Home আন্তর্জাতিক কানাডায় সংবাদপত্র শিল্পে মহাবিপর্যয়, আঞ্চলিক পত্রিকা বিলুপ্ত

কানাডায় সংবাদপত্র শিল্পে মহাবিপর্যয়, আঞ্চলিক পত্রিকা বিলুপ্ত

স্থানীয় সংবাদপত্রের পরিবর্তে সরাসরি গুগল বা ইউটিউবে বিজ্ঞাপন 
ফরিদুল আলম
উত্তর আমেরিকার উন্নত দেশ কানাডায় ঐতিহ্যবাহী সংবাদপত্র শিল্প এখন এক নজিরবিহীন অস্তিত্ব সংকটের মুখোমুখি। গত ৫ থেকে ৭ বছরের পরিসংখ্যান বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, দেশটিতে মুদ্রিত সংবাদপত্রের সার্কুলেশন বা প্রচারসংখ্যা নাটকীয়ভাবে ৩০% থেকে ৪০% হ্রাস পেয়েছে।
বিশেষ করে কানাডার মফস্বল এবং ছোট শহরগুলোতে স্থানীয় সংবাদপত্রগুলো এখন প্রায় বিলুপ্তির পথে, যা দেশটিতে এক নতুন ধরনের ‘নিউজ পোভার্টি’ বা সংবাদের দারিদ্র্য তৈরি করছে।
পরিসংখ্যানে পতনের চিত্র
কানাডার স্ট্যাটিস্টিকস বিভাগ এবং লোকাল নিউজ রিসার্চ প্রজেক্টের ২০২৪-২৬ সালের তথ্য অনুযায়ী:
  • রাজস্বে ধস: ২০২২ থেকে ২০২৪ সালের মধ্যেই সংবাদপত্র প্রকাশকদের অপারেটিং রাজস্ব ১৭.৯% কমে ১.৬ বিলিয়ন ডলারে নেমেছে।
  • বিজ্ঞাপনের পতন: এক সময়ের আয়ের মূল উৎস প্রিন্ট বিজ্ঞাপন গত দুই বছরে প্রায় ৩৪.৩% হ্রাস পেয়েছে।
  • বন্ধের হিড়িক: ২০০৮ থেকে ২০২৫ সালের অক্টোবর পর্যন্ত কানাডার ৩৮৮টি কমিউনিটি থেকে ৬০৩টি স্থানীয় সংবাদ মাধ্যম স্থায়ীভাবে বন্ধ হয়ে গেছে। এর মধ্যে ৪৪০টিই ছিল ছোট শহরের কমিউনিটি সংবাদপত্র।
‘নিউজ ডেজার্ট’ বা সংবাদহীন মরুভূমি
কানাডার গ্রামীণ ও মফস্বল এলাকাগুলো এখন দ্রুত ‘নিউজ ডেজার্ট’-এ পরিণত হচ্ছে। অর্থাৎ এমন অনেক এলাকা তৈরি হয়েছে যেখানে পেশাদার কোনো সাংবাদিক নেই এবং স্থানীয় খবর জানানোর মতো কোনো মুদ্রিত কাগজ অবশিষ্ট নেই।
বিশেষজ্ঞ মতামত:
স্থানীয় সংবাদ বিশ্লেষকদের মতে, “যখন একটি ছোট শহরের সংবাদপত্র বন্ধ হয়ে যায়, তখন সেই এলাকার মানুষের গণতান্ত্রিক অধিকার ক্ষুণ্ণ হয়। মেয়রের অফিসের খবর বা স্থানীয় স্কুলের কোনো ঘটনা জানার আর কোনো নির্ভরযোগ্য মাধ্যম থাকে না।”
সংকটের নেপথ্যে: টেক জায়ান্টদের সাথে লড়াই
কানাডার এই সংকটের একটি বড় কারণ হলো সরকারের ‘অনলাইন নিউজ অ্যাক্ট’ (Bill C-18) নিয়ে মেটা (ফেসবুক ও ইনস্টাগ্রাম) এবং গুগলের সাথে সংঘাত।
মেটার নিষেধাজ্ঞা: ফেসবুক কানাডায় সংবাদ শেয়ারিং বন্ধ করে দেওয়ায় ছোট পত্রিকাগুলো তাদের পাঠকদের কাছে পৌঁছানোর প্রধান ডিজিটাল পথটি হারিয়েছে।
বিজ্ঞাপন স্থানান্তর: বড় বিজ্ঞাপনদাতারা এখন আর স্থানীয় সংবাদপত্রে বিনিয়োগ না করে সরাসরি গুগল বা ইউটিউবে বিজ্ঞাপন দিচ্ছে।
পোস্টমিডিয়া ও বড় হাউজগুলোর অবস্থা
কানাডার বৃহত্তম সংবাদপত্র চেইন ‘পোস্টমিডিয়া’ (Postmedia) ২০২৬ সালের শুরুতেই তাদের সার্কুলেশন রাজস্বে বড় ধরনের ঘাটতির কথা জানিয়েছে। খরচ কমাতে অনেক বড় দৈনিক এখন সপ্তাহে সাত দিনের বদলে মাত্র কয়েকদিন কাগজ ছাপছে এবং অনেক ক্ষেত্রে ডিজিটাল-অনলি মডেলে চলে যাচ্ছে।
বাসি খবর ও সময়ের বিবর্তন
কানাডার আধুনিক পাঠকদের চরিত্রও আমূল বদলে গেছে। ২০২৬ সালে দাঁড়িয়ে দ্রুতগতির স্মার্টফোন এবং ৪জি/৫জি প্রযুক্তির সহজলভ্যতায় মানুষ এখন সেকেন্ডের খবর সেকেন্ডে পেতে চায়। ফলে মফস্বল এলাকার পাঠকদের কাছে পরদিন সকালে আসা মুদ্রিত কাগজটি এখন কেবল ‘বাসি খবর’ ছাড়া আর কিছুই নয়। সময়ের এই অভাব এবং তাৎক্ষণিক তথ্যের আকাঙ্ক্ষা সংবাদপত্রকে যাদুঘরের পণ্যে পরিণত করছে।
ভবিষ্যৎ পূর্বাভাস
বিশেষজ্ঞদের ধারণা, আগামী কয়েক বছরে কানাডায় মুদ্রিত সংবাদপত্র কেবল বড় শহরগুলোর একটি ‘নিউজ লেটার’ বা শৌখিন ম্যাগাজিন হিসেবে টিকে থাকবে। ছোট শহরগুলোতে সংবাদপত্রের যে গৌরবময় অধ্যায় ছিল, তা হয়তো চিরতরে ডিজিটাল পর্দার আড়ালে হারিয়ে যাবে।
বিভিন্ন অডিট রিপোর্ট এবং মিডিয়া অ্যানালাইসিস অনুযায়ী কানাডার প্রধান কয়েকটি দৈনিকের কয়েক বছর আগে ও বর্তমানের একটি তুলনামূলক পরিসংখ্যান নিচে দেওয়া হলো:

