নতুন আইনের আলোয় জীবন ও জীবিকা: অঙ্গ প্রতিস্থাপনের সাতকাহন
পর্ব-৩
বিজনেসটুডে২৪ প্রতিনিধি, ঢাকা: পরিবারে কিডনি রোগী আছে, আবার কিডনি দেওয়ার মতো সুস্থ স্বজনও প্রস্তুত। কিন্তু বাধ সাধলো রক্তের গ্রুপ কিংবা টিস্যু টাইপ। চিকিৎসাবিজ্ঞানের ভাষায় একে বলা হয় ‘মিসম্যাচ’। এতদিন এমন পরিস্থিতিতে চোখের জল ফেলা ছাড়া আর কোনো উপায় ছিল না। ডোনার থাকা সত্ত্বেও কেবল মিল না থাকায় হাজার হাজার রোগী মৃত্যুর কোলে ঢলে পড়তেন।
তবে ‘মানবদেহে অঙ্গ-প্রত্যঙ্গ সংযোজন অধ্যাদেশ, ২০২৫’-এর মাধ্যমে বাংলাদেশের চিকিৎসা ব্যবস্থায় যুক্ত হয়েছে এক যুগান্তকারী ধারণা—‘অসামঞ্জস্য জোড়া অঙ্গ-প্রত্যঙ্গ বিনিময়’ বা ‘সোয়াপ ট্রান্সপ্লান্ট’ । সহজ কথায়, এটি হলো অঙ্গের ‘অদলবদল’ পদ্ধতি।
সোয়াপ ট্রান্সপ্লান্ট বিষয়টি আসলে কী?
ধরুন, ‘ক’ নামের এক ব্যক্তির কিডনি প্রয়োজন। তার স্ত্রী তাকে কিডনি দিতে চান, কিন্তু তাদের রক্তের গ্রুপ মিলছে না।
অন্যদিকে, ‘খ’ নামের আরেক ব্যক্তিরও কিডনি প্রয়োজন। তার ভাই তাকে কিডনি দিতে চান, কিন্তু তাদেরও একই সমস্যা—গ্রুপ মিলছে না।
সোয়াপ ট্রান্সপ্লান্ট পদ্ধতিতে ডাক্তাররা পরীক্ষা করে দেখলেন, ‘ক’-এর স্ত্রীর কিডনি ‘খ’-এর শরীরের সাথে মিলে যায় এবং ‘খ’-এর ভাইয়ের কিডনি ‘ক’-এর শরীরের সাথে মিলে যায়।
তখন দুই পরিবারের সম্মতিতে ‘ক’-এর স্ত্রী কিডনি দেবেন ‘খ’-কে এবং ‘খ’-এর ভাই কিডনি দেবেন ‘ক’-কে। এভাবে দুটি কিডনি অদলবদল করে দুটি মানুষের জীবন বাঁচানো সম্ভব।
নতুন অধ্যাদেশের ২(২) ধারায় এই পদ্ধতিকে সংজ্ঞায়িত করা হয়েছে এবং ১৩ নং ধারায় এর আইনি বৈধতা ও রূপরেখা দেওয়া হয়েছে।
কেন এটি বৈপ্লবিক?
এতদিন বাংলাদেশে এই পদ্ধতির আইনি কোনো ভিত্তি ছিল না। ফলে বিচ্ছিন্নভাবে কেউ এটি করতে চাইলেও আইনি জটিলতার ভয়ে হাসপাতালগুলো পিছিয়ে যেত। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার তথ্যমতে, কিডনি প্রতিস্থাপনের ক্ষেত্রে প্রায় ৩০ শতাংশ ডোনার বাতিল হয়ে যান কেবল রক্তের গ্রুপ বা টিস্যু না মেলার কারণে। সোয়াপ ট্রান্সপ্লান্ট চালু হওয়ায় বাংলাদেশে এখন এই ৩০ শতাংশ ডোনারকে কাজে লাগানো সম্ভব হবে।
জাতীয় রেজিস্ট্রি ও ডাটাবেজ: সফলতার চাবিকাঠি
সোয়াপ ট্রান্সপ্লান্টের সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হলো সঠিক জুটি খুঁজে পাওয়া। একজন রোগী কীভাবে জানবেন যে অন্য কোন হাসপাতালে তার মতো আরেকজন ‘মিসম্যাচ’ রোগী আছেন?
