আটলান্টিক মহাসাগরের বুকে অবস্থিত ক্ষুদ্র এক দ্বীপরাষ্ট্র বারমুডা। প্রায় ৩ কোটি বছর আগে এখানকার আগ্নেয়গিরির অগ্নুৎপাত বন্ধ হয়ে গেলেও দ্বীপটি কেন এখনো সমুদ্রপৃষ্ঠ থেকে বেশ উঁচুতে অবস্থান করছে, তা নিয়ে বিজ্ঞানীদের মধ্যে দীর্ঘকাল ধরে এক রহস্য দানা বেঁধে ছিল। অবশেষে কার্নেগি ইনস্টিটিউশন অফ ওয়াশিংটন এবং ইয়েল ইউনিভার্সিটির একদল গবেষক এই রহস্যের সমাধান করেছেন।
গবেষকরা বারমুডার নিচে একটি বিশাল এবং গোপন শিলাস্তরের সন্ধান পেয়েছেন যা প্রাগৈতিহাসিক কাল থেকে দ্বীপটিকে ভাসিয়ে রেখেছে। সাধারণত এ ধরণের দ্বীপগুলোকে টিকে থাকতে হলে নিয়মিত আগ্নেয়গিরির তাপের প্রয়োজন হয়। কিন্তু বারমুডার ক্ষেত্রে ভিন্ন কিছু ঘটছে। দ্বীপটির ভূত্বকের ঠিক নিচে প্রায় ১২ মাইল পুরু একটি শিলাস্তর বা ‘স্ল্যাব’ আবিষ্কৃত হয়েছে যা পার্শ্ববর্তী অন্য শিলার চেয়ে অনেক হালকা। ফলে এটি অনেকটা দানবীয় এক ভেলা বা ‘র্যাফট’-এর মতো কাজ করছে এবং পুরো অঞ্চলটিকে ওপরের দিকে ঠেলে রাখছে।
গবেষণার মূল তথ্যসমূহ:
১. গবেষক উইলিয়াম ফ্রেজার এবং জেফরি পার্ক জানিয়েছেন যে, এই বিশাল শিলাস্তরটি ম্যানহাটন দ্বীপের সমান দীর্ঘ।
২. নতুন করে ড্রিলিং বা খনন না করেই দ্বীপে অবস্থিত একটি সিসমিক স্টেশনের গত ২০ বছরের ভূমিকম্পের কম্পন বিশ্লেষণ করে এই তথ্য পাওয়া গেছে।
৩. বিজ্ঞানীরা লক্ষ্য করেছেন যে, ভূমিকম্পের তরঙ্গ যখন বিভিন্ন শিলাস্তরের মধ্য দিয়ে যায়, তখন এর গতি ও ধরণ পরিবর্তিত হয়। এই সংকেতগুলো বিশ্লেষণ করে ভূ-পৃষ্ঠের ২৫ মাইল গভীর পর্যন্ত মানচিত্র তৈরি করা সম্ভব হয়েছে।
৪. এই বিশেষ শিলাস্তরটি সাধারণ ম্যান্টল শিলার তুলনায় ১.৫ শতাংশ কম ঘন। এই সামান্য ঘনত্বের পার্থক্যের কারণেই দ্বীপটি স্বাভাবিক সমুদ্রপৃষ্ঠ থেকে ১,৩০০ থেকে ২,০০০ ফুট উঁচুতে অবস্থান করছে।
বিজ্ঞানীদের মতে, প্রায় ৩ থেকে ৩.৫ কোটি বছর আগে পৃথিবীর গভীর থেকে গলিত লাভা ওপরে উঠে এসে জমাট বাঁধার মাধ্যমে এই হালকা স্তরের সৃষ্টি হয়েছিল।
বারমুডার অন্যান্য বিচিত্র বৈশিষ্ট্য:
এই গবেষণায় বারমুডা অঞ্চলের আরও কিছু রহস্যময় বিষয়ের ব্যাখ্যা পাওয়া গেছে। এই এলাকায় মাধ্যাকর্ষণ শক্তির টান কিছুটা কম, যাকে বিজ্ঞানীরা ‘গ্র্যাভিটেশনাল অ্যানোমালি’ বলছেন। হালকা শিলার উপস্থিতির কারণে এখানকার সমুদ্রপৃষ্ঠে একটি সামান্য উঁচু ভাব বা ‘বাম্প’ লক্ষ্য করা যায়।
এছাড়া এখানে শক্তিশালী চৌম্বকীয় সংকেত বা ‘ম্যাগনেটিক অ্যানোমালি’ দেখা যায় যা কম্পাস বা নেভিগেশন সরঞ্জামকে প্রভাবিত করতে পারে। বিজ্ঞানীরা জানিয়েছেন, এটি সম্পূর্ণ প্রাকৃতিক এবং প্রাচীন আগ্নেয় শিলা থেকে আসা আয়রন ও টাইটানিয়ামের কারণে এমনটি ঘটে।
এই আবিষ্কার প্রমাণ করে যে, সক্রিয় আগ্নেয়গিরি ছাড়াও প্রাচীন আগ্নেয় অবশিষ্টাংশ কোনো দ্বীপকে লাখ লাখ বছর ধরে সমুদ্রের বুকে টিকিয়ে রাখতে পারে।
আমাদের আপডেট পেতে businesstoday24.com ফলো করুন এবং আপনার মন্তব্য জানান।