মিয়ানমারের সামরিক জান্তা শাসিত নির্বাচন কমিশন গত ২৮ ডিসেম্বর চিন রাজ্যে যে নির্বাচনের আয়োজন করেছে, তা আদতে গণতন্ত্রের চর্চা নয় বরং একটি ‘প্রতীকী মহড়া’ হিসেবে দৃশ্যমান হয়েছে। ২০২৫ সালের এই নির্বাচনটি জান্তা সরকারের জন্য এক বড় পরীক্ষা ছিল।
তবে ভোটের ফলাফল এবং সাধারণ মানুষের চরম অনীহা একটি ভিন্ন সত্যকে সামনে নিয়ে এসেছে। রাজ্যটির ওপর থেকে জান্তার প্রশাসনিক ও রাজনৈতিক নিয়ন্ত্রণ এখন যে খাদের কিনারায়, এই নির্বাচন তারই দালিলিক প্রমাণ।
জান্তা সরকার একে গণতান্ত্রিক উত্তরণ হিসেবে প্রচার করতে চাইলেও বাস্তব চিত্র ছিল ঠিক উল্টো। চিন রাজ্যের ৯টি উপজেলার মধ্যে কেবল হাখা এবং তেদিম—এই দুটি শহরে ভোট গ্রহণ সীমাবদ্ধ ছিল।
২০২০ সালের নির্বাচনে যেখানে পুরো চিন রাজ্য ভোটাধিকারে অংশ নিয়েছিল, সেখানে ২০২৫ সালে মাত্র দুটি জনপদে ভোট হওয়া প্রমাণ করে যে জান্তা তার শাসনতান্ত্রিক নিয়ন্ত্রণ হারিয়েছে। বাকি ৭টি উপজেলাকে জান্তা নিজেই অস্থিতিশীল এবং অনিরাপদ ঘোষণা করতে বাধ্য হয়েছে।
বিশ্লেষকদের মতে, এই নির্বাচন জান্তার ভৌগোলিক বিচ্ছিন্নতাকে বিশ্বদরবারে স্পষ্ট করে দিয়েছে।
এমনকি খোদ হাখা শহরে, যেখানে জান্তার শক্তিশালী অবস্থান থাকার কথা, সেখানেও নির্বাচন কমিশনের ঘাঁটিতে সশস্ত্র প্রতিরোধ বাহিনীর হামলা এবং পাল্টা বিমান হামলার ঘটনা ঘটেছে।
নির্বাচনের দিন হাখার উপকণ্ঠে জান্তার বিমান হামলা এবং কবরস্থান ধ্বংসের ঘটনা এটিই নিশ্চিত করে যে, তারা তথাকথিত ‘নিরাপদ’ এলাকাগুলোতেও শান্তি নিশ্চিত করতে পুরোপুরি ব্যর্থ।
ভোটের হার বিশ্লেষণ করলে এই নির্বাচনের বৈধতার সংকট আরও প্রকট হয়ে ওঠে। হাখা শহরে ২৭ হাজারের বেশি ভোটারের মধ্যে মাত্র ২,৮৩৬ জন ভোট দিয়েছেন। এই স্বল্প সংখ্যক ভোটারের একটি বড় অংশই হলো সামরিক বাহিনীর সদস্য ও তাদের পরিবার।
সাধারণ মানুষের এই ব্যাপক অনুপস্থিতি স্পষ্ট করে দেয় যে, চিন রাজ্যের জনগণ এই নির্বাচনকে প্রত্যাখ্যান করেছে।
প্রতিরোধ বাহিনীর ধর্মঘট সফল হওয়া এবং রাজপথে মানুষের উপস্থিতি না থাকা প্রমাণ করে যে, জান্তা সমর্থিত প্রার্থীদের কোনো নৈতিক ভিত্তি থাকছে না। ২০২০ সালের তুলনায় ২০২৫ সালের এই নির্বাচন ছিল এক বিশাল ধস।
১৪টি রাজনৈতিক দলের জায়গায় মাত্র ৪টি দলের অংশগ্রহণ এবং প্রধান স্থানীয় দলগুলোকে নিষিদ্ধ করা এই নির্বাচনকে একটি একতরফা নাটকে পরিণত করেছে।
চিন রাজ্যে ২০২৫-এর এই নির্বাচনী কার্যক্রম মূলত কাগজে-কলমে প্রশাসন টিকিয়ে রাখার একটি ব্যর্থ চেষ্টা মাত্র। এটি গণতন্ত্রের উত্তরণ তো নয়ই, বরং জান্তার সংকুচিত হয়ে আসা সীমানা এবং তাদের প্রতি গণঅসন্তোষের এক চরম প্রতিফলন।
জান্তা হয়তো ব্যালট বক্সে কিছু ভোট দেখাতে পেরেছে, কিন্তু চিন রাজ্যের জনগণের মন জয় করতে এবং হারানো ভূখণ্ড উদ্ধার করতে তারা পুরোপুরি ব্যর্থ।