বিজনেসটুডে২৪ প্রতিনিধি, চট্টগ্রাম: আন্তর্জাতিক মেরিটাইম সংস্থার (আইএমও) বহুল প্রতীক্ষিত ‘হংকং আন্তর্জাতিক কনভেনশন ফর দ্য সেফ অ্যান্ড এনভায়রনমেন্টালি সাউন্ড রিসাইক্লিং অব শিপস’ (এইচকেসি) কার্যকর হওয়ার নির্ধারিত সময়সীমা ঘনিয়ে আসার সাথে সাথে দক্ষিণ এশিয়ার শিপ রিসাইক্লিং শিল্পে রূপান্তরের বড় ঢেউ শুরু হয়েছে। বৈশ্বিক জাহাজভাঙা বাণিজ্যের কেন্দ্রস্থল বাংলাদেশ ও ভারতের শিপইয়ার্ডগুলোতে এখন নিরাপদ, পরিবেশবান্ধব ও টেকসই স্ক্র্যাপিং সনদ অর্জনের জোর প্রতিযোগিতা চলছে।
আইএমও-র নির্দেশিকা অনুসারে, ২০২৫ সালের জুনে কনভেনশনটি আনুষ্ঠানিকভাবে আন্তর্জাতিক আইনের মর্যাদা পাওয়ার পর থেকেই মেয়াদোত্তীর্ণ বাণিজ্যিক জাহাজ ক্রয়ের ক্ষেত্রে বৈশ্বিক মানদণ্ড কঠোর থেকে কঠোরতর হচ্ছে। ইউরোপীয় ইউনিয়নভুক্ত দেশ এবং শীর্ষস্থানীয় বৈশ্বিক শিপিং লাইনগুলো এখন আর কোনো নন-কমপ্লায়েন্ট বা প্রচলিত ধারার অনিরাপদ ইয়ার্ডে জাহাজ বিক্রি করছে না। ফলে আন্তর্জাতিক বাজার ধরে রাখতে এবং আন্তর্জাতিক ব্যাংকিং ও এলসি সুবিধা নিশ্চিত করতে শিপইয়ার্ড মালিকদের সামনে গ্রিন সার্টিফিকেশন ছাড়া আর কোনো বিকল্প নেই।
ভারতের গুজরাটের আলং অঞ্চলের ইয়ার্ডগুলো আগে থেকেই এইচকেসি অনুমোদনের ক্ষেত্রে এগিয়ে থাকলেও সাম্প্রতিক মাসগুলোতে বাকি ইয়ার্ডগুলো দ্রুত আধুনিকায়নের কাজ শেষ করেছে। অন্যদিকে, চট্টগ্রামের সীতাকুণ্ড উপকূলের জাহাজভাঙা শিল্পে এখন অভূতপূর্ব অবকাঠামোগত পরিবর্তন দৃশ্যমান। ইতোমধ্যে বাংলাদেশের একাধিক শীর্ষস্থানীয় শিপইয়ার্ড আন্তর্জাতিক ক্লাসিফিকেশন সোসাইটি থেকে এইচকেসি কমপ্লায়েন্স সনদ অর্জন করেছে এবং আরও বেশ কয়েকটি ইয়ার্ড আন্তর্জাতিক নিরীক্ষার চূড়ান্ত পর্যায়ে রয়েছে।
ইয়ার্ডগুলোতে এখন উন্মুক্ত সৈকতে বিষাক্ত রাসায়নিক ছড়িয়ে পড়ার ঝুঁকি কমাতে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে। প্রতিটি ইয়ার্ডে নির্মাণ করা হয়েছে কংক্রিটের নিশ্ছিদ্র ফ্লোরিং, ক্রেন ও বার্থিংয়ের সমন্বিত ব্যবস্থা, ইন্টারসেপ্টর ও ড্রেনেজ লাইন, যার মাধ্যমে জাহাজের বিলজ ওয়াটার ও তেল-মিশ্রিত তরল সরাসরি সাগরে যাওয়া রোধ করা সম্ভব হচ্ছে। এছাড়া জাহাজে ব্যবহৃত অ্যাসবেস্টস, ভারী ধাতু ও বিপজ্জনক বর্জ্য সংরক্ষণে আলাদা ট্রিটমেন্ট ফ্যাসিলিটি গড়ে তোলা হয়েছে। শ্রমিকদের সার্বক্ষণিক ব্যক্তিগত সুরক্ষা সামগ্রী (পিপিই) নিশ্চিতকরণ ও আন্তর্জাতিক স্ট্যান্ডার্ডে পেশাগত স্বাস্থ্য সুরক্ষার প্রশিক্ষণ বাধ্যতামূলক করা হয়েছে।
শিল্প বিশ্লেষকদের মতে, পরিবেশবান্ধব রূপান্তরের প্রাথমিক পর্যায়ে বিশাল আর্থিক বিনিয়োগের কারণে ছোট ইয়ার্ডগুলোর ওপর চাপ সৃষ্টি হলেও দীর্ঘমেয়াদে এটি বাংলাদেশের শিল্প খাতে বড় সুফল বয়ে আনবে। জাপানি আর্থিক ও প্রযুক্তিগত সহায়তায় চট্টগ্রামের মেরিন ড্রাইভে সেন্ট্রাল ট্রিটমেন্ট, স্টোরেজ অ্যান্ড ডিসপোজাল ফ্যাসিলিটি (টিএসডিএফ) এবং বর্জ্য শোধনাগার প্রকল্প বাস্তবায়নের কাজও দ্রুত এগিয়ে নেওয়া হচ্ছে। আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডলে গ্রিন সনদপ্রাপ্তির এ তৎপরতা নিশ্চিত করছে যে, দক্ষিণ এশিয়ার উপকূলীয় অর্থনীতি আর পরিবেশ বিধ্বংসী কর্মকাণ্ডের সাথে যুক্ত থাকবে না, বরং আন্তর্জাতিক বৃত্তাকার অর্থনীতির (সার্কুলার ইকোনমি) গুরুত্বপূর্ণ অংশীদার হিসেবে নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করবে।
ভিজিট করুন www.businesstoday24.com








