বিজনেসটুডে২৪ প্রতিনিধি, ঢাকা: সামুদ্রিক মাছের স্বাদ ও পুষ্টির আড়ালে লুকিয়ে থাকা ভারী ধাতুগুলো কেবল সাময়িক অসুস্থতা নয়, বরং শরীরের অভ্যন্তরীণ অঙ্গপ্রত্যঙ্গ স্থায়ীভাবে বিকল করে দেওয়ার ক্ষমতা রাখে। চট্টগ্রাম ও কক্সবাজারের মাছ নিয়ে করা সাম্প্রতিক গবেষণায় উঠে এসেছে ‘হাজার্ড ইনডেক্স’ বা স্বাস্থ্যঝুঁকি সূচকের এক ভয়াবহ চিত্র।
গবেষক মুহাম্মদ আনিসুর রহমান ও তার দলের বিশ্লেষণ অনুযায়ী, উপকূলীয় অঞ্চলের বেশ কিছু জনপ্রিয় মাছ নিয়মিত খেলে মানুষের লিভার, কিডনি এবং হৃদযন্ত্রের অপূরণীয় ক্ষতি হতে পারে।
বিপদসীমা ছাড়িয়েছে হাজার্ড ইনডেক্স: গবেষকরা স্বাস্থ্যের ঝুঁকি পরিমাপের জন্য ‘টার্গেট হাজার্ড কোশেন্ট’ এবং ‘হাজার্ড ইনডেক্স’ নামক দুটি বৈজ্ঞানিক সূচক ব্যবহার করেছেন। বিজ্ঞানের ভাষায়, এই সূচকগুলোর মান যদি ১-এর বেশি হয়, তবে সেই খাদ্য দীর্ঘমেয়াদে মানবদেহের জন্য অনিরাপদ।
গবেষণায় দেখা গেছে, চোক্কা, ইলিশ, রূপচাঁদা, টুনা, লইট্টা, ইন্ডিয়ান থ্রেডফিন এবং ম্যাকারেল—এই সাতটি প্রজাতির মাছের ক্ষেত্রে ঝুঁকির মান ১-এর অনেক উপরে। বিশেষ করে চোক্কা মাছের ক্ষেত্রে এই ঝুঁকির মাত্রা ছিল সবচেয়ে বেশি, যা ৩.২৫ পর্যন্ত পৌঁছেছে। এর অর্থ হলো, এই মাছগুলো থেকে মানবদেহে যে পরিমাণ বিষাক্ত ধাতু প্রবেশ করছে, তা শরীর সহ্য করার ক্ষমতার বাইরে।
মাছের মাধ্যমে শরীরে প্রবেশ করা সিসা ও ক্রোমিয়াম সরাসরি রক্তে মিশে শরীরের ছাঁকনি হিসেবে পরিচিত লিভার ও কিডনির ওপর চাপ সৃষ্টি করে। গবেষকদের মতে, সিসার উচ্চ উপস্থিতির কারণে উচ্চ রক্তচাপ এবং হৃদরোগের ঝুঁকি বেড়ে যায়। অন্যদিকে, ক্রোমিয়াম ও নিকেলের মতো ধাতুগুলো দীর্ঘ সময় ধরে শরীরে জমতে থাকলে তা কোষের স্বাভাবিক গঠন নষ্ট করে দেয়।
এর ফলে শরীরের রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা কমে যাওয়া থেকে শুরু করে স্নায়বিক দুর্বলতাও দেখা দিতে পারে। বিশেষ করে গর্ভবতী নারী ও শিশুদের ক্ষেত্রে এই ধাতব বিষক্রিয়া আরও বেশি মারাত্মক হতে পারে বলে গবেষণায় সতর্ক করা হয়েছে।
ক্যান্সারের হাতছানি
গবেষণার সবচেয়ে উদ্বেগজনক অংশটি হলো ক্যান্সারের ঝুঁকি বা ‘টার্গেট ক্যান্সার রিস্ক’ বিশ্লেষণ। গবেষণাগারে প্রাপ্ত তথ্য উপাত্ত বিশ্লেষণ করে গবেষক দলটি জানিয়েছেন যে, ইলিশ, রূপচাঁদা, টুনা এবং চোক্কা মাছের নমুনায় ক্রোমিয়ামের কারণে ক্যান্সারের ঝুঁকি সহনীয় মাত্রার চেয়ে বেশি।
বৈজ্ঞানিক মানদণ্ড অনুযায়ী যে মাত্রাকে গ্রহণযোগ্য বলা হয়, এই মাছগুলোতে প্রাপ্ত ধাতুর পরিমাণ সেই সীমা অতিক্রম করেছে। এর ফলে যারা নিয়মিত এই মাছগুলো খাদ্যতালিকায় রাখেন, তাদের দীর্ঘমেয়াদে মরণব্যাধি ক্যান্সারে আক্রান্ত হওয়ার সম্ভাবনা তৈরি হচ্ছে।
গবেষণার গণ্ডি ও বাস্তবতা
২০২৬ সালের শুরুতে প্রকাশিত এই গবেষণায় গবেষকরা স্পষ্টভাবে দেখিয়েছেন যে, সামুদ্রিক মাছের প্রোটিন এখন আর পুরোপুরি নিরাপদ নেই। চট্টগ্রামের ল্যাবে করা এই পরীক্ষায় ১২টি প্রজাতির মাছের মধ্যে সাতটি প্রজাতিতেই অ-ক্যান্সারজনিত স্বাস্থ্যঝুঁকি এবং চারটিতে ক্যান্সারের উচ্চ ঝুঁকি শনাক্ত হয়েছে।
গবেষকরা জানিয়েছেন যে, উপকূলীয় অঞ্চলের সাধারণ মানুষ যারা প্রতিদিনের প্রোটিনের জন্য এসব মাছের ওপর নির্ভরশীল, তারা অজান্তেই এক বড় ধরনের স্বাস্থ্য সংকটের দিকে ধাবিত হচ্ছেন।
আগামী পর্বে পড়ুন:সমুদ্র দূষণের নেপথ্যে—কোথা থেকে আসছে এই মরণঘাতী ধাতু এবং এর সমাধানে বিশেষজ্ঞদের পরামর্শ কী।