বিশ্বের সবচেয়ে সময়নিষ্ঠ ও স্বয়ংক্রিয় মেরিটাইম হাব হিসেবে পরিচিত সিঙ্গাপুর বন্দরে বার্থিংয়ের জন্য জাহাজের দীর্ঘ অপেক্ষার সময় বৈশ্বিক সরবরাহ শৃঙ্খলে নতুন করে আতঙ্ক ছড়াচ্ছে। স্বাভাবিক সময়ে যেখানে একটি কন্টেইনার ভেসেল সর্বোচ্চ আধবেলা বা ১২ ঘণ্টার মধ্যে বার্থিং সুবিধা পেত, সেখানে বর্তমানে জাহাজগুলোকে দুই থেকে চার দিন, এমনকি পরিস্থিতিভেদে পাঁচ থেকে ছয় দিন পর্যন্ত বহির্নোঙরে অলস বসে থাকতে হচ্ছে। দূরপাল্লার মাদার ভেসেলগুলোর শিডিউল বিপর্যয়ের এই ধাক্কা এখন সরাসরি আছড়ে পড়ছে দক্ষিণ ও দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার আঞ্চলিক ফিডার রুটে।
নির্ধারিত সময়ে মাদার ভেসেলে পণ্য তুলতে না পেরে ফিডার নেটওয়ার্কের শত শত রফতানি কন্টেইনার অনির্দিষ্টকালের ‘রোল-ওভার’-এর শিকার হচ্ছে, যার বড় মূল্য চোকাতে হচ্ছে বাংলাদেশ, ভারত ও ভিয়েতনামের প্রধান উৎপাদন খাতগুলোকে।
পরিস্থিতির ভয়াবহতা নিয়ে আন্তর্জাতিক ফিডার অপারেটর ও রিজিওনাল কনসোর্টিয়ামের এক শীর্ষ নির্বাহী নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, “আমরা নজিরবিহীন সময়সূচি বিপর্যয়ের মধ্য দিয়ে যাচ্ছি। আমাদের ফিডার জাহাজগুলো চট্টগ্রাম বা হো চি মিন সিটি থেকে নির্ধারিত সময়ে সিঙ্গাপুরে পৌঁছালেও মাদার ভেসেলের বার্থিং জটের কারণে সেখানে দিনের পর দিন পণ্য খালাসের অনুমতি মিলছে না। যখন একটি মাদার ভেসেল নির্ধারিত উইন্ডো মিস করে তিন দিন দেরিতে ভিড়ছে, তখন আমাদের ফিডার জাহাজের সংযোগ পুরোপুরি ছিন্ন হয়ে যাচ্ছে।
ফলে তৈরি পোশাকের মতো সংবেদনশীল রফতানি পণ্য সিঙ্গাপুরের ইয়ার্ডেই ফেলে রাখতে হচ্ছে পরবর্তী জাহাজের জন্য। এতে ট্রানজিট সময় অন্তত দুই থেকে তিন সপ্তাহ বেড়ে যাচ্ছে এবং ক্লায়েন্টের নির্ধারিত ডেলিভারি ডেটলাইন সম্পূর্ণ ভেঙে পড়ছে।”
এই সংকটের দ্বিমুখী প্রভাব পড়ছে আমদানি বাণিজ্যেও। ট্রান্সশিপমেন্ট হাবগুলোতে মাদার ভেসেল থেকে খালি কন্টেইনার নামিয়ে ফিডারে তুলে দেওয়ার প্রক্রিয়া থমকে গেছে। সিঙ্গাপুরে কর্মরত একটি শীর্ষস্থানীয় ইউরোপীয় গ্লোবাল শিপিং লাইনের সিঙ্গাপুর ও দক্ষিণ এশিয়া অঞ্চলের সিনিয়র অপারেশনাল ডিরেক্টর এই অচলাবস্থা বিশ্লেষণ করে বলেন, “সমস্যা কেবল মাদার ভেসেলের বার্থিং নিয়ে নয়, আসল জটিলতা তৈরি হয়েছে ইয়ার্ডের ভেতরে কন্টেইনারের ধারণক্ষমতা নিয়ে। পশ্চিমগামী জাহাজগুলো সময় বাঁচাতে একাধিক আঞ্চলিক বন্দর বাদ দিয়ে কেবল সিঙ্গাপুরেই সব পণ্য আনলোড করে দিচ্ছে। এর ফলে টার্মিনাল ইয়ার্ডগুলো ৯০ শতাংশের বেশি পূর্ণ। ইয়ার্ডে কন্টেইনার স্থানান্তর ও ক্রেন মুভমেন্টের গতি নাটকীয়ভাবে কমে গেছে। আমরা চাইলেও চট্টগ্রাম বা কলম্বোগামী খালি কন্টেইনার দ্রুত রিলোড করতে পারছি না। কারণ অগ্রাধিকার দেওয়া হচ্ছে লোডেড বক্সগুলোকে। ফলে উৎপাদনশীল দেশগুলোতে খালি কন্টেইনারের সংকট তীব্র হচ্ছে এবং সামগ্রিক ইক্যুইপমেন্ট ভারসাম্য নষ্ট হয়ে পড়ছে।”
বন্দর জট নিরসনে সিঙ্গাপুর পোর্ট অথরিটি (পিএসএ) ইতোমধ্যেই একাধিক আপৎকালীন পদক্ষেপ গ্রহণ করেছে। বন্ধ থাকা পুরোনো তানজং পাগার ও কেপেল টার্মিনালের খালি জায়গাগুলো ফের সচল করে অতিরিক্ত কন্টেইনার স্টোরেজের ব্যবস্থা করা হয়েছে। পাশাপাশি মেগা অবকাঠামো প্রকল্প ‘টুয়াস পোর্ট’-এর নতুন ও অপ্রস্তুত বার্থগুলো দ্রুত চালু করে অতিরিক্ত ক্রেন ও জনবল নিয়োজিত রাখা হয়েছে। টার্মিনাল অপারেটররা চব্বিশ ঘণ্টা পূর্ণ ক্ষমতায় কাজ চালালেও সংকটের স্থায়ী কোনো সমাধান মিলছে না।
আঞ্চলিক শিপিং নির্বাহীদের স্পষ্ট মত, দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার ট্রান্সশিপমেন্ট হাবগুলোর বর্তমান সংকট মূলত সুয়েজ রুট বন্ধ থাকার উপজাত। যতদিন পর্যন্ত বাণিজ্যিক জাহাজগুলো আফ্রিকার উত্তমাশা অন্তরীপের দীর্ঘ পথ পরিহার করে লোহিত সাগরের স্বাভাবিক সমুদ্রপথে ফিরতে না পারছে, ততদিন পর্যন্ত মাদার ভেসেলগুলোর নির্দিষ্ট শিডিউলে ফেরা অসম্ভব। ফলে সিঙ্গাপুর ও মালয়েশিয়ার মতো প্রধান হাবগুলোতে বার্থিং বিলম্ব, ইয়ার্ড কনজেশন এবং ফিডার সংযোগ বাতিলের এই অস্বাভাবিক চক্র আরও বেশ কিছু সময় আন্তর্জাতিক বাণিজ্যকে ভোগাবে।