Home অন্যান্য বৌদি কাহিনী: চট্টগ্রামের মেহমানদারি বনাম কলকাতার ‘গ্রাম’ হিসাব!

বৌদি কাহিনী: চট্টগ্রামের মেহমানদারি বনাম কলকাতার ‘গ্রাম’ হিসাব!

ক্যাপ্টেন হাবিবুর রহমান
১৯৭৭ সালের কথা। সমুদ্রজীবনের শুরুর দিকের এক চটপটে অভিজ্ঞতা, যা এতদিন পরও মনে পড়লে ঠোঁটের কোণে হাসি ফুটে ওঠে।
আমার জীবনের প্রথম জাহাজ ‘বাংলার উপহার’-এর চিফ ইঞ্জিনিয়ার ছিলেন মি. এস. কে. সামন্ত। ভারতীয়। আর ওনার সহধর্মিণী ছিলেন কৃষ্ণা সামন্ত—যাকে আমরা সবাই ‘কৃষ্ণা বৌদি’ বলে ডাকতাম। ‘বাংলার উপহার’-এ আমার দ্বিতীয় ভয়েজ শেষে  কয়লার বোঝাই নিয়ে আমরা চট্টগ্রামের দিকে ফিরছিলাম, পথে কলকাতায় কিছু কার্গো ডিসচার্জিং এবং আর কিছু কার্গো লোডিং ছিল। সে সময়ে কলকাতা থেকে বৌদি ওনার ছোট মেয়েটিকে নিয়ে জাহাজে উঠলেন।
চট্টগ্রাম বন্দরে ভিড়ার পর শুরু হলো জাহাজ থেকে কয়লা খালাস বা ডিসচার্জিংয়ের কাজ। যে বা যারা কয়লাবাহী জাহাজে উঠেছেন, তারাই শুধু জানেন সে এক কী নারকীয় পরিবেশ! চারদিকে কালো কয়লার ধুলো উড়ছে, বাতাসে নিঃশ্বাস নেওয়াই দায়। তার ওপর চট্টগ্রামের সেই তীব্র গরম! কয়লার কালো ধুলো আর গরমে কৃষ্ণা বৌদির অবস্থা একেবারে হাঁসফাঁস। বেচারি নিঃশ্বাসই নিতে পারছিলেন না।
বৌদির এই কষ্ট দেখে আমার মায়া হলো। বললাম, “বৌদি, এই কয়লার নরকে কষ্ট করার কোনো মানে হয়? চলুন, আপনাকে আমাদের বাসায় নিয়ে যাই। আমার বড় ভাই রেলওয়ে অফিসার, শহরে বিশাল বাংলো টাইপ বাসা। বাসায় আম্মা আছেন, ভাইয়া আছেন। কয়লা খালাস শেষ না হওয়া পর্যন্ত একদম আরামে থাকবেন।”
কয়লার ধুলো থেকে রেহাই পাওয়ার প্রস্তাব শুনে বৌদি তো এক পায়ে খাড়া! বেশ কিছু জামাকাপড় আর ছোট মেয়েটাকে নিয়ে সোজা আমাদের বাসায় রওনা হলেন।
বাসায় পৌঁছাতেই আম্মা তো ভীষণ খুশি! ছোট ছেলে যে জাহাজে চাকরি করে, সেই জাহাজের বড় অফিসার অর্থাৎ ‘চিফ ইঞ্জিনিয়ার’-এর স্ত্রী স্বয়ং ওনার বাসায় মেহমান হয়ে এসেছেন—এ যেন আম্মার কাছে এক পরম সৌভাগ্যের ব্যাপার! গ্রাম থেকে আসা সহজ-সরল, অত্যন্ত অতিথিপরায়ণ আমার আম্মা ওনাদের খাতির-যত্নে কোনো ত্রুটি রাখলেন না। পোলাও-কোরমা, মাছ-মাংস আর হরেক পদের নাস্তায় টেবিল ভরিয়ে দিলেন। আদর-যত্নের এমন প্রাবল্য দেখে মনে হলো বৌদি নিজেই কিছুটা অস্বস্তিতে পড়ে গেছেন।
কিন্তু গোলমালটা বাধল তিন দিনের মাথায়! আমাদের বাঙালিয়ানা আতিথেয়তার বহর দেখে কৃষ্ণা বৌদি হয়তো ভেবেছিলেন এসবের পেছনে কোনো বিল বা খরচপাতি লুকিয়ে আছে। একদিন হঠাৎ খুব সংকোচ নিয়ে আম্মাকে বলেই বসলেন, “আচ্ছা মাসিমা, আমরা যে এত দিন ধরে খাচ্ছি-দাচ্ছি, আমরা কি আপনাদের কিছু টাকা-পয়সা বা খরচ দেব?”