এই সমস্যার সমাধানে অধ্যাদেশের ১৩(২) ও ১৭ নং ধারায় একটি ‘জাতীয় রেজিস্ট্রি’ বা কেন্দ্রীয় ডাটাবেজ তৈরির কথা বলা হয়েছে।
১. যখনই কোনো দাতা-গ্রহীতা জুটির (Pair) অঙ্গ মিলবে না, তাদের তথ্য এই ডাটাবেজে নথিবদ্ধ করা হবে।
২. সফটওয়্যারের মাধ্যমে স্বয়ংক্রিয়ভাবে খুঁজে বের করা হবে অন্য কোনো জুটির সাথে তাদের ক্রস-ম্যাচিং হয় কিনা।
৩. মিলে গেলে হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ বা জাতীয় কমিটি দুই পক্ষের সাথে যোগাযোগ করে সম্মতির ভিত্তিতে অপারেশনের ব্যবস্থা করবে।
চ্যালেঞ্জ ও সতর্কতা: একই সময়ে অপারেশন
সোয়াপ ট্রান্সপ্লান্টের ক্ষেত্রে সবচেয়ে বড় ঝুঁকির জায়গা হলো বিশ্বাস। যদি ‘ক’ পরিবার কিডনি দেওয়ার পর ‘খ’ পরিবার তাদের কিডনি দিতে অস্বীকৃতি জানায়?
এই ঝুঁকি এড়াতে আন্তর্জাতিক নিয়ম হলো—দুটি অপারেশন (মোট ৪টি সার্জারি: দুজন দাতা ও দুজন গ্রহীতা) একই সময়ে বা খুবই অল্প সময়ের ব্যবধানে সম্পন্ন করতে হয়। নতুন আইনেও ১৩(৩) ধারায় উল্লেখ করা হয়েছে যে, দাতা ও গ্রহীতার সম্মতি সাপেক্ষে অঙ্গ বিনিময় করতে হবে এবং হাসপাতালগুলোকে সেই সক্ষমতা নিশ্চিত করতে হবে।
শ্যামলীস্থ কিডনি হাসপাতালের একজন ট্রান্সপ্লান্ট সার্জন বলেন, “সোয়াপ ট্রান্সপ্লান্টের জন্য হাসপাতালের অবকাঠামোগত উন্নয়ন জরুরি। কারণ একসাথে চারটি অপারেশন থিয়েটার এবং দুটি দক্ষ সার্জিক্যাল টিমের প্রয়োজন হয়। তবে বড় সরকারি ও করপোরেট হাসপাতালগুলোতে এই সক্ষমতা এখনই আছে। আইনটি পাস হওয়ায় আমরা এখন রোগীদের নতুন আশা দেখাতে পারব।”
খরচ ও ব্যবস্থাপনা
রোগীদের মনে প্রশ্ন জাগতে পারে, এতে খরচ বাড়বে কি না? বিশেষজ্ঞদের মতে, খরচ কিছুটা বাড়লেও বিদেশ গিয়ে চিকিৎসার তুলনায় তা নগণ্য। তাছাড়া ডাটাবেজ মেইনটেইন ও সমন্বয়ের জন্য সরকার নির্দিষ্ট ফি নির্ধারণ করে দিলে দালালদের দৌরাত্ম্য কমানো সম্ভব হবে।
উপসংহার
‘আমার জিনিস তোমার, আর তোমার জিনিস আমার’, এই সহজ বিনিময়ের সূত্রেই এখন বাঁচবে হাজারো প্রাণ। ‘সোয়াপ ট্রান্সপ্লান্ট’ কেবল একটি চিকিৎসা পদ্ধতি নয়, এটি অপরিচিত দুটি পরিবারের মধ্যে তৈরি করবে এক অদৃশ্য জীবনের বন্ধন। ২০২৫ সালের এই অধ্যাদেশটি কার্যকর হলে বাংলাদেশে অঙ্গ প্রতিস্থাপনের ইতিহাসে এক নতুন সূর্যোদয় ঘটবে বলে আশা করছেন সবাই।









