পর্ব-৭
ওমান স্মৃতির দুই দশক: স্মৃতির ধুলো ঝেড়ে দেখা
কামরুল ইসলাম
সালালাহর সেই রহস্যময় পাহাড় আর উত্তাল মুগসায়েল সৈকত দেখার পর মফিজুর রহমান আমাদের নিয়ে চললেন শহরের প্রাণকেন্দ্র ‘আল হাফ্ফা’ (Al Haffa) এলাকার দিকে। ‘হাফ্ফা হাউস’ হোটেলের কাছেই সুলতানের প্রাসাদের খুব কাছে অবস্থিত ওমানের অন্যতম এক বিস্ময়— হযরত ইমরান (আ.)-এর রওজা শরীফ।
ওমানের এই প্রাচীন জনপদে পা রাখার পর থেকেই আমরা শুনছিলাম এক অলৌকিক দৈর্ঘ্যের কবরের কথা। সাংবাদিক হিসেবে আমাদের মনে কৌতূহল ছিল— কেন একটি কবর এতটা দীর্ঘ হয়?
১২ থেকে ৩৩ মিটারের সেই দীর্ঘ সমাধি
একটি ছিমছাম আধুনিক মসজিদ কমপ্লেক্সের ভেতরে প্রবেশ করতেই আমাদের চোখ ছানাবড়া! আমাদের সামনে এক অবিশ্বাস্য দীর্ঘ সমাধি। বিভিন্ন বর্ণনা মতে, এই রওজা শরীফটির দৈর্ঘ্য ১২ থেকে ৩৩ মিটারের (প্রায় ১০০ ফুট) মতো। সবুজ মখমলের চাদরে ঢাকা এই দীর্ঘ কাঠামোটি দেখে মনে হচ্ছিল আমরা যেন ইতিহাসের কোনো এক প্রাচীন অধ্যায়ের সামনে দাঁড়িয়ে আছি। এটি কেবল ওমানের নয়, বিশ্বের অন্যতম দীর্ঘতম কবর হিসেবে স্বীকৃত।
রওজা শরীফের পাশে দাঁড়িয়ে আমরা যখন এর দৈর্ঘ্য দেখছিলাম, তখন মনে কিছু প্রশ্ন জাগছিল যা স্থানীয়দের মাঝেও প্রচলিত।
দৈত্যাকৃতি শরীর নাকি অন্য কিছু? অনেকে বিশ্বাস করেন হযরত ইমরান (আ.) শারীরিকভাবে অত্যন্ত দীর্ঘকায় ছিলেন। কিন্তু সাংবাদিকের সূক্ষ্ম দৃষ্টিতে আমরা খেয়াল করলাম, রওজাটি দৈর্ঘ্যে যতটা লম্বা, প্রস্থে কিন্তু ততটা চওড়া নয়। যদি মানুষটি এতটা লম্বা হতেন, তবে তাঁর শরীরও চওড়া হওয়ার কথা।
সালালাহর অন্য দুই নবী হযরত আইয়ুব (আ.) ও হযরত সালেহ (আ.)-এর রওজাগুলোও কিন্তু এতটা চওড়া নয়।
পরিবার নাকি সম্মান? আরেকটি প্রচলিত মত হলো, হযরত ইমরান (আ.)-এর পুরো পরিবারকে এখানে মাথার দিক থেকে পায়ের দিক পর্যন্ত (Head to Toe) এক সারিতে দাফন করা হয়েছে, পাশাপাশি নয়।
আবার কেউ কেউ মনে করেন, কবরের সঠিক অবস্থান জানা না থাকায় সম্মান রক্ষার্থে পুরো এলাকাটিকেই সমাধি হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে। ‘রাফ গাইড টু ওমান’-এও এমন কিছু তত্ত্বের উল্লেখ আছে।
পরিচয় ও আধ্যাত্মিক আবহ
ইসলামী ও স্থানীয় বিশ্বাস অনুযায়ী, তিনি ছিলেন হযরত মরিয়ম (আ.)-এর পিতা এবং হযরত ঈসা (আ.)-এর নানা। পবিত্র কোরআনের ‘সূরা আল-ইমরান’ এই বংশের নামেই উৎসর্গ করা হয়েছে। রওজা শরীফের ভেতরের পরিবেশ ছিল পিনপতন নিস্তব্ধ এবং অত্যন্ত শান্ত। ২৪ ঘণ্টা খোলা এই পবিত্র স্থানটিতে কোনো প্রবেশমূল্য নেই, যে কেউ চাইলে সেখানে গিয়ে কিছুটা সময় নিভৃতে কাটাতে পারেন।
মফিজুর রহমান মৃদু স্বরে আমাদের বলছিলেন, সারা বিশ্ব থেকে মানুষ এখানে আসেন এই দীর্ঘ রওজাটি জিয়ারত করতে।
স্মৃতির ডায়েরিতে সেই দুপুর
সালালাহর সেই তপ্ত দুপুরে রওজা শরীফের ভেতরে এক অদ্ভুত শীতলতা বিরাজ করছিল। ধূপ আর আগরবাতির হালকা সুবাসে চারপাশটা যেন এক আধ্যাত্মিক ঘোরে আচ্ছন্ন। মফিজুর রহমানের সাথে সেই দীর্ঘ সমাধি দেখার পর আমাদের মনে হলো, ইতিহাস আর বিশ্বাসের মাঝখানে অনেক রহস্য থেকে যায় যা কেবল আল্লাহই ভালো জানেন।
রওজা শরীফ থেকে বের হওয়ার সময় আমাদের মনে এক ধরনের প্রশান্তি খেলা করছিল। সেই দুপুরে সালালাহর মাটিতে দাঁড়িয়ে আমরা খুঁজে পেয়েছিলাম এক আত্মিক শান্তি, যা আধুনিক ওমানের জৌলুসের চেয়েও অনেক বেশি শক্তিশালী।
পরবর্তী ও চূড়ান্ত পর্বে থাকছে: সালালাহ থেকে মাস্কাট হয়ে দুবাই-আবু ধাবিতে ট্রানজিট বিলাস এবং সেই রাজকীয় বিদায়।










