Home Second Lead পতাকা বদলের খেলা: যেভাবে আইনের চোখ ফাঁকি দেয় বিষাক্ত জাহাজ

পতাকা বদলের খেলা: যেভাবে আইনের চোখ ফাঁকি দেয় বিষাক্ত জাহাজ

পর্ব ৫:

সিরিজ প্রতিবেদন: মৃত্যুর সৈকতে বিষাক্ত জাহাজ

কামরুল ইসলাম, চট্টগ্রাম: একটি জাহাজ সারাজীবন হয়তো ইউরোপের কোনো উন্নত দেশের পতাকা নিয়ে সমুদ্রে চলল, কিন্তু ঠিক জাহাজ ভাঙার কয়েক সপ্তাহ আগে তার পরিচয় বদলে গেল। রাতারাতি জাহাজটি হয়ে গেল সেন্ট কিটস অ্যান্ড নেভিস কিংবা পালাউ-এর। এই জাদুকরী পরিবর্তনের নামই হলো ‘ফ্ল্যাগ হপিং’ (Flag-hopping)। ২০২৫ সালের প্রতিবেদনে উঠে এসেছে, কীভাবে এই কৌশলে ইউরোপীয় ইউনিয়নের কঠোর আইনকে বুড়ো আঙুল দেখানো হচ্ছে।

 কেন এই পতাকা বদল?

ইউরোপীয় ইউনিয়নের (EU) নিয়ম অনুযায়ী, ইইউ-ভুক্ত দেশের পতাকা থাকা জাহাজগুলো কেবল ইইউ অনুমোদিত নিরাপদ ইয়ার্ডেই ভাঙতে হবে। কিন্তু দক্ষিণ এশিয়ার সৈকতে জাহাজ ভাঙলে মালিকরা অনেক বেশি টাকা পায়। এই বাড়তি মুনাফার লোভেই মালিকরা জাহাজ ভাঙার আগে ইইউ পতাকা নামিয়ে ‘ফ্ল্যাগ অফ কনভিনিয়েন্স’ (FOC) বা স্বল্প নিয়ন্ত্রিত দেশের পতাকা গ্রহণ করে।

 সিপিক এশিয়া (SEAPEAK ASIA): এক জলজ্যান্ত উদাহরণ

২০২৫ সালে চট্টগ্রামে দুর্ঘটনায় পড়া ‘সিপিক এশিয়া’ জাহাজের গতিবিধি লক্ষ্য করলে এই কারসাজি পরিষ্কার হয়:

সেপ্টেম্বর মাসে জাহাজটির পতাকা ছিল স্পেনের (ইইউ সদস্য)।

ডিসেম্বরে এটি রাতারাতি বদলে হয়ে যায় বাহামাসের পতাকা।

শেষ মুহূর্তে জাহাজটি সেন্ট কিটস অ্যান্ড নেভিসের পতাকা নিয়ে বাংলাদেশে প্রবেশ করে। এই ঘনঘন পরিবর্তনের একমাত্র উদ্দেশ্য ছিল ইইউ শিপ রিসাইক্লিং রেগুলেশনকে ফাঁকি দেওয়া।

শেল কোম্পানি ও অর্থপাচারের যোগসূত্র

ইউরোপীয় কমিশনের সাম্প্রতিক এক রিপোর্টে বলা হয়েছে, এই পতাকা বদলের খেলা কেবল পরিবেশ আইন ভাঙার জন্য নয়, এটি আর্থিক অপরাধের সাথেও যুক্ত।

ট্যাক্স ফাঁকি: ছদ্মনামী বা ‘শেল কোম্পানি’ ব্যবহার করে জাহাজের মালিকানা লুকিয়ে ফেলা হয়।

অবৈধ অর্থ: জাহাজ বিক্রির বাড়তি মুনাফা এমন সব দেশে পাচার করা হয় যেখানে কর দিতে হয় না। এমনকি এই অর্থ দিয়ে অবৈধ মাছ ধরা বা আন্তর্জাতিক নিষেধাজ্ঞা অমান্য করার মতো অপরাধের অর্থায়ন করা হয়।

 তুরস্কের সংকট: ইউরোপের বিকল্প কি নিরাপদ?

তুরস্ক হলো ইইউ-এর বাইরে একমাত্র জায়গা যেখানে ইইউ-পতাকাবাহী জাহাজ ভাঙার অনুমতি আছে। কিন্তু ২০২৫ সালে সেখানেও ভয়াবহ চিত্র দেখা গেছে:

আলিগা (Aliağa) নামক এলাকায় তিনটি প্রাণঘাতী দুর্ঘটনা ঘটেছে।

একটি ইয়ার্ডে ভয়াবহ আগুনে ৬০০০ টন তেলসহ জাহাজ পুড়েছে।

স্থানীয় কর্তৃপক্ষ ১৫ হাজার টন বিপজ্জনক বর্জ্যের অবৈধ ভাগাড় উদ্ধার করেছে। এর ফলে তুরস্কের ইয়ার্ডগুলোর ওপর থেকেও ইইউ অনুমোদন প্রত্যাহারের দাবি উঠেছে।

জবাবদিহিতার অভাব

জাহাজ মালিকরা জানেন যে একবার পতাকা বদলে ফেললে তাদের আর বিচারের আওতায় আনা কঠিন। সেন্ট কিটস অ্যান্ড নেভিস, কমোরোস বা পালাউ-এর মতো দেশগুলোর জাহাজ ভাঙার ক্ষেত্রে কোনো কঠোর তদারকি নেই। ফলে মালিকরা আইনের হাত থেকে বাঁচতে এই দেশগুলোকে ‘ঢাল’ হিসেবে ব্যবহার করছে।

পতাকা বদলের এই আন্তর্জাতিক লুকোচুরি বন্ধ না হলে কোনো আইনই দক্ষিণ এশিয়ার শ্রমিকদের জীবন রক্ষা করতে পারবে না। মালিকদের কেবল জাহাজের পতাকার ভিত্তিতে নয়, বরং তাদের মূল পরিচয়ের ভিত্তিতে জবাবদিহিতার আওতায় আনা জরুরি।