Home Third Lead বরেন্দ্রর বুকে শত শত ‘মরণকূপ’: সাজিদই কি শেষ বলি?

বরেন্দ্রর বুকে শত শত ‘মরণকূপ’: সাজিদই কি শেষ বলি?

সংগৃহীত ছবি

বিজনেসটুডে২৪ প্রতিনিধি, রাজশাহী:  তানোর উপজেলার কোয়েল গ্রামের দুই বছরের শিশু সাজিদের নিথর দেহ যখন ৩২ ঘণ্টা পর গভীর গর্ত থেকে তুলে আনা হলো, তখন ফায়ার সার্ভিসের কর্মীদের চোখেমুখে ছিল বিষাদ আর গ্রামজুড়ে শোকের মাতম। তবে এই মৃত্যুকে শুধুই ‘দুর্ঘটনা’ বলে মেনে নিতে নারাজ সচেতন মহল। স্থানীয়দের মতে, এটি স্পষ্টত ‘অবহেলাজনিত হত্যাকাণ্ড’—যার পেছনে রয়েছে বরেন্দ্র অঞ্চলে পানির ব্যবসার নামে চলা এক ভয়াবহ অরাজকতা।

ব্যর্থ কূপ: মালিকের লোকসান, শিশুর সমাধি
সাজিদের মৃত্যুর কারণ অনুসন্ধান করতে গিয়ে বেরিয়ে এসেছে লোমহর্ষক তথ্য। গ্রামের কৃষক কছির উদ্দিন গত বছর অধিক লাভের আশায় তিনটি গভীর নলকূপ খনন করেন। দুটিতে পানি মিললেও একটি ছিল ‘ব্যর্থ’ বা শুষ্ক। নিয়ম অনুযায়ী সিমেন্ট ও মাটি দিয়ে সেটি স্থায়ীভাবে ভরাট করার কথা থাকলেও, সামান্য কিছু টাকা বাঁচাতে তিনি খড় আর মাটি দিয়ে আলগাভাবে গর্তটি ঢেকে রাখেন। শিশু সাজিদ সেই আলগা মাটির ওপর পা রাখতেই তলিয়ে যায় গভীর অন্ধকারে। মালিকের কাছে যে ‘ব্যর্থ কূপ’ ছিল কেবল একটি আর্থিক লোকসান, সেটিই হয়ে উঠল একটি নিষ্পাপ শিশুর জীবন্ত সমাধি।

ছবি: এ আই

পানির ব্যবসা নাকি ‘তেলকূপ’ বাণিজ্য?
বরেন্দ্র অঞ্চলে গত তিন দশকে সরকারিভাবে প্রায় ১৬ হাজার গভীর নলকূপ বসানো হয়েছে। তবে এর বাইরে প্রভাবশালী ও বিনিয়োগকারীরা বসিয়েছেন আরও বিপুল সংখ্যক ব্যক্তিমালিকানাধীন নলকূপ। স্থানীয়রা এগুলোকে ডাকেন ‘তেলকূপ’ নামে। কারণ, একবার পানি উঠলেই তা তেলের খনির মতো লাভজনক। বর্তমানে ভূগর্ভস্থ পানির প্রায় ৭০ শতাংশই তুলছেন এই বেসরকারি মালিকরা।

সমস্যা হলো, পানির স্তর নিচে নেমে যাওয়ায় অনেক সময় প্রথম চেষ্টায় পানি পাওয়া যায় না। তখন ‘টেস্ট বোরিং’ বা পরীক্ষামূলক খনন শেষে ব্যর্থ গর্তগুলো উন্মুক্ত বা অরক্ষিত অবস্থায় ফেলে রেখে নতুন গর্ত খোঁড়া হয়। নাচোলে এক মানসিক রোগীর মৃত্যুর পর তানোরে শিশু সাজিদের মৃত্যু প্রমাণ করে, পুরো বরেন্দ্র অঞ্চলজুড়ে এমন শত শত অরক্ষিত মরণফাঁদ ছড়িয়ে আছে, যার কোনো তালিকা প্রশাসনের কাছে নেই।

আইনের ফাঁক ও বিশেষজ্ঞদের শঙ্কা
পানি আইনে ভূগর্ভস্থ পানি উত্তোলনে সরকারি অনুমতির বিধান থাকলেও, পরিত্যক্ত কূপ ভরাটের বিষয়ে স্পষ্ট কোনো বাধ্যবাধকতা বা শাস্তির বিধান নেই। এই আইনি ফাঁকফোকর দিয়েই পার পেয়ে যাচ্ছেন মুনাফালোভী পানি ব্যবসায়ীরা।

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, সরু পাইপের ভেতর থেকে মানুষ উদ্ধার করা বিশ্বের অন্যতম কঠিন কাজ। সমান্তরাল গর্ত খুঁড়ে সাজিদকে উদ্ধার করতে ফায়ার সার্ভিসের সময় লেগেছে প্রায় ৩২ ঘণ্টা। মাটির নিচের অক্সিজেন স্বল্পতা আর হিমশীতল পরিবেশে এত দীর্ঘ সময় কোনো শিশুর পক্ষে বেঁচে থাকা অসম্ভব।

প্রয়োজন ‘ওয়েল ক্লোজার সার্টিফিকেট’
এই মৃত্যুচক্র থামাতে হলে এখনই কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া জরুরি বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা। বিশেষজ্ঞদের পরামর্শ, নতুন নলকূপ খননের লাইসেন্স দেওয়ার আগে পুরোনো বা পরিত্যক্ত কূপ বৈজ্ঞানিক উপায়ে ভরাট করা হয়েছে কি না, তার প্রমাণ হিসেবে ‘ওয়েল ক্লোজার সার্টিফিকেট’ বাধ্যতামূলক করতে হবে। একইসঙ্গে সরকারি-বেসরকারি সব নলকূপের একটি পূর্ণাঙ্গ ম্যাপ তৈরি করে নজরদারির আওতায় আনতে হবে।

সাজিদকে বাঁচানো যায়নি। কিন্তু প্রশাসনের জবাবদিহিতা আর কঠোর নজরদারি নিশ্চিত না হলে, বরেন্দ্রর মাঠ-প্রান্তরে খেলতে যাওয়া পরবর্তী শিশুটিও যে নিরাপদ থাকবে—তার নিশ্চয়তা কে দেবে?