বৌদির মুখ থেকে এই কথা শোনামাত্র আম্মার যে কী অভিব্যক্তি হয়েছিল, তা আর বলার অপেক্ষা রাখে না! চট্টগ্রামীয় খাঁটি মেহমানদারির বদলে ‘টাকা-পয়সা’ দেওয়ার প্রস্তাব? আম্মা তো তাজ্জব! তবে মনের ভেতরের ধাক্কাটা বাইরে বিন্দুমাত্র বুঝতে না দিয়ে আম্মা হেসেই বললেন, “কী কও তোমরা, হ্যাঁ? আমার পোলায় তোমাগো আদর কইরা লইয়া আইছে, তোমরা দশ দিন খুশি মনে থাকো, অসুবিধা কী? খাও-দাও, ঘোরো। খবরদার! এসব টাকা-পয়সার কথা আর মুখে আনবা না!”
আম্মার ধমক মেশানো ভালোবাসায় বৌদি চুপ করে গেলেন বটে, তবে কয়লার ধুলো একটু থিতিয়ে আসতেই তিন দিনের মাথায় ধন্যবাদ জানিয়ে আবার জাহাজে ফিরে গেলেন। আবারও সেই কালো কয়লার ভেতরেই ওনার ঠাঁই হলো!
কলকাতার গড়িয়াহাট ও ‘গ্রাম’ ওজনের চমক!
ঘটনার বেশ কিছুদিন পরের কথা। আমি তখন ‘এমভি ঢাকা’ জাহাজে থার্ড অফিসার। ততদিনে মি. এস. কে. সামন্ত বিএসসি (বাংলাদেশ শিপিং কর্পোরেশন) ছেড়ে অন্য দেশের শিপিং কোম্পানিতে চলে গেছেন।
একবার আমাদের ‘এমভি ঢাকা’ জাহাজটি কলকাতার নেতাজি সুভাষ বসু ডকে নোঙর করল। বেশ কয়েকদিনের বিরতি। হঠাৎ মনে পড়ল কৃষ্ণা বৌদির কথা। ভাবলাম, চট্টগ্রামে ওনাকে বাসায় নিয়ে গিয়ে যে আশাতীত মেহমানদারি করেছিলাম, আজ ওনার গড়িয়াহাটের বাসায় গেলে নিশ্চয়ই খাতির-যত্নের কোনো কমতি হবে না! কলকাতায় বিশাল ভোজের আয়োজন হবে, হরেক পদের ইলিশ আর মিষ্টির ধামাকা হবে—এমন হাজারটা রাজকীয় চিন্তা মাথায় নিয়ে, পেট খালি রেখে ফোন করে রওনা দিলাম গড়িয়াহাটের উদ্দেশ্যে।
বাসায় পৌঁছানোর পর চটজলদি চা আর সামান্য নাস্তা সামনে এলো। বৌদি বেশ তাড়া দিয়ে বললেন, “তাড়াতাড়ি খেয়ে নিন, বাজারে যাব।”
আমি মনে মনে ভাবলাম, “বাহ্! স্পেশাল মেহমানদারির জন্য নিশ্চয়ই এখনই তাজা মাছ-মাংস কিনতে বাজারে যাওয়া হচ্ছে। আজ জমিয়ে খাওয়া যাবে!”
ওদের দামি অ্যাম্বাসেডর গাড়িতে চড়ে রওনা হলাম বাজার করতে। আমার জীবনে সেটাই প্রথম কলকাতার ঐতিহ্যবাহী কাঁচাবাজার দেখা। কিন্তু বাজারে গিয়ে বৌদির কেনাকাটার ধরণ দেখে আমার চোখ চড়কগাছে ওঠার উপক্রম!
বৌদি দোকানদারকে গিয়ে বলছেন, “এই, আমাকে ২০০ দে… ওখান থেকে ৩০০ দে…”
আমি তো শুনে পুরাই অবাক! চট্টগ্রাম বা বাংলাদেশের বাজারে গিয়ে আমরা অভ্যস্ত সের হিসেবে—কমপক্ষে এক সের, দুই সের বা পাঁচ সের কিনতে (সে সময়ে চালু ছিল পরিমাপের ঐতিহ্যবাহী একক—যেমন সের, পোয়া, ছটাক, মণ)। সেখানে বৌদি এত শ’ শ’ করে কী চাচ্ছেন? বিশাল কোনো পরিমাণের ব্যাপার নাকি?
