“মালিক-সম্পাদক”—শব্দবন্ধটি উচ্চারণ করলেই দেশের সংবাদপত্রের একটি করুণ ও বীভৎস ছবি চোখের সামনে ভেসে ওঠে। এটি এমন এক অদ্ভুত পদবী, যা সাংবাদিকতার পেশাদারিত্বের কফিনে শেষ পেরেকটি ঠুকে দেয়। আসলে এরা কে? এরা কি সাংবাদিক? নাকি সুবিধাবাদী ব্যবসায়ী?
সহজ উত্তর হলো, এরা ব্যবসায়ী, যারা নিজেদের স্বার্থসিদ্ধি এবং সমাজ ও রাষ্ট্রের চোখে ধুলো দেওয়ার জন্য ‘সম্পাদক’ নামক পবিত্র তকমাটি গায়ে জড়িয়েছেন। আসুন, তথাকথিত এই ‘মালিক-সম্পাদক’দের মুখোশ উন্মোচন করে তাদের আসল চেহারাটা দেখা যাক।
মালিক-সম্পাদকরা মূলত এমন এক শ্রেণী, যাদের সাংবাদিকতার সাথে দূরতম কোনো সম্পর্ক নেই। তাদের কোনো দিন মাঠপর্যায়ে সংবাদের পেছনে ছুটতে হয়নি, রোদে পুড়ে বৃষ্টিতে ভিজে রিপোর্টিং করতে হয়নি, কিংবা রাতের পর রাত জেগে টেবিল সাব-এডিটিং করার অভিজ্ঞতাও নেই। তারা স্রেফ টাকার জোরে পত্রিকার মালিক হয়েছেন এবং পরদিনই নিজেকে ‘সম্পাদক’ হিসেবে ঘোষণা করেছেন। এটি সাংবাদিকতার মতো একটি মহান পেশার চরম অবমাননা।
একজন চিকিৎসক হতে হলে যেমন এমবিবিএস পাস করতে হয়, আইনজীবী হতে হলে আইন পড়তে হয়, ঠিক তেমনি সম্পাদক হতে হলেও সাংবাদিকতার দীর্ঘ কণ্টকাকীর্ণ পথ পাড়ি দিতে হয়। কিন্তু মালিক-সম্পাদকরা এই স্বাভাবিক নিয়মকে বুড়ো আঙুল দেখিয়ে ক্ষমতার দাপটে সম্পাদকের আসনে জেঁকে বসেন।
এই শ্রেণীর মানুষেরা এতটাই দেউলিয়া যে, নিজেদের নামে কলাম বা সম্পাদকীয় প্রকাশ করার জন্যও তারা ভাড়াটে লেখক ব্যবহার করেন। পর্দার আড়ালে থাকা প্রকৃত পেশাদার সাংবাদিকরা তাদের হয়ে মাথার ঘাম পায়ে ফেলে লেখা তৈরি করেন, আর এই মালিকরা স্রেফ নিজের নাম বসিয়ে তা প্রকাশ করেন। আর তা কেবল অনৈতিক নয়, বরং এটি মেধাচুরি এবং এক ধরণের চরম জালিয়াতি। অথচ, যখন কোনো সরকারি বা বেসরকারি গুরুত্বপূর্ণ অনুষ্ঠানে তাদের ‘বিশিষ্ট সাংবাদিক’ বা ‘খ্যাতিমান সাংবাদিক’ হিসেবে আমন্ত্রণ জানানো হয়, তখন তারা লজ্জিত হওয়ার পরিবর্তে গর্ব অনুভব করেন।
একজন ব্যবসায়ী হিসেবে আমন্ত্রণ পাওয়া এবং একজন সাংবাদিক ব্যক্তিত্ব হিসেবে আমন্ত্রণ পাওয়ার মধ্যে যে মৌলিক তফাৎ রয়েছে, তা বোঝার মতো ন্যূনতম কাণ্ডজ্ঞানও তাদের নেই।
মালিক-সম্পাদকদের কারণে সংবাদপত্রের স্বাধীনতা ও বস্তুনিষ্ঠতা আজ চরম হুমকির মুখে। তাদের কাছে সংবাদপত্রের সম্পাদকীয় নীতি নির্ধারিত হয় তাদের নিজস্ব ব্যবসায়িক বা রাজনৈতিক স্বার্থের ওপর ভিত্তি করে। তারা সংবাদকে কেবল একটি পণ্য হিসেবে দেখেন এবং নিজেদের এজেন্ডা বাস্তবায়নের হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করেন।
ফলে, একজন প্রকৃত সম্পাদকের যে সাহসিকতা, সততা এবং জনস্বার্থের প্রতি দায়বদ্ধতা থাকা উচিত, তা এই মালিক-সম্পাদকদের কাছ থেকে আশা করা বৃথা। তারা সংবাদপত্রের সম্পাদক পদটিকে স্রেফ একটি অলংকার হিসেবে ব্যবহার করেন, যা তাদের সমাজে একটি আলাদা মর্যাদা এনে দেয়।
পরিশেষে, মালিক-সম্পাদক নামক এই অপসংস্কৃতিকে সমাজ ও রাষ্ট্র থেকে অবিলম্বে দূর করতে হবে। সংবাদপত্র মালিকানা এবং সম্পাদকীয় বিভাগ সম্পূর্ণ আলাদা থাকতে হবে। মালিক বিনিয়োগ করবেন, কিন্তু সংবাদের গতিপ্রকৃতি এবং সম্পাদকীয় নীতি নির্ধারিত হবে একজন জাত সাংবাদিকের হাতেই। যিনি নিজেকে সম্পাদক হিসেবে পরিচয় দিতে চান, তাকে অবশ্যই প্রমাণ করতে হবে যে, তার সাংবাদিকতার দীর্ঘ অভিজ্ঞতা এবং লেখনীর সক্ষমতা রয়েছে।
টাকার জোরে সম্পাদক হওয়ার এই তামাশা বন্ধ না হলে, আমাদের সাংবাদিকতা পেশাটি কখনোই তার হারানো গৌরব ফিরে পাবে না।