Home অন্যান্য পেশাদারিত্বের সংকটে সংবাদপত্র: সম্পাদক পদটি কি কেবলই অলংকার?

পেশাদারিত্বের সংকটে সংবাদপত্র: সম্পাদক পদটি কি কেবলই অলংকার?

কামরুল ইসলাম

সংবাদপত্রের প্রাণভোমরা হলেন সম্পাদক। একটি সংবাদপত্রের নীতি নির্ধারণ, জনমত গঠন এবং সত্য অনুসন্ধানের যাত্রায় তিনি একাধারে চালক ও পথপ্রদর্শক। তবে বর্তমান সময়ে ‘সম্পাদক’ পদটির সংজ্ঞা ও মর্যাদা নিয়ে এক ধরনের ধোঁয়াশা তৈরি হয়েছে। মালিকানা সূত্রে পাওয়া পদবী আর মেধা ও অভিজ্ঞতার সিঁড়ি বেয়ে আসা পেশাদারিত্বের মধ্যে যে বিস্তর ফারাক, তা আজ আলোচনার দাবি রাখে।
একজন প্রকৃত সম্পাদক হলেন তিনি, যিনি তার জীবন অতিবাহিত করেছেন সংবাদের পেছনে ছুটে, টেবিল সাব-এডিটিং থেকে শুরু করে মাঠপর্যায়ের সাংবাদিকতায়। তিনি মধ্যমণি হয়ে ওঠেন তার ক্ষুরধার লেখনী এবং নৈতিক অবস্থানের কারণে। যখন তিনি কোনো রাষ্ট্রীয় বা আন্তর্জাতিক গুরুত্বপূর্ণ অনুষ্ঠানে আমন্ত্রিত হন, তখন সেই আমন্ত্রণ তাকে কোনো শিল্পপতি বা ব্যবসায়ী হিসেবে দেয়া হয় না; বরং তাকে দেয়া হয় একজন ‘সম্মানিত সাংবাদিক ব্যক্তিত্ব’ হিসেবে।
মালিক হিসেবে আমন্ত্রণ পাওয়া আর পেশাদার সম্পাদক হিসেবে আমন্ত্রণ পাওয়ার মধ্যে যে মৌলিক তফাৎ রয়েছে, তা অনেক ক্ষেত্রেই এখন ফিকে হয়ে আসছে। একজন ব্যবসায়ী যখন তার অন্যান্য প্রতিষ্ঠানের মতো একটি সংবাদপত্রের মালিক হন, তখন তিনি বিনিয়োগকারী বা প্রকাশক হিসেবে সম্মানিত হতে পারেন। কিন্তু সাংবাদিকতার দীর্ঘ কণ্টকাকীর্ণ পথ পাড়ি না দিয়ে কেবল পদের জোরে নিজেকে ‘বিশিষ্ট বা প্রখ্যাত সাংবাদিক’ হিসেবে পরিচয় দেওয়াটা পেশাদারিত্বের চরম অবমাননা।
পেশাদারিত্বের এই সংকটের আরেকটি অন্ধকার দিক হলো অন্যের মেধা চুরি। অনেক মালিক-সম্পাদক রয়েছেন যারা নিজের নামে কলাম, সম্পাদকীয় বা বিশেষ প্রতিবেদন প্রকাশ করেন, যা আসলে পর্দার আড়ালে থাকা বেতনভুক্ত পেশাদার লেখকদের সৃষ্টি। এই চর্চা কেবল অনৈতিক নয়, বরং এটি সাংবাদিকতার মৌলিক সংজ্ঞারই পরিপন্থী।
যিনি নিজে একটি প্রতিবেদন তৈরি বা সম্পাদনার সক্ষমতা রাখেন না, তিনি কেবল প্রচারের মোহে নিজেকে সম্পাদক হিসেবে দাবি করাটা এক ধরনের আত্মপ্রবঞ্চনা। ইতিহাস সাক্ষ্য দেয়, সংবাদপত্র জগতের কিংবদন্তি সম্পাদকরা কখনোই আকাশ থেকে পড়েননি। তারা ছিলেন সমাজের দর্পণ, যারা প্রতিটি শব্দের ওজন বুঝতেন।
বিশ্বের বিভিন্ন দেশের দিকে তাকালে দেখা যায়, পেশাদারিত্বকে সেখানে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। প্রতিবেশী দেশ ভারতের উদাহরণ এখানে অত্যন্ত প্রাসঙ্গিক। সেখানে রামনাথ গোয়েঙ্কা বা কুলদীপ নায়ারের মতো ব্যক্তিত্বরা সাংবাদিকতাকে একটি অনন্য উচ্চতায় নিয়ে গিয়েছিলেন।
ভারতে ‘এডিটরস গিল্ড’ অত্যন্ত শক্তিশালী একটি প্রতিষ্ঠান, যেখানে একজন পেশাদার সাংবাদিকের মানদণ্ড কঠোরভাবে বজায় রাখা হয়।
ব্রিটেনে ‘দ্য গার্ডিয়ান’ বা ‘দ্য টাইমস’ এর মতো পত্রিকাগুলোতেও মালিকপক্ষ এবং সম্পাদকীয় বিভাগের মধ্যে একটি অদৃশ্য কিন্তু অত্যন্ত মজবুত দেয়াল থাকে।
মালিক বিনিয়োগ করেন, কিন্তু সংবাদের গতিপ্রকৃতি এবং সম্পাদকীয় নীতি নির্ধারিত হয় একজন জাত সাংবাদিকের হাতেই। সেখানে মালিক নিজেকে সম্পাদক হিসেবে জাহির করার চেয়ে যোগ্য ব্যক্তিকে সেই আসনে বসানোকেই বেশি লাভজনক ও সম্মানজনক মনে করেন।
পরিশেষে বলা যায়, সম্পাদক পদটি কেবল একটি পদবী নয়, এটি একটি গুরুদায়িত্ব এবং দীর্ঘ সাধনার ফসল। মালিকানা সূত্রে কেউ পত্রিকার সর্বেসর্বা হতে পারেন, কিন্তু তিনি প্রকৃতপক্ষে সাংবাদিক নন। একজন সংবাদকর্মী হিসেবে যার জন্ম হয়নি, যার কলম সাধারণ মানুষের অধিকারের কথা বলতে গিয়ে কখনো কাঁপেনি, তিনি কোনোভাবেই সম্পাদকের আসনে বসার যোগ্য নন।
সাংবাদিকতা পেশাটিকে কলঙ্কমুক্ত রাখতে এবং সংবাদপত্রের হারানো গৌরব ফিরিয়ে আনতে ‘সম্পাদক’ পদটিকে কেবল পেশাদার সাংবাদিকদের জন্যই নির্দিষ্ট রাখা সময়ের দাবি।
businesstoday24.com এভাবে ফলো করা ও মন্তব্য করার অনুরোধ থাকবে।