ফরিদুল আলম, ঢাকা:ভারতীয় উপমহাদেশের ইতিহাসে সতীদাহ প্রথা একটি নির্মম অধ্যায়। মৃত স্বামীর চিতায় জীবন্ত অবস্থায় স্ত্রীকে তুলে দেওয়ার এই প্রথা শুধু নারীর সামাজিক অবস্থানকে প্রশ্নবিদ্ধ করেনি, বরং মানবতার মৌলিক মূল্যবোধকে গভীরভাবে ক্ষতবিক্ষত করেছে। সতীদাহের জন্ম ও বিস্তারের পেছনে ছিল বহুস্তরীয় কারণ। ধর্মীয় ব্যাখ্যা, সামাজিক কুসংস্কার, পুরুষতান্ত্রিক ক্ষমতার দম্ভ এবং নারীর জীবনের উপর পুরুষের নির্মম আধিপত্য—সব মিলিয়ে এক অন্ধকার যুগের অবতারণা করেছিল।
ঐতিহাসিকদের মতে, সতীদাহের শিকড় খুব প্রাচীন নয়; বরং মধ্যযুগের পর থেকে এটি অধিকতর প্রাতিষ্ঠানিক রূপ লাভ করে। কিছু পুরাণ ও ধর্মগ্রন্থের ভ্রান্ত ব্যাখ্যা এই প্রথার নৈতিক ভিত্তি হিসেবে ব্যবহার করা হয়েছিল।
স্বামীকে ‘দেবতুল্য’ এবং স্ত্রীকে ‘অধীন’ হিসেবে দেখানো সামাজিক দৃষ্টিভঙ্গি নারীর জীবনের মূল্যকে প্রায় শূন্যের কোঠায় নামিয়ে আনে। স্বামীর মৃত্যুর পর স্ত্রীকে ‘অশুভ’ বা ‘অপয়া’ হিসেবে গণ্য করার সংস্কার সতীদাহকে আরও উৎসাহিত করে। সমাজ বিশ্বাস করতে শুরু করে, একজন নারী যদি স্বামীর মৃত্যুর সঙ্গে সঙ্গে আগুনে পুড়ে ‘স্বেচ্ছায়’ মারা যায়, তবে তা পরিবার, বংশ এবং ধর্মের জন্য শুভকামনা বয়ে আনে।
তবে বাস্তবতা ছিল একেবারেই ভিন্ন। অধিকাংশ ক্ষেত্রে সতী হওয়া ছিল না নারীর স্বেচ্ছা সিদ্ধান্ত। চিতা ঘিরে দাঁড়ানো আত্মীয়স্বজন, গ্রামের মোড়ল, পুরোহিত এবং সমাজের চাপ নারীর শেষ ইচ্ছার ওপর কঠোর নিয়ন্ত্রণ আরোপ করত। জোর, ভয়, হুমকি এবং সামাজিক লাঞ্ছনার আতঙ্ক অনেক নারীকে জীবন্ত দগ্ধ হওয়ার দিকে ঠেলে দিত।
অনেক সময় নেশাজাতীয় দ্রব্য খাইয়ে বা অচেতন অবস্থায়ও নারীদের চিতায় তোলা হতো। এই দৃশ্যগুলো মানবিকতার প্রতি প্রশ্ন তোলে যে কতটা নিষ্ঠুর হলে এমন প্রথা একটি সমাজে গ্রহণযোগ্য হতে পারে।
এই প্রথার বিস্তারকে আরও ত্বরান্বিত করেছিল সামাজিক মর্যাদা ও ‘সম্মান’ রক্ষার অপসংস্কৃতি। জমিদার পরিবার কিংবা উচ্চবর্ণের সমাজে সতী হওয়ার ঘটনা কখনো কখনো ‘গৌরব’ হিসেবে দেখানো হতো। পরিবারের সম্মান রক্ষার নামে নারীর জীবনের কোন মূল্য ছিল না।
সামাজিক কাঠামো এমনভাবে তৈরি হয়েছিল যে বিধবা জীবনের অবমাননা, অপমান, অনাহার এবং নিঃসঙ্গতার ভয় নারীদের মৃত্যুর আগুনকে যেন তুলনামূলক নিরাপদ মনে করাত।
ধর্মীয় কুসংস্কারের শেকড়ে জন্ম নেওয়া সতীদাহ শুধু একটি প্রথা ছিল না, বরং ছিল নারীর স্বাধীনতা ও মানবাধিকারের ওপর নির্মম আঘাত। এই প্রথার মধ্য দিয়ে স্পষ্ট হয় যে একসময় সমাজ নারীর অস্তিত্বকে শুধুই পুরুষের ছায়া হিসেবে দেখত। স্বামীর মৃত্যু মানেই নারীর জীবনের অবসান—এমন ধারণা ছিল সেই সময়ের বাস্তবতা।
সতীদাহের সঙ্গে জড়িয়ে থাকা এই অন্ধকার ইতিহাস আমাদের মনে করিয়ে দেয় যে কুসংস্কারের নামে মানুষ কত নির্মম হতে পারে। কিন্তু ইতিহাস এখানে থেমে থাকেনি। সময়ের সঙ্গে সঙ্গে উঠে এসেছে প্রতিবাদী কণ্ঠ, মানবতাবাদী চিন্তা এবং আলোকিত মনের মানুষেরা, যারা সতীদাহ প্রথা বিলুপ্তির লড়াইয়ে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে।
পরবর্তী পর্বে আলোচনা হবে “আগুনের সামনে অসহায়রা – বিধবা নারীদের জীবনের অবর্ণনীয় ট্র্যাজেডি”।