আন্তর্জাতিক ডেস্ক: বিশ্বব্যাপী কার্বন নিঃসরণ কমানো এবং জলবায়ু পরিবর্তনের ঝুঁকি মোকাবিলায় যখন কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎ উৎপাদন থেকে সরে আসার জোর তাগিদ দেওয়া হচ্ছে, ঠিক তখনই বৈশ্বিক জ্বালানি বাজারে এক অভূতপূর্ব ও স্ববিরোধী চিত্র বা ‘প্যারাডক্স’ দেখা দিয়েছে। আন্তর্জাতিক জ্বালানি গবেষণা সংস্থা গ্লোবাল এনার্জি মনিটর (GEM) এবং তার অংশীদারদের যৌথ উদ্যোগে প্রকাশিত সর্বশেষ ‘বুম অ্যান্ড বাস্ট কোল ২০২৬’ প্রতিবেদনে এই বিস্ময়কর তথ্য উঠে এসেছে।
প্রতিবেদনের ১১তম বার্ষিক পর্যালোচনায় দেখা গেছে, বিশ্বজুড়ে কয়লা পুড়িয়ে প্রকৃত বিদ্যুৎ উৎপাদন বা এর ব্যবহার প্রায় ০.৬% হ্রাস পেয়েছে। অথচ একই সময়ে নতুন নতুন কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎ কেন্দ্র নির্মাণের ফলে বিশ্বব্যাপী মোট কয়লা বিদ্যুৎ সক্ষমতা (Capacity) রেকর্ড ৩.৫% বৃদ্ধি পেয়েছে। বিদ্যুৎ উৎপাদন কমে যাওয়া সত্ত্বেও অবকাঠামোগত সক্ষমতা বাড়ার এই বৈপরীত্য বিশ্বজুড়ে নীতি-নির্ধারক ও পরিবেশবাদীদের নতুন ভাবনায় ফেলে দিয়েছে।
প্যারাডক্সের মূল কারণ: গ্রিডের ‘বীমা’ হিসেবে কয়লা
বিশ্লেষকদের মতে, বাজারে নবায়নযোগ্য জ্বালানির অভূতপূর্ব সস্তা দর এবং দ্রুত প্রসারের কারণে প্রতিদিনের বিদ্যুৎ উৎপাদনে কয়লার ব্যবহার কমে আসছে। কিন্তু অনেক দেশই তাদের বিদ্যুৎ গ্রিডকে ঝুঁকিমুক্ত রাখতে ব্যাকআপ বা ‘সিস্টেম ইন্স্যুরেন্স’ হিসেবে কয়লা বিদ্যুৎ কেন্দ্রগুলোকে টিকিয়ে রাখছে কিংবা নতুন কেন্দ্র তৈরি করছে। অর্থাৎ, স্বাভাবিক সময়ে সৌর বা বায়ু বিদ্যুৎ ব্যবহার করা হলেও, চরম আবহাওয়া বা প্রাকৃতিক গ্যাসের সরবরাহ সংকটের মুহূর্তে জরুরি চাহিদা মেটাতে এই কয়লা সক্ষমতা ধরে রাখা হচ্ছে।
চীন ও ভারতে বিপরীতমুখী প্রবণতা
এই ডিকপলিং বা স্ববিরোধী প্রবণতা সবচেয়ে বেশি দৃশ্যমান হয়েছে বিশ্বের দুই বৃহত্তম কয়লা ব্যবহারকারী দেশ চীন ও ভারতে।
চীন: দেশটিতে কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎ উৎপাদন সক্ষমতা এক বছরে ৬% বৃদ্ধি পেয়েছে। অথচ সেখানে কয়লা থেকে প্রকৃত বিদ্যুৎ উৎপাদন কমেছে ১.২%। বর্তমানে চীনের উন্নয়ন পাইপলাইনে ৫০০ গিগাবাইটেরও (GW) বেশি কয়লা বিদ্যুৎ প্রকল্প রয়েছে। যদি এগুলো নির্মিত হয়, তবে দেশটির পঞ্চবার্ষিকী পরিকল্পনার (২০২৬-২০৩০) কয়লা ব্যবহার কমানোর লক্ষ্যমাত্রা বড় চ্যালেঞ্জের মুখে পড়বে।
