Home অন্যান্য নিউজ রুমের সেই ‘অদৃশ্য’ খলনায়ক: একজন সাব-এডিটরের বিচিত্র কাণ্ড

নিউজ রুমের সেই ‘অদৃশ্য’ খলনায়ক: একজন সাব-এডিটরের বিচিত্র কাণ্ড

জীবনের রিপোর্টার

কামরুল ইসলাম

সংবাদপত্রের প্রাণভোমরা বলা হয় যাদের, তারা হলেন ‘সাব-এডিটর’ বা সহ-সম্পাদক। দাপ্তরিক পরিভাষায় ‘অবর সম্পাদক’ বলা হলেও কাগজে-কলমে তারা সহ-সম্পাদক হিসেবেই পরিচিত। রিপোর্টাররা মাঠ থেকে খবর নিয়ে আসেন, আর সেই খবরকে ঘষামাজা করে কাটছাঁট দিয়ে পাঠযোগ্য করে তোলেন ডেস্কে বসা এই মানুষগুলো।

কিন্তু এই ডেস্কের আড়ালে থেকে কেউ কেউ যে কী ভয়ংকর খেলা খেলতে পারেন, তা আমার সাংবাদিকতা জীবনের এক বিচিত্র অভিজ্ঞতা না দেখলে বিশ্বাস করা কঠিন।

ডেস্ক বনাম মাঠ: এক চিরন্তন মনস্তাত্ত্বিক লড়াই

একজন সাব-এডিটরের জগৎ সীমাবদ্ধ থাকে নিউজ রুমের চার দেয়াল আর প্রেসক্লাবের আড্ডায়। অন্যদিকে, রিপোর্টারদের বিচরণ বহির্বিশ্বে, তাদের পরিচিতি ও দাপটও থাকে বেশি। এই নিয়ে নিউজ রুমে এক ধরনের অদৃশ্য চাপা ক্ষোভ বা মনস্তাত্ত্বিক দ্বন্দ্ব সবসময়ই বিরাজ করে। সাব-এডিটরদের অনেকেরই ধারণা—সব কাজ তারা করলেও নামটা জোটে কেবল রিপোর্টারদের।

এই ‘পরিচিতি-সংকট’ থেকেই কি বিকৃত মানসিকতার জন্ম হয়? আমাদের অফিসের সেই সহ-সম্পাদককে দেখলে এমন প্রশ্নই জাগত মনে।

কাল্পনিক সংবাদ ও সংবাদদাতার বিপদ

সে সময় আজকের মতো ইন্টারনেটের বিপ্লব ঘটেনি। মফস্বল থেকে ডাকযোগে, ফ্যাক্সে কিংবা টেলিফোনে সাংবাদিকরা খবর পাঠাতেন। আমাদের সেই সহ-সম্পাদক বসতেন দুপুরের শিফটে। তার প্রধান কাজ ছিল প্রেস রিলিজ থেকে সংবাদ তৈরি করা এবং ফোন ধরো নিউজ রিসিভ করা।

কিন্তু তিনি যা করতেন, তা রীতিমতো পিলে চমকানোর মতো। মফস্বল থেকে কোনো সংবাদদাতা সংবাদ পাঠাননি, অথচ তিনি নিজের মনগড়া এক সংবাদ তৈরি করে ওই সংবাদদাতার নামে কম্পোজ সেকশনে পাঠিয়ে দিতেন! পরে যখন ওই ভুয়া নিউজ নিয়ে শোরগোল পড়ে যেত, তখন তিনি বুক ফুলিয়ে দাবি করতেন—সংবাদদাতা নিজেই তা পাঠিয়েছেন। বেচারা সংবাদদাতাকে তখন অফিসের কৈফিয়তের মুখে পড়তে হতো।

শব্দের কারসাজি ও ‘নিখোঁজ’ পাণ্ডুলিপি

তার বিকৃতি এখানেই থেমে থাকত না। মাঝেমধ্যে তিনি কারও সংবাদের ভেতরে এমন সব আপত্তিকর শব্দ বা বিতর্কিত বাক্য ঢুকিয়ে দিতেন যে, পরদিন পত্রিকা ছাপা হওয়ার পর সংশ্লিষ্ট রিপোর্টার বা সংবাদদাতার মান-সম্মান নিয়ে টানাটানি পড়ে যেত।

কখনও কখনও তার ডিউটি পড়ত রাতের পালায়—যেটাকে বলা হয় ‘লেট নাইট ডিউটি’। এই শিফটের দায়িত্ব হলো পত্রিকা প্রেসে যাওয়ার আগে সব পাতা খুঁটিয়ে দেখা এবং কোনো ভুল থাকলে তা বার্তা সম্পাদকের নজরে আনা। কিন্তু তিনি এই সুযোগকে ব্যবহার করতেন ব্যক্তিগত আক্রোশ মেটানোর হাতিয়ার হিসেবে। তিনি সরাসরি কম্পিউটার রুমে গিয়ে চুপিচুপি কোনো রিপোর্টারের নাম ফেলে দিতেন (বাইলাইন কেটে দেওয়া)।

ধরা পড়ার ভয় ছিল না? অবশ্যই ছিল। আর সেই প্রমাণ লোপাটে তিনি ছিলেন ওস্তাদ। হাতে লেখা মূল কপি (হার্ড কপি) মিলিয়ে দেখলেই তার জালিয়াতি ধরা পড়ত। কিন্তু তিনি পাণ্ডুলিপি বা নিউজ কপিটাই গায়েব করে দিতেন! প্রমাণ না থাকায় তাকে সরাসরি অভিযুক্ত করা যেত না, কিন্তু অফিসের পিয়ন থেকে শুরু করে বার্তা সম্পাদক—সবাই জানতেন, এই ‘অদৃশ্য’ কাণ্ডগুলোর কারিগর কে। পেশাগত ঈর্ষা নাকি বিকৃত আনন্দ—কোন তাড়নায় তিনি এসব করতেন, তা আজও এক রহস্য।

তবে এই ধরনের কর্মকাণ্ডে একজন সৎ সংবাদকর্মীর ক্যারিয়ার ধ্বংস হয়ে যেতে পারে মুহূর্তেই। নিউজ রুমের সেই দিনগুলোর কথা মনে পড়লে আজও অবাক হই, কলমের কালি দিয়ে যেমন সমাজ গড়া যায়, তেমনি একই টেবিল-চেয়ারে বসে কেউ কেউ কীভাবে সেই কলমকেই অন্যের ক্ষতি করার অস্ত্র হিসেবে ব্যবহার করেন।