফর্ম সতর্ক করেছে যে, এই ‘ডার্ক ফ্লিট’ যদি নিয়ন্ত্রণে না আনা হয়, তবে পরিবেশগত সুরক্ষা এবং বর্জ্য নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থা কেবল কাগজে-কলমেই সীমাবদ্ধ থাকবে।
 স্বচ্ছতার দাবি ও বিকল্প ইয়ার্ড
সিনিয়র পলিসি অ্যাডভাইজার নিকোলা মুলিনারিস বলেন, “ডার্ক ফ্লিটসহ যে বিপুল পরিমাণ জাহাজ এখন ভাঙার অপেক্ষায় আছে, সেগুলোকে অবশ্যই স্বচ্ছ এবং নিয়ন্ত্রিত ড্রাইডক বা উন্নত ইয়ার্ডে ভাঙতে হবে। ইউরোপীয় ইউনিয়নে এমন সুবিধা থাকা সত্ত্বেও জাহাজ মালিকরা সস্তায় এবং গোপনে কাজ সারতে দক্ষিণ এশিয়াকে বেছে নিচ্ছেন।”
ক্রিপ্টোকারেন্সি আর ছদ্মনাম ব্যবহার করে চালানো এই জাহাজ বাণিজ্য কেবল একটি আর্থিক অপরাধ নয়, এটি পরিবেশ এবং মানুষের জীবনের বিরুদ্ধে এক ভয়াবহ ষড়যন্ত্র। এই অন্ধকার অর্থনীতি বন্ধ না হলে মৃত্যুফাঁদ আরও বিস্তৃত হবে।

পরবর্তী পর্বে থাকছে: ২০২৫ সালের ‘ওয়ার্স্ট ডাম্পার’ কারা? চীন, দক্ষিণ কোরিয়া এবং গ্রিসের প্রভাবশালী মালিকদের জাহাজ ডাম্পিংয়ের নেপথ্য কাহিনী।