কানাডার প্রধান দৈনিকগুলোর সার্কুলেশন চিত্র (আনুমানিক)
সংবাদপত্রের নাম
সার্কুলেশন (৫-৭ বছর আগে)
বর্তমান সার্কুলেশন (২০২৫-২৬ আনুমানিক)
পরিবর্তনের হার (হ্রাস)
দ্য গ্লোব অ্যান্ড মেইল
প্রায় ২,৯০,০০০ – ৩,১০,০০০ কপি
১,৩০,০০০ – ১,৫০,০০০ কপি
প্রায় ৫০-৫৫%
টরন্টো স্টার
প্রায় ২,৫০,০০০ – ২,৮০,০০০ কপি
১,১০,০০০ – ১,২০,০০০ কপি
প্রায় ৬০%
দ্য ন্যাশনাল পোস্ট
প্রায় ১,৩০,০০০ – ১,৫০,০০০ কপি
৫০,০০০ – ৬০,০০০ কপি
প্রায় ৬০-৬৫%
লা প্রেস (মন্ট্রিয়ল)
প্রায় ২,১০,০০০ (প্রিন্ট থাকাকালীন)
০ (পূর্ণাঙ্গ ডিজিটাল)
১০০% (প্রিন্ট বন্ধ)

পরিসংখ্যানের বিশেষ বিশ্লেষণ:
লা প্রেস-এর রূপান্তর: কানাডার প্রভাবশালী ফরাসি ভাষার সংবাদপত্র ‘লা প্রেস’ (La Presse) তাদের শতবর্ষী প্রিন্ট সংস্করণ পুরোপুরি বন্ধ করে এখন শতভাগ ডিজিটাল মডেলে চলে গেছে। এটি কানাডার সংবাদপত্রের ইতিহাসে একটি বড় উদাহরণ।
উইকেন্ড বনাম ডেইলি: টরন্টো স্টার বা গ্লোব অ্যান্ড মেইলের মতো পত্রিকাগুলোর সপ্তাহের অন্যান্য দিনের তুলনায় শনিবার বা রোববারের (Weekend Edition) সার্কুলেশন কিছুটা বেশি হলেও তা ১০ বছর আগের সাধারণ দিনের সার্কুলেশনের চেয়েও কম।
পোস্টমিডিয়া নেটওয়ার্ক: কানাডার বৃহত্তম এই সংবাদপত্র চেইনটি (যারা ন্যাশনাল পোস্ট, ভ্যাঙ্কুভার সান এবং অটোয়া সিটিজেন চালায়) গত কয়েক বছরে তাদের প্রিন্ট সার্কুলেশন ৩০% থেকে ৪০% কমিয়ে দিয়েছে এবং অনেক স্থানীয় সংস্করণের মুদ্রণ স্থায়ীভাবে বন্ধ করেছে।

বৈশ্বিক গণমাধ্যম ও ব্যবসা-বাণিজ্যের এমন আরও বিশ্লেষণমূলক খবর পেতে businesstoday24.com ফলো করুন