পর্ব-৪
বিজনেসটুডে২৪ প্রতিনিধি, চট্টগ্রাম: মহানগরীর পরিবহন জরিপে উঠে এসেছে এক চমকপ্রদ তথ্য। বন্দরনগরীর প্রায় ৬০ শতাংশ মানুষ প্রতিদিন বিভিন্ন গন্তব্যে যাতায়াতের জন্য প্রধান মাধ্যম হিসেবে হেঁটে যাওয়াকেই বেছে নেন। কিন্তু বাস্তব চিত্র হলো, এই বিশালসংখ্যক পথচারীদের জন্য নগরীর সড়কগুলো অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ ও ভোগান্তিময়। ফুটপাত হকারদের দখলে থাকা, ভাঙাচোরা পৃষ্ঠ, ড্রেনের খোলা গর্ত এবং সঠিক পারাপার ব্যবস্থার অভাবে পথচারীদের বাধ্য হয়ে মূল রাস্তায় গাড়ির সাথে ঝুঁকি নিয়ে হাঁটতে হয়।
ওই সংকট মোকাবিলায় ‘চট্টগ্রাম ট্রাফিক ও ট্রান্সপোর্ট মাস্টারপ্ল্যান (২০২৫-২০৫০)’ খসড়া প্রতিবেদনে পথচারীদের নিরাপত্তা ও চলাচলের উপযোগী স্বাধীন অবকাঠামো গড়ে তোলার ওপর সর্বোচ্চ গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। খসড়া প্রতিবেদনের সমীক্ষায় দেখা যায়, শহরের প্রধান সড়কগুলোর মাত্র ৬৪ শতাংশ অংশে ফুটপাত রয়েছে, যার একটি বড় অংশই নানা প্রতিবন্ধকতায় বিচ্ছিন্ন ও ব্যবহার অনুপযোগী। এছাড়া ৭১ শতাংশ ফুটপাত অবৈধ হকার, দোকানের মালামাল বা অন্যান্য স্থায়ী-অস্থায়ী দখলে সংকুচিত হয়ে গেছে। শহরের জুবিলি রোড, স্টেশন রোড ও ওয়াসা মোড়ের মতো গুরুত্বপূর্ণ সংযোগস্থলগুলোতে পর্যাপ্ত ও প্রশস্ত ফুটপাতের অভাব রয়েছে।
এই অবস্থা পরিবর্তনের জন্য খসড়া মাস্টারপ্ল্যানে শহরজুড়ে প্রায় ১৪০ কিলোমিটার নতুন ও আধুনিক মানসম্পন্ন ফুটপাত নির্মাণের একটি বিশাল কর্মপরিকল্পনা দেওয়া হয়েছে। এতে বিভিন্ন সড়কের চওড়া বা রাইট অব ওয়ে (Right of Way) অনুযায়ী নির্দিষ্ট গাইডলাইন নির্ধারণ করা হয়েছে। যেমন ১২০ ও ১০০ ফুট চওড়া সড়কের জন্য অন্তত ১২ ফুট প্রশস্ত ফুটপাত, ৮০ ফুট সড়কের জন্য ১০ ফুট এবং ৬০ ফুট সড়কের জন্য ৮ ফুট চওড়া ফুটপাত রাখার কথা বলা হয়েছে। প্রতিটি ফুটপাতে পথচারীদের হাঁটার মূল পথ ছাড়াও ড্রেনেজ, পথপ্রান্তের গাছপালা এবং স্ট্রিট লাইট বসানোর নির্দিষ্ট জোন আলাদা করে চিহ্নিত করা হয়েছে।
প্রতিবেদনে বিশেষভাবে জোর দেওয়া হয়েছে অন্তর্ভুক্তিমূলক নকশা বা ‘ইনক্লুসিভ ডিজাইন’-এর ওপর। শারীরিক প্রতিবন্ধী ব্যক্তি, বয়স্ক এবং শিশুদের চলাচলের সুবিধার জন্য ফুটপাতগুলোকে সমতল করার প্রস্তাব করা হয়েছে। পাশাপাশি অন্ধ বা দৃষ্টিপ্রতিবন্ধী মানুষের চলাচলের পথ নির্দেশ করতে ফুটপাতে বিশেষ ‘টেকটাইল টাইলস’ বসানো এবং হুইলচেয়ার ব্যবহারের জন্য ফুটপাত থেকে সড়কে নামার স্থানে র্যাম্প বা ঢালু সংযোগ তৈরির নির্দেশনা রয়েছে।
সড়ক পারাপারের ক্ষেত্রে খসড়া মাস্টারপ্ল্যানে পথচারীদের মানসিকতার ওপর ভিত্তি করে বাস্তবসম্মত পরিবর্তনের প্রস্তাব করা হয়েছে। নগরীতে নির্মিত ফুট-ওভার ব্রিজগুলো অত্যন্ত উঁচু ও সিঁড়ি বেয়ে উঠতে হয় বলে বেশিরভাগ পথচারী তা ব্যবহার করতে চান না। ফলে বয়স্ক বা শারীরিক প্রতিবন্ধীরা চরম ভোগান্তিতে পড়েন। এ কারণে উঁচু ফুট-ওভার ব্রিজের ওপর অতিরিক্ত নির্ভরতা কমিয়ে সমতলে স্বয়ংক্রিয় ট্রাফিক সিগন্যালভিত্তিক নিরাপদ জেব্রা ক্রসিং চালুর জোর সুপারিশ করা হয়েছে। প্রধান মোড় ও ব্যস্ত সড়কগুলোতে সিগন্যাল লাইটের নির্দিষ্ট পেডেস্ট্রিয়ান ফেজ বা পথচারী পারাপারের সময় নির্ধারণ করে দেওয়ার কথা বলা হয়েছে।
ফুটপাতগুলোকে চলাচলের উপযোগী রাখতে সিটি কর্পোরেশন ও আইন প্রয়োগকারী সংস্থার সমন্বয়ে হকার মুক্ত রাখার নীতি বাস্তবায়নের সুপারিশ রয়েছে খসড়ায়। ছোট ও গৌণ সড়কগুলোতে গাড়ির গতি কমাতে ‘রেজড স্পিড বাম্প’ বা উঁচু গতিসংরোধক এবং সড়কদ্বীপ বা মিডিয়ানের মাঝে অন্তত ১০ থেকে ১৫ ফুট চওড়া নিরাপদ পারাপার স্থান রাখার নিয়ম বেঁধে দেওয়া হয়েছে। এসব পদক্ষেপের মাধ্যমে চট্টগ্রামকে একটি পরিবেশবান্ধব, সুস্থ ও পথচারীবান্ধব আধুনিক নগরী হিসেবে রূপান্তর করা সম্ভব হবে।