আমি কৌতূহল সামলাতে না পেরে জিজ্ঞেসই করে ফেললাম, “বৌদি! আপনি কী বলতেছেন? ২০০ টাকা, ৩০০ টাকা বা এত বিশাল পরিমাণ কেন কিনতেছেন?”
বৌদি আমার অজ্ঞতা দেখে হেসে ফেলে বললেন, “আরে না না! ২০০ টাকা বা কেজি নয়, গ্রাম! ২০০ গ্রাম, ৩০০ গ্রাম!”
আমার মাথায় তখন যেন আকাশ ভেঙে পড়ল! ওরা বাজারে গিয়ে আলু-পটল কিনছে ১০০ গ্রাম, ৫০ গ্রাম! এমনকি বিশাল এক ইলিশ মাছের দিকে তাকিয়ে বলছেন, “পারলে কেটে ২০০ গ্রাম ইলিশ দাও!”
বাঙালির ইলিশ মাছ নাকি কেটে টুকরো হিসেবে ৫০-১০০ গ্রামে বিক্রি হয়—এ দৃশ্য দেখে আমার মাথা ঘুরতে শুরু করল! কোথায় ভাবলাম পদ্মার গোটা ইলিশের কড়কড়ে ঝোল আর রুই মাছের পেটি দিয়ে ভূরিভোজ হবে, আর কোথায় এই ৫০ গ্রাম-১০০ গ্রামের ‘গ্রাম্য’ কারবার!
ট্রামের টিকিট ও মেহমানদারির ইতিবৃত্ত
বাজার-সদাই শেষে কোনোমতে বাসায় ফিরলাম। কেনাকাটার হাল দেখে আমার পেটের ভেতরের রাজকীয় খাবারের আশার প্রদীপ ততক্ষণে নিভে গেছে।
বাসায় পৌঁছানোর পর বৌদি মুখের ওপর যে প্রশ্নটি করলেন, তাতে আমি আরও একদফা হতবাক! উনি খুব ঠাণ্ডা গলায় বললেন, “তা… আপনি কি এখন জাহাজে চলে যাবেন নাকি কোথাও ঘুরবেন?”
দুপুরের খাবারের বিন্দুমাত্র লক্ষণ বা দাওয়াত না দিয়ে সরাসরি এই প্রশ্ন শুনে আমি ভেতরে ভেতরে পুরোদস্তুর তাজ্জব বনে গেলাম! চট্টগ্রামের পাহাড়ি বাংলোয় আম্মার সেই ধুমধাম আতিথেয়তা, মাছ-মাংসের পাহাড় আর ওনার “কিছু টাকা দেব নাকি?” প্রশ্নের বিপরীতে আম্মার নিঃস্বার্থ মেহমানদারির কথা নিমেষেই আমার চোখের সামনে ভেসে উঠল।
অবস্থা বেগতিক দেখে আর আত্মসম্মানে আঘাত লাগায় নিজেকে সামলে নিয়ে বললাম, “না মানে… আমি একটু নিউ মার্কেটের দিকে যেতাম।”
বৌদি চটপট সমাধান বাতলে দিলেন, “আচ্ছা! তাহলে তো খুব ভালো হয়। আপনি এখান থেকে সোজা গিয়ে ওই ট্রামে উঠে পড়লেই নিউ মার্কেটে নেমে যেতে পারবেন।”
যে অ্যাম্বাসেডর গাড়িতে করে আমাকে বাজারে নিয়ে যাওয়া হলো, সেই গাড়িতে করে সামান্য দূরে নিউ মার্কেটে নামিয়ে দেওয়ার সৌজন্যটুকুও উনি দেখালেন না! একদম ট্রামের রাস্তা দেখিয়ে দিয়ে মেহমানদারির চ্যাপ্টার ক্লোজ করে দিলেন।
পকেটে হাত দিয়ে, খিদের পেট নিয়ে ট্রামের দিকে হাঁটতে হাঁটতে সেদিন বুঝলাম—সংস্কৃতি আর ভূগোলের ফারাক কাকে বলে! চট্টগ্রামে আম্মার কাছে মেহমান মানে ছিল লক্ষ্মী, আর কলকাতায় মেহমানদারির হিসাব নাকি চলে ৫০ গ্রাম আর ১০০ গ্রামের ট্রাম টিকিটে!