ভারত: ভারতে কয়লা বিদ্যুৎ সক্ষমতা ৩.৮% বৃদ্ধি পেলেও প্রকৃত বিদ্যুৎ উৎপাদন কমেছে ২.৯%। দেশটিতে সৌর ও বায়ু বিদ্যুতের রেকর্ড উৎপাদন বৃদ্ধির ফলে নতুন চাহিদার পুরোটাই গ্রিন এনার্জি দিয়ে মেটানো সম্ভব হয়েছে। তবে ভারত সরকার আগামী ৭ বছরে আরও ১০০ গিগাবাইট কয়লা বিদ্যুৎ সক্ষমতা যুক্ত করার লক্ষ্যমাত্রা নিয়ে কাজ করছে।
ধীর হয়েছে পুরোনো কেন্দ্র বন্ধের প্রক্রিয়া
প্রতিবেদনে আরও একটি উদ্বেগের বিষয় তুলে ধরা হয়েছে। পূর্বপরিকল্পনা অনুযায়ী যেসব পুরোনো ও দূষণকারী কয়লা বিদ্যুৎ কেন্দ্র অবসরে (Retirement) যাওয়ার কথা ছিল, বৈশ্বিক লজিস্টিকস ও ভূ-রাজনৈতিক সংকটের কারণে তার প্রায় ৭০% বন্ধের সিদ্ধান্ত স্থগিত করা হয়েছে। ইউরোপীয় ইউনিয়নে (EU) পূর্বনির্ধারিত অবসরে যাওয়ার তালিকার ৬৯% এবং যুক্তরাষ্ট্রে ৫৯% কয়লা কেন্দ্র গ্রিডের নিরাপত্তার স্বার্থে চালু রাখা হয়েছে।
সংকুচিত হচ্ছে কয়লার আন্তর্জাতিক মানচিত্র
যদিও সক্ষমতা বৃদ্ধি পাচ্ছে, তবে কয়লা বিদ্যুৎ প্রকল্পের ভৌগোলিক বিস্তার অনেকটাই সংকুচিত হয়ে এসেছে। বর্তমানে বিশ্বব্যাপী নির্মাণাধীন কয়লা বিদ্যুৎ কেন্দ্রগুলোর প্রায় ৯৫% এককভাবে চীন ও ভারতের দখলে। বাকি মাত্র ৫% বিশ্বের অন্যান্য দেশে ছড়িয়ে রয়েছে। ২০১৪ সালে যেখানে বিশ্বের ৭৫টি দেশ নতুন কয়লা কেন্দ্র নির্মাণের প্রস্তাব বা প্রক্রিয়ার সাথে যুক্ত ছিল, ২০২৬ সালে তা কমে মাত্র ৩২টি দেশে দাঁড়িয়েছে। দক্ষিণ আমেরিকা বা লাতিন আমেরিকা অঞ্চল ইতিমধ্যেই সম্পূর্ণভাবে নতুন কয়লা প্রকল্পের প্রস্তাব থেকে মুক্ত হয়েছে।
দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার চিত্র ও ব্যতিক্রম ইন্দোনেশিয়া
দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ায় সামগ্রিকভাবে কয়লা বিদ্যুৎ কেন্দ্র চালুর হার টানা তিন বছরের মতো কমলেও ইন্দোনেশিয়া এখানে বড় ব্যতিক্রম হিসেবে দেখা দিয়েছে। খনিজ প্রক্রিয়াকরণ (নিকেল ও অ্যালুমিনিয়াম) শিল্পের জ্বালানি মেটাতে দেশটিতে ‘ক্যাপটিভ’ বা নিজস্ব কয়লা বিদ্যুৎ কেন্দ্রের সক্ষমতা গত এক দশকে ১০ গুণ বেড়ে ২০ গিগাবাইটে পৌঁছেছে। পরিবেশবাদীদের মতে, দেশটির এই খনিজ বিপ্লব সবুজায়নের নামে প্রকারান্তরে কয়লা নির্ভরতা বাড়াচ্ছে।
জলবায়ু লক্ষ্যমাত্রা নিয়ে গভীর উদ্বেগ
রিসোর্সেস ফর দ্য ফিউচার (RFF)-এর ‘গ্লোবাল এনার্জি আউটলুক ২০২৬’ প্রতিবেদনেও এই পরিস্থিতির প্রতিফলন ঘটেছে। বিশেষজ্ঞরা সতর্ক করেছেন যে, নবায়নযোগ্য জ্বালানির বিকল্প থাকা সত্ত্বেও নীতিগত দুর্বলতার কারণে কয়লা অবকাঠামো যেভাবে টিকে থাকছে, তাতে প্যারিস জলবায়ু চুক্তির ১.৫ ডিগ্রি সেলসিয়াসের মধ্যে বৈশ্বিক তাপমাত্রা বৃদ্ধির লাগাম টেনে ধরার লক্ষ্যটি অর্জন করা এখন প্রায় অসম্ভব হয়ে পড়েছে।