Home অন্যান্য মরুভূমির বুক চিরে সালালাহ যাত্রা: মফিজুর রহমানের সেই বিশাল বাসভবন

মরুভূমির বুক চিরে সালালাহ যাত্রা: মফিজুর রহমানের সেই বিশাল বাসভবন

পর্ব ৪:

ওমান স্মৃতির দুই দশক: স্মৃতির ধুলো ঝেড়ে দেখা

কামরুল ইসলাম

মাস্কাটের আধুনিক জৌলুস আর সুলতান কাবুস গ্র্যান্ড মস্কের আধ্যাত্মিক আবহ পেছনে ফেলে আমাদের সাংবাদিক দলের পরবর্তী গন্তব্য ছিল ওমানের দক্ষিণের শহর সালালাহ। মাস্কাট থেকে সালালাহর দূরত্ব প্রায় এক হাজার কিলোমিটার। বিমানে যাওয়ার সুযোগ থাকলেও আমরা বেছে নিয়েছিলাম সড়কপথ। কারণ, একজন সাংবাদিকের চোখে ওমানকে পুরোপুরি দেখতে হলে এই দীর্ঘ মরু-যাত্রার কোনো বিকল্প নেই।
হাজার কিলোমিটারের সেই রোমাঞ্চকর বাস যাত্রা
আমরা যখন মাস্কাট থেকে ওমান ন্যাশনাল ট্রান্সপোর্ট কোম্পানির (ONTC) বাসে উঠলাম, তখন বিকেলের আলো ম্লান হয়ে আসছিল। ওমানের আন্তঃশহর বাসগুলো যেমন আধুনিক, তেমনি আরামদায়ক। সারারাত বাস চলল ধূসর মরুভূমির বুক চিরে। জানালার বাইরে তাকালে মনে হতো এক অন্তহীন শূন্যতা, যেখানে কেবল বালু আর মাঝে মাঝে ছোট ছোট পাহাড়। মাঝরাতে মরুভূমির কোনো এক বিরতিস্থলে যখন বাস থামল, তখন ওপরের আকাশের নক্ষত্ররাজির যে উজ্জ্বলতা দেখেছিলাম, তা আজও চোখে লেগে আছে। দীর্ঘ প্রায় ১২-১৩ ঘণ্টার সেই যাত্রায় আমরা ক্লান্তি ভুলে মেতেছিলাম সহকর্মী সাংবাদিকদের সাথে আড্ডায়।
ভোরে সালালাহ: যেখানে মরুভূমি শেষ, সবুজের শুরু
ভোরবেলা যখন আমাদের বাস সালালাহ শহরে প্রবেশ করল, তখন এক নিমিষেই দৃশ্যপট বদলে গেল। কোথায় সেই রুক্ষ মরুভূমি? চোখের সামনে ভেসে উঠল সারিবদ্ধ নারিকেল আর কলা বাগান। বাতাসে এক ধরনের সিক্ত আবেশ। ওমানের এই অঞ্চলটি ‘খরিফ’ বা বর্ষা মৌসুমের আশীর্বাদে সিক্ত। সালালাহ শহরটি দেখে মনে হলো, ওমানের বুকে এক টুকরো বাংলাদেশ যেন সযত্নে বসিয়ে দেওয়া হয়েছে।
মফিজুর রহমানের সেই বিশাল বাসভবন ও আতিথেয়তা
বাস থেকে নামার পর আমাদের সরাসরি নিয়ে যাওয়া হলো কুমিল্লার লাঙ্গলকোটের কৃতি সন্তান মফিজুর রহমানের বাসভবনে। সালালাহতে তিনি ছিলেন এক মহীরুহ। পদস্থ কর্মকর্তা হিসেবে একটি প্রতিষ্ঠানে কর্মরত থাকলেও তাঁর মূল পরিচয় ছিল সালালাহ প্রবাসী বাংলাদেশিদের পরম আশ্রয়স্থল হিসেবে। তাঁর বাসভবনটি ছিল বিশাল, যা দেখে প্রবাসে এক বাঙালির অভাবনীয় সাফল্যের চিত্র ফুটে উঠছিল। কিন্তু সেই বিশালত্বের চেয়েও বড় ছিল তাঁর হৃদয়।
মফিজুর রহমান কয়েক বছর আগে পরপারে পাড়ি জমিয়েছেন, কিন্তু তাঁর সেই আন্তরিক আপ্যায়ন ভোলার নয়। দীর্ঘ বাস ভ্রমণের ক্লান্তি মেটাতে তিনি নিজেই তদারকি করছিলেন আমাদের নাস্তা আর বিশ্রামের। সালালাহর যে কোনো প্রান্তে আমাদের যাওয়ার জন্য তাঁর পক্ষ থেকে সার্বক্ষণিক গাড়ির ব্যবস্থা ছিল। এমনকি সালালাহর বিখ্যাত জায়গাগুলো ঘুরে দেখানোর জন্য তিনি তাঁর ব্যস্ত সময়ের অনেকটা আমাদের পেছনে ব্যয় করেছিলেন। সেই বিশাল ড্রয়িংরুমে বসে সকালের নাস্তা করতে করতে আমরা শুনছিলাম প্রবাসীদের জীবন সংগ্রামের গল্প।
প্রবাসীদের ত্রাতা মফিজুর রহমান
কথায় কথায় জেনেছিলাম, সালালাহতে যে কোনো প্রবাসী বাংলাদেশি বিপদে পড়লে সবার আগে যাঁর নাম উচ্চারিত হতো, তিনি এই মফিজুর রহমান। প্রশাসনিক জটিলতা হোক কিংবা ব্যক্তিগত সমস্যা— বাংলাদেশিরা তাঁর কাছে ছুটে আসতেন আর তিনিও দুহাত বাড়িয়ে সাহায্য করতেন। সেই সফরে তিনি আমাদের শুধু ঘুরিয়েই দেখাননি, বরং প্রবাস জীবনের কঠিন বাস্তবতার অনেক না বলা গল্প শুনিয়েছিলেন। মফিজুর রহমানের সেই ড্রয়িংরুমে বসে আমরা পরিকল্পনা করছিলাম পরবর্তী গন্তব্যের।

পরবর্তী পর্বে থাকছে: পাথুরে পাহাড়ের রহস্য: নবী সালেহ (আ.)-এর উষ্ট্রী ও সেই অলৌকিক ফাটলের সন্ধানে।