বিজনেসটুডে২৪ প্রতিনিধি, মিরসরাই: বর্ষীয়ান রাজনীতিক, বীর মুক্তিযোদ্ধা এবং সাবেক গৃহায়ণ ও গণপূর্ত মন্ত্রী ইঞ্জিনিয়ার মোশাররফ হোসেন আর নেই। বুধবার (১৩ মে) সকাল ১০টায় রাজধানীর একটি বেসরকারি হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় তিনি শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন (ইন্না লিল্লাহি ওয়া ইন্না ইলাইহি রাজিউন)। মৃত্যুকালে তার বয়স হয়েছিল ৮৩ বছর। দীর্ঘদিন ধরে তিনি বার্ধক্যজনিত বিভিন্ন শারীরিক জটিলতায় ভুগছিলেন।
ইঞ্জিনিয়ার মোশাররফ হোসেনের বর্ণাঢ্য রাজনৈতিক জীবন ছিল চট্টগ্রামের মিরসরাই কেন্দ্রিক। তিনি চট্টগ্রাম-১ আসন থেকে মোট সাতবার সংসদ সদস্য নির্বাচিত হয়েছেন। নিষিদ্ধ ঘোষিত আওয়ামী লীগ সরকারের দীর্ঘ শাসনামলে তিনি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ গৃহায়ণ ও গণপূর্ত এবং বেসামরিক বিমান পরিবহন ও পর্যটন মন্ত্রণালয়ের মন্ত্রী হিসেবে সফলতার সাথে দায়িত্ব পালন করেছেন। দলের নীতিনির্ধারণী ফোরাম তথা আওয়ামী লীগের প্রেসিডিয়াম সদস্য হিসেবেও তিনি দীর্ঘ সময় কাণ্ডারির ভূমিকা পালন করেন।
রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পরবর্তী সময়ে ২০২৪ সালের অক্টোবর মাসে তিনি গ্রেপ্তার হয়েছিলেন। ২০২৫ সালের আগস্টে কারাবন্দি থাকাকালীন তার শারীরিক অবস্থার মারাত্মক অবনতি ঘটলে তাকে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়ে (বিএসএমএমইউ) ভর্তি করা হয়। পরবর্তীতে শারীরিক অবস্থা এবং মানবিক বিবেচনায় আদালত তাকে জামিনে মুক্তি প্রদান করেন। এরপর থেকে তিনি রাজধানীর একটি বেসরকারি হাসপাতালে নিবিড় পর্যবেক্ষণে ছিলেন।
মরহুমের পারিবারিক সূত্র নিশ্চিত করেছে যে, ১৪ মে (বৃহস্পতিবার) বাদ জোহর মিরসরাইয়ের ধুম ইউনিয়নের এস রহমান কলেজ প্রাঙ্গণে তার নামাজে জানাজা অনুষ্ঠিত হবে। জানাজা শেষে তাকে পারিবারিক কবরস্থানে দাফন করার কথা রয়েছে। তার মৃত্যুতে চট্টগ্রামের রাজনৈতিক ও সামাজিক অঙ্গনে গভীর শোকের ছায়া নেমে এসেছে।
ইঞ্জিনিয়ার মোশাররফ হোসেনের রাজনৈতিক ও ব্যক্তিগত জীবন ছিল ঘটনাবহুল। ১৯৪৩ সালে চট্টগ্রামের মিরসরাইয়ের ধুম গ্রামে এক সম্ভ্রান্ত মুসলিম পরিবারে তার জন্ম। তার বাবা এস রহমান ছিলেন তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তানের একজন প্রতিষ্ঠিত ব্যবসায়ী এবং বিশিষ্ট ব্যক্তি।
শিক্ষাজীবনে তিনি লাহোর থেকে মাইনিং ইঞ্জিনিয়ারিংয়ে উচ্চতর ডিগ্রি অর্জন করেন। প্রবাসে থাকাকালীনই তিনি ছাত্র রাজনীতিতে জড়িয়ে পড়েন। এরপর দেশে ফিরে পুরোদমে রাজনীতিতে যোগ দেন এবং ১৯৭০ সালের ঐতিহাসিক নির্বাচনে তৎকালীন মিরসরাই আসন থেকে প্রাদেশিক পরিষদের সদস্য নির্বাচিত হন।
১৯৭১ সালে বাংলাদেশের মহান মুক্তিযুদ্ধে তার অবদান অবিস্মরণীয়। চট্টগ্রামের প্রবেশপথ হিসেবে পরিচিত মিরসরাইয়ে প্রতিরোধ গড়ে তুলতে তিনি অসামান্য বীরত্ব প্রদর্শন করেন। যুদ্ধের শুরুতে তিনি শুভপুর ব্রিজ ধ্বংস করার সাহসী অভিযানে নেতৃত্ব দেন, যা পাকিস্তানি বাহিনীর যাতায়াত ও রসদ সরবরাহে বড় বাধা সৃষ্টি করেছিল।
স্বাধীনতার পর ১৯৭৩, ১৯৮৬, ১৯৯৬, ২০০৮, ২০১৪ ও ২০১৮ সালের নির্বাচনে তিনি সংসদ সদস্য হিসেবে জয়লাভ করেন। ১৯৯৬ সালে শেখ হাসিনার প্রথম সরকারে তিনি অত্যন্ত দক্ষতা ও সততার সাথে বেসামরিক বিমান পরিবহন ও পর্যটন এবং গৃহায়ণ ও গণপূর্ত মন্ত্রণালয়ের দায়িত্ব পালন করেন। ২০০৮ সালের নির্বাচনে জয়ের পর দ্বিতীয় দফায় তিনি গণপূর্ত মন্ত্রণালয়ের দায়িত্ব পান। চট্টগ্রামের মেগা প্রজেক্টগুলো বাস্তবায়ন এবং আধুনিক মিরসরাইয়ের রূপকার হিসেবে তাকে গণ্য করা হয়।
ব্যক্তিগত জীবনে তিনি অত্যন্ত অমায়িক এবং কর্মীসুলভ নেতা হিসেবে পরিচিত ছিলেন। চট্টগ্রামের উন্নয়ন ও অবকাঠামোগত পরিবর্তনে তার দীর্ঘ অভিজ্ঞতা ও প্রজ্ঞা গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছে।










